আন্দ্রেয়া রুইজ বেলো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করে এক বছরের সন্তান আলানাকে বাঁচিয়েছেন
ধ্বংসাবশেষের মধ্যে জীবনবাজি রেখে সর্বস্ব দিয়ে আগলে রেখেছেন সন্তানকে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের শরীর দিয়ে এক বছরের কন্যাসন্তানকে ধ্বংসস্তূপের হাত থেকে রক্ষা করে গেছেন। মেয়ে আলানা’কে বাঁচাতে পেরেছেন ঠিকই। তবে সন্তানের জন্য চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করে গেছেন ভেনেজুয়েলার এক মা।
সন্তানের প্রতি বীরত্বপূর্ণ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া এই নারীর নাম আন্দ্রেয়া রুইজ। তিনি দেশটির ফুটবলার হেক্টর বেলোর স্ত্রী।
ভেনিজুয়েলার উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরার কুমানা শহরের একটি বহুতল ভবনে পরিবারসহ তারা বসবাস করতেন। বুধবার শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। এ সময় শিশুটিকে বিপদ থেকে আড়াল রাখেন মা। পরে ধ্বংসস্তূপের নিচে আন্দ্রেয়ার মরদেহ পাওয়া যায়। মায়ের এই চূড়ান্ত আত্মত্যাগের কারণে ধ্বংসস্তূপ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরে শিশু আলানা। তাকে রাজধানী কারাকাসের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। শিশুটি সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
ভেনিজুয়েলার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ইউনিভিশন আন্দ্রেয়া রুইজের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে। প্রতিবেদনে মা আন্দ্রেয়ার অনন্য আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করা হয়, যিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের শরীর দিয়ে এক বছরের কন্যাসন্তানকে ধ্বংসস্তূপের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
এ ঘটনার পর ফুটবলার হেক্টর বেলো চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়েন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক পোস্টে তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে না পারা এবং পরিবারকে রক্ষা করতে না পারার গভীর অপরাধবোধ ও তীব্র মানসিক কষ্ট প্রকাশ পেয়েছে তার এসব পোস্টে। এমনকি ভবিষ্যতে বড় হওয়ার পর সন্তানকে তার মায়ের এই চিরতরে চলে যাওয়া এবং বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের কথা কীভাবে জানাবেন, তা নিয়েও তিনি চরম এক সংকটের মধ্যে রয়েছেন বলে জানান। তিনি এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার জন্য মানসিকভাবে শক্তি খুঁজছেন বলে জানিয়েছেন।
আন্দ্রেয়া রুইজের উদ্দেশে হেক্টর বেলো ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘তোমার মেয়েকে আমি কীভাবে বোঝাব যে, তুমি তার জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন হারিয়েছ, আর আমি সেখানে কিছুই করার জন্য উপস্থিত ছিলাম না? কীভাবে বোঝাব আমি? আমাকে এখন শক্তি দাও।’
মূল্যবান ভালোবাসা দিয়ে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় তাদের ছোট শিশুটির জীবন বাঁচিয়েছেন আন্দ্রেয়া রুইজ- এ কথা উল্লেখ করে হেক্টর বেলো তার ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন,‘বড় হয়ে আলানা জানতে পারবে কীভাবে তার মা নিজের জীবন দিয়ে তাকে বাঁচিয়েছে।’
ভেনেজুয়েলার ফুটবল ক্লাব মারিতিমো দে লা গুয়াইরার খেলোয়াড় হেক্টর বেলো পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি তাকে সেই গল্প শোনাব যে, তুমি কীভাবে তাকে বাঁচিয়েছ, কীভাবে তুমি আমাদের মেয়ের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছ, তুমি কেমন সাহসী নারী ছিলে যে, নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মুহূর্তেও তাকে ছেড়ে যাওনি।’
হেক্টর বেলো ধারাবাহিক পোস্টে জানিয়েছেন, তিনি কারাকাসে গিয়েছেন যেখানে তার মেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
শুক্রবার দিবাগত রাতে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমার মেয়ে এবং তার খালা ভালো আছে। তবে আজ তাদের হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হবে না। তারা হাসপাতালেই থাকছে।’
ভেনিজুয়েলার স্থানীয় ফুটবল গণমাধ্যম ও প্রচার সংস্থা কুমানা দে ক্যাম্পিওনেস ও আন্দ্রেয়া রুইজের মৃত্যু নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেছে।
সংস্থাটি তাদের বিবৃতিতে লিখেছে, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, কুমানা শহরের বাসিন্দা ফুটবলার হেক্টর বেলোর স্ত্রীকে ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে পুরো পরিবার যে ভবনটিতে বসবাস করত, সেটি ধসে পড়লেও তাদের কন্যাসন্তান অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্প্যানিশ ভাষার সংবাদমাধ্যম ইউনিভিশনও ফুটবলার বেলোর স্ত্রীর মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ করেছে। গত বুধবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর থেকে আরও অনেকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
