ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : সোমবার ৩০ মার্চ, ২০২৬, সময় : ১:২১ এএম

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি ইরানি দ্বীপ দখলের জন্য সেনা পাঠাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন মেরিন সেনা ও ছত্রীসেনারা (প্যারাট্রুপার) সেখানে একটি মরণফাঁদে পড়তে পারেন। কারণ, তাঁদের রসদ সরবরাহব্যবস্থা থাকবে অরক্ষিত আর কৌশলগত লক্ষ্যগুলোও অস্পষ্ট। মিডল ইস্ট আইকে এমনটাই বলেছেন সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা।


ওই এলাকায় মার্কিন সামরিক অভিযানটি শুরু হবে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ও রাডার ব্যবস্থা অচল (জ্যাম) করার মধ্য দিয়ে। আর এর পরপরই চালানো হবে ব্যাপক বোমা হামলা।


মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনসের সাবেক চিফ অব স্টাফ সেথ ক্রুমরিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে প্রস্তুতিমূলক এবং বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বর্তমানে গ্লোবাল গার্ডিয়ান নামের একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্রুমরিক। তিনি বলেন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করতে ‘প্রস্তুতিমূলক’ হামলা চালানো হবে।


যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে। তবে তিনটি দ্বীপের ওপর বেশি নজর থাকবে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে খারগ দ্বীপ। কুয়েতের উল্টো দিকে অবস্থিত এই দ্বীপটিতে এমন সব স্থাপনা রয়েছে, যেখান থেকে ইরান তাদের মোট তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ রপ্তানি করে।


আবু মুসা এবং এর কাছাকাছি আরও দুটি ছোট দ্বীপ উপসাগরীয় অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে ইরানের সাবেক শাহ এগুলো দখল করেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত এই দ্বীপগুলোর মালিকানা দাবি করে আসছে।


অন্য একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে কেশম দ্বীপ। এটি দখল করা সবচেয়ে কঠিন হবে। কারণ, এটি আয়তনে সবচেয়ে বড় এবং এখানে ইরানের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে। এসব সুড়ঙ্গে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করে রাখা হয়।


প্রায় দেড় লাখ ইরানি এই দ্বীপে বসবাস করেন। দ্বীপটি বন্দর আব্বাস থেকে খুব সামান্য দূরত্বে অবস্থিত। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে কেশম এবং এর পাশের দ্বীপ লারাকের মধ্যবর্তী পথ দিয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।


আকাশপথে আগ্রাসনের আশঙ্কা বেশি


বিশ্লেষকেরা প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপ যুদ্ধের আলোচনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মেরিন সেনাদের সমুদ্র থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওকিনাওয়া এবং আইও জিমা দ্বীপের দিকে উঠে আসার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ড্যানিয়েল ডেভিস বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থাকায় মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীর প্রথম অংশটি সম্ভবত আকাশপথেই আসবে।


ডেভিস বলেন, ‘ইউএসএস বক্সার বা ইউএসএস ত্রিপোলিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার করে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই আমি দেখছি না।’ তিনি মূলত দুটি উভচর যুদ্ধজাহাজের কথা বুঝিয়েছেন, যেগুলোতে করে কয়েক হাজার মার্কিন মেরিন সেনাকে এই অঞ্চলে আনা হচ্ছে। এই জাহাজগুলো ছোট আকারের ল্যান্ডিং ক্রাফট (উপকূলে সেনা ও রসদ পৌঁছানোর নৌযান) ও হোভারক্রাফট (উভচর যান) বহনে সক্ষম।


ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সিনিয়র ফেলো ডেভিস বলেন, ‘এখানে কেবল একটিই বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, আর তা হলো আকাশপথ।’

মার্কিন সেনাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ভি-২২ অস্প্রে টিল্ট-রোটর বিমান, চিনুক এবং ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ব্যবহার করবে।


যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার বলেছেন, স্থলসেনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। তবে এর মধ্যেও ওই অঞ্চলে স্থল অভিযানে পারদর্শী একটি বাহিনী পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন।


প্রায় ২ হাজার ৫০০ সেনার সমন্বয়ে গঠিত দুটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের আরও ৩ হাজার ছত্রীসেনাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ইউএস নেভাল পোস্টগ্রাজুয়েট স্কুলের শিক্ষক কালেভ সেপ বলেন, মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীকে সম্ভবত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দিলে, তারা (মার্কিন বাহিনী) এটি করতে পারবে না।’


এর আগে মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে সমর্থন দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। আমিরাত প্রকাশ্যে এমন যেকোনো যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে, যা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। সৌদি আরব জনসমক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে তুলনামূলক কম আক্রমণাত্মক হলেও, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।


‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’র সিনিয়র ফেলো ডেভিস বলেন, হেলিকপ্টারে করে আসা মার্কিন সেনারা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ড্রোন এবং এমনকি হালকা অস্ত্র ও আরপিজি (কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ট্যাংকবিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র) হামলার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।


ডেভিস বলেন, ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেই হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেনা নামানো হবে। তবে ইরানও মানচিত্র পড়তে জানে, তাই তারা এর জন্য প্রস্তুত থাকবে।’


‘ফকল্যান্ড আক্রমণের চেয়েও কঠিন’


মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি থাকা কোনো দ্বীপ দখল করার জন্য পশ্চিমা কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর শেষ চেষ্টা ছিল ১৯৮২ সালে। ওই সময় ব্রিটেন আর্জেন্টিনার কাছ থেকে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ পুনরায় দখল করে নেয়। সেই সময় উভচর অবতরণের (দ্বীপের তীরে ওঠার) সময় আর্জেন্টিনার বিমানবাহিনী ব্রিটিশ জাহাজগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানের কাছে এখনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন রয়েছে। আর্জেন্টিনা থেকে ফকল্যান্ডের দূরত্বের তুলনায় ইরানের দ্বীপগুলো দেশটির মূল ভূখণ্ডের অনেক বেশি কাছাকাছি। এর ফলে এমনকি প্রথাগত কামানের সাহায্যেও মূল ভূখণ্ড থেকে এই দ্বীপগুলো রক্ষা করা অনেক সহজ।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা সেপ বলেন, ‘ব্রিটিশদের জন্য ফকল্যান্ড জয় যতটা কঠিন ছিল, পারস্য উপসাগরের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং ড্রোন যুদ্ধের উন্নতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি এখন আরও বেশি কঠিন।’ তিনি বলেন, ‘খুব কম বিশেষজ্ঞই বিশ্বাস করেন যে ইরান মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীর অবতরণ ঠেকাতে পারবে। কিন্তু একবার মার্কিন মেরিন সেনারা বা ছত্রীসেনারা সেখানে পৌঁছে গেলে, তারা প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়বে। খারগ এবং বিশেষ করে কেশম দ্বীপের ভূপ্রকৃতি ইরানি সেনাদের লুকিয়ে থেকে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর সুযোগ করে দেবে।’


‘মোজাইক ডিফেন্স’ প্রয়োগ করবে ইরান


ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) স্থলযুদ্ধবিষয়ক সিনিয়র ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট বলেন, ইরান তাদের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ বা খণ্ড খণ্ড প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর আরও বেশি জোর দেবে।


২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সাদ্দাম হোসেনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সাজানো (টপ টু ডাউন) সামরিক বাহিনীকে দ্রুত পরাজিত করেছিল, তা দেখার পরই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামো বা ‘ডিসেন্ট্রালাইজড কমান্ড স্ট্রাকচার’ প্রবর্তন করে।


চলমান যুদ্ধজুড়ে এই ‘মোজাইক ডিফেন্স’ ব্যবস্থার প্রতিফলন দেখা গেছে। আইআরজিসির ৩১টি পৃথক কমান্ড রয়েছে—প্রতিটি প্রদেশের জন্য একটি করে। সেখানকার কর্মকর্তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা রয়েছে। এমনকি আইআরজিসিকে আরও ছোট ছোট শাখায় বিভক্ত করা সম্ভব।