ভেনিজুয়েলান ফুটবল ফেডারেশন এবং স্থানীয় ক্লাবগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুজন ফুটবল খেলোয়াড়ও রয়েছেন। কারাকাস ফুটবল ক্লাব জানিয়েছে, তাদের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের খেলোয়াড় রাজান সিজা লা গুয়াইরায় নিজের বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে মারা গেছেন। কারাকাস ফুটবল ক্লাব তাদের এই তরুণ প্রতিভার অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে লিখেছে, ‘তার আনন্দ, নিষ্ঠা এবং সাহচর্য এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের সাথে থাকবে।’
কারাকাসভিত্তিক ক্লাব স্পোর্ট সান অগুস্তিন তাদের ইনস্টাগ্রামে লিখেছে, ভিক্টর প্যালাসিওস তাদের একাডেমিতে একটি ‘অমোচনীয় দাগ’ রেখে গেছেন। তার চলে যাওয়ার এই বেদনা প্রকাশ করার মতো পর্যাপ্ত শব্দ আমাদের কাছে নেই।’
ভিক্টর প্যালাসিওসের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ভেনিজুয়েলান ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে যে, তিনি মারিতিমো দে লা গুয়াইরা ক্লাবের হয়েও খেলেছেন।
এদিকে সাবেক মিস ভেনিজুয়েলা গিজেল রেইস তার ইনস্টাগ্রামের এক পোস্টে জানিয়েছেন, জোড়া ভূমিকম্পের কারণে লা গুয়াইরায় তার মায়ের বহুতল ভবনটি ‘সম্পূর্ণ ধসে’ পড়ায় তার মা মারা গেছেন।
গিজেল রেইস জানিয়েছেন যে, ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনি এবং এর ভয়াবহ প্রভাবের কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মা মারা গেছেন। তার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নার্স, যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন, তিনিই এই দুঃখজনক খবরটি সবাইকে জানান।
রাজধানী কারাকাসের কাছে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৯২০ জনের মৃত্যু এবং তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। উদ্ধারকারীরা বেঁচে থাকা মানুষদের খোঁজে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালের রসুয়া অঞ্চল থেকে সৃষ্ট বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছে ২৩০০ জনের বেশি মানুষ। এর মধ্যেই তিব্বতের দিকে ভূমিধসে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবরে সেখানে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নেপালের কয়েকটি জেলায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে উদ্ধার অভিযান। শুক্রবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদীর পানি নতুন করে বাড়তে শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে থাকেন।
রয়টার্সকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, নদীর পানি বাড়ার আশঙ্কায় অনেকেই পাহাড়ের উঁচুতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহের ভিত্তিতে নিহতের সংখ্যা ৪৮৯ নিশ্চিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আটটি জেলা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে চিতওয়ানে ১৮৬ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পূর্বে) ১১২ জন, গোর্খায় ৪৪ জন, ধাদিংয়ে ৪০ জন, নুয়াকোটে ৩৭ জন, তানাহুনে ২৯ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পশ্চিমে) ২৮ জন এবং রসুয়া জেলায় ১৩ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি এখনো ২,৩৮১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ।
নিখোঁজদের মধ্যে ৬৪৪ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যারা মূলত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেইন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডার অধিবাসী। এছাড়া বিদেশ থেকে নেপালে ঘুরতে আসা ১২৭ জন প্রবাসী নেপালি এবং ১,৭৩৭ জন স্থানীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জানায়, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চললেও নতুন করে প্লাবনের শঙ্কায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
তিব্বতে ভূমিকম্প
ভয়াবহ হিমবাহধস ও বন্যার পর এবার তিব্বতে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫। এর উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর তিব্বতে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) গভীর রাতে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় বলে জানিয়েছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড)। প্রতিবেদন রয়টার্সের।
জিএফজেডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর তিব্বতে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ও চীনের অঞ্চলগুলো থেকে কয়েক শ মাইল উত্তরে অবস্থিত।
এর আগে বুধবার তিব্বতের নাগকু এলাকায় ৪ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের খবর জানিয়েছিল চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে, তিব্বতে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিকভাবে পানি আটকে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় চীন বন্যা মোকাবিলায় চতুর্থ স্তরের ‘ফ্লাড রেসপন্স’ ব্যবস্থা চালু করেছে।
সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হ্রদটির পানির স্তর ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দলকে গিরং কাউন্টিতে পাঠানো হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার আগের ও পরের চিত্র, ছবি: ইইউ স্পেস প্রোগ্রাম স্যাটেলাইট ছবি