স্টুয়ার্ট বলেন, ‘তারা গেরিলাযুদ্ধের ওপরই বেশি নির্ভর করবে। আমেরিকানদের এমন কোনো সুযোগ দেবে না, যাতে তাদের খোলা ময়দানে টেনে এনে উন্মুক্ত লড়াইয়ে জড়াতে পারে।’


তিন সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে বিমান হামলার পাশাপাশি সমুদ্র ও স্থল থেকে ইরানের ওপর অনবরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন মাটিতে থাকা মেরিন সেনা এবং ছত্রীসেনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু বা কৌশলে নতুন করে পরিবর্তন আনতে হবে।


আইআইএসএসের সিনিয়র ফেলো স্টুয়ার্ট বলেন, ‘আমরা এমন এক বিমান ও নৌবাহিনীর কথা বলছি, যারা কয়েক সপ্তাহ ধরে অত্যন্ত তীব্রগতিতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এখন মাটিতে থাকা সেনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের শক্তিতে টান পড়বে।’


‘আ ব্রিজ টু ফার’


স্টুয়ার্ট বলেন, একবার মার্কিন সেনারা উপকূলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিলে, তাদের জন্য নিয়মিত খাদ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং গোলাবারুদ সরবরাহের প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সেখানে রকেট লঞ্চার, সাঁজোয়া গাড়ি এবং এমনকি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও মোতায়েন করতে চাইবে। একই সঙ্গে আহত সেনাদের চিকিৎসার জন্য পুনরায় জাহাজে বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা সেপ বলেন, ‘একবার সেনারা সেখানে অবস্থান নিলে তাদের রসদ সরবরাহের বিষয়টি সামনে আসবে। এটি একটি বড় সমস্যা। এই সেনাদের টিকে থাকার জন্য নিয়মিত খাদ্য, জ্বালানি, গোলাবারুদ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে।’


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহের হিসাব অনুযায়ী, লড়াইয়ে থাকা প্রতি একজন সেনার বিপরীতে নয়জন সহায়ক কর্মীর প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে আবার জলসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশপথের সুরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী অন্তর্ভুক্ত নয়।’ বলে রাখা ভালো, সেনাদের সহায়তার জন্য যুদ্ধজাহাজ ছাড়াও পারস্য উপসাগরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো সামরিক ঘাঁটির একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে।


কিন্তু পারস্য উপসাগর অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি হামলার মুখে বেশ অরক্ষিতই প্রমাণিত হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কিং ফাহাদ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছে। অন্যদিকে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি অনুযায়ী দেখা গেছে যে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিটি ইতিমধ্যে ইরানি হামলার শিকার হয়েছে।


নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই অঞ্চলে থাকা ১৩টি ঘাঁটির অধিকাংশ ইরানি হামলায় এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো এখন আর বসবাসের উপযোগী নেই।


মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য মেরিন সেনা এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন হলো ‘অগ্রগামী’ বা মূল আক্রমণকারী শক্তি। সাধারণত একটি বড় আক্রমণকারী বাহিনীর অবতরণের জন্য উপকূলে প্রাথমিক অবস্থা তৈরি করতে এদের ব্যবহার করা হয়। তবে এই ধরনের বাহিনীকে যখন তাদের সক্ষমতার অতিরিক্ত বিস্তৃত করা হয়, তখন তার পরিণতি কী হতে পারে—ইতিহাসে এমন অনেক সতর্কতামূলক উদাহরণ রয়েছে।


‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সিনিয়র ফেলো ডেভিস বলেন, ‘এই বাহিনীগুলো নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে অত্যন্ত দক্ষ, কারণ তারা খুব দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা এক জায়গায় স্থির হয়ে যায়, তখনই তারা শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তখন তাদের সুরক্ষা এবং নিয়মিত রসদ সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘এটি হবে অনেকটা শুটিং গ্যালারির (মরণফাঁদ) মতো।’


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘অপারেশন মার্কেট গার্ডেন’-এর ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন আইআইএসএসের সিনিয়র ফেলো স্টুয়ার্ট। ওই অভিযানে ছত্রীসেনারা মূলত নেদারল্যান্ডসে নাৎসি জার্মানির প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।


স্টুয়ার্ট বলেন, ‘“আ ব্রিজ টু ফার” হলো আকাশপথে মোতায়েন করা এমন এক বাহিনীর ধ্রুপদি উদাহরণ, যারা কোথাও অবস্থান নিতে পারলেও তা ধরে রাখতে পারে না। পারস্য উপসাগরেও এমনটি ঘটতে পারে। কারণ, সেখানে তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতার মধ্যে থাকবে।’ তিনি এখানে ১৯৭৭ সালের শন কনারি এবং মাইকেল কেইন অভিনীত সিনেমার কথা উল্লেখ করেছেন, যা ওই সামরিক বিপর্যয়কে সামনে এনেছিল।


আক্রমণাত্মক অবস্থানে ইরান


ইরানও আক্রমণাত্মক অবস্থানে যেতে পারে। চলতি সপ্তাহে একজন ইরানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, তেহরান বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলীয় অঞ্চল দখলের জন্য প্রস্তুত। বিশ্লেষকেরা এই সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও তাঁরা বলেছেন, অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।


লন্ডনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্টিফেনস বলেন, ‘হুতিরা এখনো এই সংঘাতে প্রবেশ করেনি (অবশ্য শনিবার ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে এই সংঘাতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা)। আমার ধারণা, ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সংঘাত আরও বাড়লে তাদের কাজে লাগানোর জন্য অপেক্ষা করছে। আর স্থল আক্রমণ হবে তেমনই একটি বড় উসকানি।’


বাবেল মান্দেব প্রণালি বর্তমানে সৌদি আরবের লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব তেল রপ্তানি করা হচ্ছে। হুতিরা যদি লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।


মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনসের সাবেক চিফ অব স্টাফ ক্রুমরিক বলেন, ইরানও পারস্য উপসাগরজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি খারগ দ্বীপ দখল করতে যায়, তবে ইরান নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি পানি শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেল উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাবে।


ক্রুমরিক বলেন, ইরানের অধিকাংশ দ্বীপ দখল করে যুক্তরাষ্ট্রের খুব একটা লাভ হবে না, তবে খারগ দ্বীপ দখল করার পেছনে ‘প্রধানত অর্থনৈতিক কারণ’ থাকতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনসের সাবেক চিফ অব স্টাফ আরও বলেন, ‘এটি দখল ইরানি শাসনব্যবস্থাকে এক কঠিন সমস্যার মুখে ফেলে দেবে। যেমন আপনি কি আপনার দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের ওপর অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং কামানের গোলা নিক্ষেপ করবেন। যেখানে কিছু মার্কিন সেনা বা ছত্রীসেনা মারা যেতে পারে; কিন্তু একই সঙ্গে আপনার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও পঙ্গু হয়ে যাবে?’


তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে এই দ্বীপটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে চায়, তবে তারা স্বেচ্ছায় এমনটি করতে পারে।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা সেপ বলেন, একই সময়ে কেশম বা আবু মুসার মতো দ্বীপগুলো দখল করলে হরমুজ প্রণালি আবার উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে খুব একটা কাজে আসবে না। তিনি বলেন, ‘পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো থেকে যে সুবিধা পাওয়া যায়, তার বাইরে এই দ্বীপগুলো তেমন নতুন কোনো বাড়তি সুবিধা দেবে না।’



  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৪:৪৮ পিএম
  • আপডেট : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৪:৪৮ এএম

এ সম্পর্কিত আরও খবর


তিব্বতে ভূমিকম্প

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৪:৪৮ পিএম

ভয়াবহ হিমবাহধস ও বন্যার পর এবার তিব্বতে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫। এর উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর তিব্বতে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) গভীর রাতে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় বলে জানিয়েছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড)। প্রতিবেদন রয়টার্সের। 

 

জিএফজেডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর তিব্বতে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ও চীনের অঞ্চলগুলো থেকে কয়েক শ মাইল উত্তরে অবস্থিত। 


এর আগে বুধবার তিব্বতের নাগকু এলাকায় ৪ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের খবর জানিয়েছিল চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে।

 

এদিকে, তিব্বতে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিকভাবে পানি আটকে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় চীন বন্যা মোকাবিলায় চতুর্থ স্তরের ‘ফ্লাড রেসপন্স’ ব্যবস্থা চালু করেছে। 


সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হ্রদটির পানির স্তর ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দলকে গিরং কাউন্টিতে পাঠানো হয়েছে।


নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার আগের ও পরের চিত্র, ছবি: ইইউ স্পেস প্রোগ্রাম স্যাটেলাইট ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ২:০৮ পিএম

নেপাল সীমান্তসংলগ্ন চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ধ্বংসাবশেষের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি সরিয়ে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চীন। বুধবারের (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় সীমান্ত এলাকার শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।


বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীন উভয় দেশই হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষ জমে দুটি বাঁধসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। দলটি আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি হ্রদটির ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করছে। 


প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও জানান, দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধার ও প্রকৌশল কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।


তার মতে, হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক বাঁধের নিচু অংশে একটি পানি নিষ্কাশন চ্যানেল খনন করা। তবে চ্যানেলটির প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণের আগে পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদে কী হারে পানি জমছে, তা হিসাব করতে হবে।


জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। এতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে।


আগামী কয়েক দিনে হ্রদটির পানির স্তর ও তলদেশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন প্রকৌশলীরা।


চীন-নেপাল সীমান্তের জিরং বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্গত এলাকার উজানে মাটি ও পাথর আলগা হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহজুড়েই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।



চীনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এখনো প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলের সমান। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রচারিত একটি উদ্ধারকারী দলের আকাশপথে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাদামি রঙের বিপুল পরিমাণ পানি একটি অববাহিকায় জমে রয়েছে, যার কোনো দৃশ্যমান পানি বের হওয়ার পথ নেই। ইতোমধ্যে ওই পানি আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের তৈরি বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।


সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ৩১ দেশের প্রায় ৫৪০ জন পর্যটক রয়েছেন।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১০:২৪ এএম

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।


দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।


বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।


এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।


তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।


তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।


  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:৪৯ এএম

পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।


গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো। 


যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।


বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’ 


বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন। 


কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।


বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে। 


তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।


জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। 


এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক। 


সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’ 


অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’


কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’


ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন। 


তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা। 


এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।


৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’ 


ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’ 


অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:৫৩ পিএম

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আকস্মিক ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ওমরাহযাত্রীরা। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই মক্কার বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারের চূড়ায় একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। 


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। পবিত্র কাবা শরিফের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বিশাল ক্লক টাওয়ার। ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে একটি তীব্র আলোকচ্ছটা সরাসরি টাওয়ারের ওপর আছড়ে পড়ে।


বজ্রপাতের তীব্র আলোয় পুরো মক্কা নগরী মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে। এই রোমহর্ষক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর তা নেট দুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। 


সৌদি আরবের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় তীব্র বাতাস ও ভারী বজ্রঝড় শুরু হয়। ঝড়ের কারণে কাবা শরিফের মাতাফে (তাওয়াফের স্থান) অবস্থানরত ওমরাহযাত্রীরা তীব্র বাতাসের মুখোমুখি হন। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। 


প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মক্কা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অফিস আগামী কয়েকদিন এই এলাকায় আরও ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। 


মক্কার ক্লক টাওয়ার বা আবরাজ আল-বাইত বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন। এর চূড়ায় উন্নত বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা বা লাইটনিং রড বসানো রয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে বিশাল বজ্রপাতের পরও টাওয়ারের কোনো বড় ক্ষতি হয়নি এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে পবিত্র এলাকাটি রক্ষা পেয়েছে।


সূত্র: আল-জাজিরা


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৬:৪৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।


প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কায় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি এর তাৎপর্য নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ-ই এই তিনটি দেশ এই ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীত সময়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পারিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সাক্ষর করেছিল। তারই ধারাবাহিকতাই এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি।


এই চুক্তি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। 

তবে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের বক্তব্যই পাওয়া গেছে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশে যুক্ত হলে সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে, এই বাংলাদেশ যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী?


গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট চলছে। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এই পরিস্থিতিতে আরো জটিল করে তোলে। এমন অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। 


কেননা, এই চুক্তিতে বলা হয়েছে জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সকল দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে।


গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো সবাই এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা চুক্তি।


এই জোট গঠনের অন্যতম লক্ষ্য হলো- চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্যদেশ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এই চুক্তি বা জোটভুক্ত দেশগুলো একীভূত হয়ে তারা তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগবে।


এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


এই চুক্তিতে একই সঙ্গে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও তার বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 


তবে, কোনো এক দেশ বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি নির্ধারিত হয়নি চুক্তিতে।


এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশের এগিয়ে আসার বিষয়টিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে ‘কার্যত একই’ বলে বর্ণনা করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ।


কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না এটি বাস্তবে পরীক্ষিত হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ- সৌদি আরবের ওপর যে কোনো আক্রমণের জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে- ততক্ষণ পর্যন্ত এই চুক্তিটিকে একটি বাধ্যতামূলক ন্যাটো ধাঁচের অঙ্গীকারের পরিবর্তে একটি ‘অভিপ্রায়ের ঘোষণা’ হিসেবে দেখা উচিত।


চলতি বছরের ১৯ মার্চ ইসলামি সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে তুরস্ক-পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি কী রকম হতে পারে সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট এই চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়েছে মক্কায়।


এই চুক্তি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু এই তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বরং আরও বিস্তৃত হওয়া সম্ভব হলে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করা, যাতে একদিন এই অঞ্চলের সব দেশ এই ছাতার নিচে একত্রিত হতে পারে।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণ কী?


মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক। হঠাৎ কেন এই তিনটি দেশ এমন একটি চুক্তিকে যুক্ত হলো সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে নানা উদ্বেগ রয়েছে গত কয়েক মাস ধরে। 


বিশেষ করে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে।


এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে, এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে, শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব ও পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সেদিক থেকে তিন দেশ একে অপরের পরিপূরক।


অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই মুহূর্তে আমরা যদি দেখি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ইরান কিংবা হুথির মতো বিদ্রোহীরা। কারণ এই জটিলতা শেষ না হলে হুথি জটিলতা শেষ হবে না। সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্যাক্টটা খুব জরুরি ছিল।


অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ধরা হয় ইসরায়েলকে। সেই দিক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দেশ দুটিকে একসঙ্গে পেলে সেটি তুরস্কের জন্যও লাভবান বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, সৌদি আরবের অর্থ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ও অভিজ্ঞতা আর তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের দক্ষতা। এই দেশগুলো ভেবেছে তারা তিনটি দেশ যদি একত্রিত হয়, সেটি তাদের নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।


অন্যদিকে, ধর্মীয় দিক থেকেও এই চুক্তির বিশেষ একটি তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চুক্তিকে মুসলিম দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরতে বার হিসেবে শুক্রবার ও স্থান হিসেবে মক্কাকে বাছাই করা হয়েছে।


বাংলাদেশ কেন যুক্ত হতে চায়?


আগস্টের শুরুতে তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসছে।


বাংলাদেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে গত সপ্তাহে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এটির জবাব দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে এই জোটে বা চুক্তি যেতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান তিনি।


সেখানে হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মধ্যপ্রাচ্যে যদি এমনও হয় যে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে যাওয়াটা তো অস্বাভাবিক না। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব একটা নেই। সেদিক থেকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি আর তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল আছে। সেদিক থেকে ওই তিন দেশ সাথে একসঙ্গে থাকলে তাতে বাংলাদেশই উপকৃত হবে।


অধ্যাপক খান বলছিলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। যেহেতু বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় পাকিস্তান-তুরস্ক ও চীন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।


যদিও ইতিবাচক দিকও যেমন আছে, সেই সঙ্গে এর ঝুঁকির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা।


আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি।


তিনি বলেন, এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলে শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা।


‘এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি।’


মিশরও অনানুষ্ঠানিক এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিশর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, কারণ এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে সেই দেশগুলোর মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতও রয়েছে।