নেপাল সীমান্তসংলগ্ন চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ধ্বংসাবশেষের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি সরিয়ে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চীন। বুধবারের (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় সীমান্ত এলাকার শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।
বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীন উভয় দেশই হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষ জমে দুটি বাঁধসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। দলটি আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি হ্রদটির ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করছে।
প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও জানান, দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধার ও প্রকৌশল কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।
তার মতে, হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক বাঁধের নিচু অংশে একটি পানি নিষ্কাশন চ্যানেল খনন করা। তবে চ্যানেলটির প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণের আগে পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদে কী হারে পানি জমছে, তা হিসাব করতে হবে।
জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। এতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে।
আগামী কয়েক দিনে হ্রদটির পানির স্তর ও তলদেশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন প্রকৌশলীরা।
চীন-নেপাল সীমান্তের জিরং বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্গত এলাকার উজানে মাটি ও পাথর আলগা হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহজুড়েই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এখনো প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলের সমান। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রচারিত একটি উদ্ধারকারী দলের আকাশপথে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাদামি রঙের বিপুল পরিমাণ পানি একটি অববাহিকায় জমে রয়েছে, যার কোনো দৃশ্যমান পানি বের হওয়ার পথ নেই। ইতোমধ্যে ওই পানি আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের তৈরি বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ৩১ দেশের প্রায় ৫৪০ জন পর্যটক রয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।
গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো।
যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।
বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’
বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে।
তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।
জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা।
এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক।
সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’
ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’
ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আকস্মিক ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ওমরাহযাত্রীরা। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই মক্কার বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারের চূড়ায় একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। পবিত্র কাবা শরিফের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বিশাল ক্লক টাওয়ার। ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে একটি তীব্র আলোকচ্ছটা সরাসরি টাওয়ারের ওপর আছড়ে পড়ে।
বজ্রপাতের তীব্র আলোয় পুরো মক্কা নগরী মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে। এই রোমহর্ষক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর তা নেট দুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সৌদি আরবের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় তীব্র বাতাস ও ভারী বজ্রঝড় শুরু হয়। ঝড়ের কারণে কাবা শরিফের মাতাফে (তাওয়াফের স্থান) অবস্থানরত ওমরাহযাত্রীরা তীব্র বাতাসের মুখোমুখি হন। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মক্কা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অফিস আগামী কয়েকদিন এই এলাকায় আরও ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
মক্কার ক্লক টাওয়ার বা আবরাজ আল-বাইত বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন। এর চূড়ায় উন্নত বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা বা লাইটনিং রড বসানো রয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে বিশাল বজ্রপাতের পরও টাওয়ারের কোনো বড় ক্ষতি হয়নি এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে পবিত্র এলাকাটি রক্ষা পেয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা