সংগৃহীত ছবি

  • প্রকাশ : সোমবার ২২ জুন, ২০২৬, সময় : ১২:৫৯ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে এক বিশেষ ধরনের বিপদ লুকিয়ে আছে, যা কোনো সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি দিয়ে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। আর বিপদটি হলো, এমন একজন নেতা, যাঁর হারানোর কিছুই নেই, অথচ তাঁর অধীন একটি আস্ত সেনাবাহিনী রয়েছে। আজকের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হলেন সেই নেতাই।


গত মার্চ মাস থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করে রাখা সংঘাতের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান গত বুধবার রাতে একটি সমঝোতা স্মারকে (অন্তর্বর্তী চুক্তি) সই করেছে। তবে এ চুক্তিতে ইসরায়েল কোনো পক্ষ ছিল না। নেতানিয়াহুও এটি অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি এ চুক্তির শর্ত মেনে চলতে কোনোভাবেই বাধ্য নন।


নেতানিয়াহুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আরও এক ধাপ এগিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কোনো ‘সময়সীমা ছাড়াই’ লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় অবস্থান করবে।


এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ওই রূপরেখা চুক্তি কার্যকর করার সব দায় সরাসরি ওয়াশিংটনের ওপর চাপিয়েছেন তিনি।


অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহও সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে, মাসের পর মাস ধরে আলোচনা চলার পর যে চুক্তিটি সই হলো, সেটি বাস্তবে এখনই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। আর এ পরীক্ষাটি নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এমন এক পক্ষ, যাকে কখনোই এ চুক্তির বেড়াজালে বাঁধা সম্ভব হয়নি।


ধৈর্য হারাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট


নেতানিয়াহুর আগের অবাধ্যতাগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তফাত হলো, হোয়াইট হাউসের সুর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একসময় নেতানিয়াহুকে একজন শর্তহীন মিত্র হিসেবে গণ্য করতেন। তবে জানা গেছে, সম্প্রতি তিনি ব্যক্তিগত আলাপে নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি লেবাননে ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করে প্রকাশ্যে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি বলব, আরেকটু সংযত হয়ে কাজ করা সম্ভব। প্রতিবার কোনো হিজবুল্লাহ সদস্য একটি ভবনে ঢুকলেই হয়তো পুরো ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’


মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও কড়া ভাষায় কথা বলেছেন। ট্রাম্পকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তিনি নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্যদের তিরস্কার করেছেন। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে তাঁদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলকে সরবরাহ করা অস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ‘মার্কিন করদাতাদের অর্থে তৈরি ও কেনা।’


এ সংঘাতের বহু আগে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হ্যান্স মর্গেনথাউ একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। বাস্তবসম্মত রাজনীতির নীতি অনুযায়ী, কোনো পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের সহনশীলতা কখনোই শর্তহীন হয় না। এটি মূলত স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। আর ওয়াশিংটনের সেই স্বার্থ এখন স্পষ্টতই বদলে যাচ্ছে।


অভ্যন্তরীণ ফাঁদ


বিদেশে নেতানিয়াহুর এ একগুঁয়েমি আসলে দেশের মাটিতে তাঁর রাজনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে জড়িত। ইরান যুদ্ধে নিজের নির্ধারণ করা বড় লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেননি তিনি। ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ঠেলে দেওয়ার পরও তেহরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন বা পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করার মতো কোনো লক্ষ্যই বাস্তবে রূপ নেয়নি।


ইরানে ইসরায়েলের হামলা ও সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে এবং একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের প্রতিবেশীদের জড়িয়ে যেকোনো যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে যে ধরনের বৈশ্বিক উদ্বেগ তৈরি হয়, এখানেও ঠিক তা-ই হয়েছে। দেশের মাটিতে নেতানিয়াহু এমন এক ভোটাভুটি বা নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে আগামী শরতে (অক্টোবর মাসে) ভোটাররা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও এখনো রয়ে গেছে। আবার, তাঁর জোট সরকার টিকে আছে এমন কিছু মন্ত্রীদের সমর্থনে, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে খোদ নেতানিয়াহুর চেয়েও চরম উগ্রপন্থী। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ যুদ্ধের শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে এ সরকারকে চরম ব্যর্থ বলে অভিযুক্ত করেছেন।


এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া শুধু যে অপ্রীতিকর তা-ই নয়, বরং এটি তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবেও মারাত্মক আত্মঘাতী হতে পারে; বিশেষ করে যখন সেই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তার পক্ষে কোনো দৃশ্যমান সাফল্য এনে দিচ্ছে না।


কেন তাঁকে বাগে আনা যাচ্ছে না


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের মূলে রয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ওয়াশিংটনই ইসরায়েলকে অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দেয়। অথচ এ তিনটির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল একজন প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের শর্ত মানাতে পারে না তারা।


জন মিয়ারশেইমার ও স্টিফেন ওয়াল্টের মতো বাস্তববাদী গবেষকেরা তাঁদের ‘ইসরায়েল লবি’ সংক্রান্ত বিশ্লেষণে দীর্ঘদিন ধরে একটি যুক্তি দেখিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাঠামো ইসরায়েলি নেতাদের এমন এক ধরনের স্বাধীনতা দেয়, যা দেশটির অন্য কোনো মিত্র রাষ্ট্র পায় না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে ইসরায়েলের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলেও এ পরিস্থিতি বদলায় না।


তাই নেতানিয়াহুর টিকে থাকার ক্ষমতা কোনো রহস্য নয়, বরং এটি মার্কিন রাজনৈতিক কাঠামোরই অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির বড় দাতাগোষ্ঠী, যার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ দাতা মিরিয়াম অ্যাডেলসন, মার্কিন সিনেটের ইসরায়েলপন্থী কট্টরপন্থী একটি অংশ ও চরমপন্থী গণমাধ্যমগুলো এখনো নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এ গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের চাপকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে তুলে ধরে।


চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরির নেপথ্য কৌশল


নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তি প্রত্যাখ্যান না করেও কীভাবে তা ভেস্তে দিতে পারেন, তার একটি কৌশলগত পথ রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এখনো চলছে। এসব হামলায় ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হিজবুল্লাহও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।


এই সংঘাতের ধারাবাহিকতা ইরানকে আবারও যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে, যে যুদ্ধ থেকে বের হতেই ইরান সম্প্রতি চুক্তিতে সই করেছে। তেহরানের আলোচকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চুক্তির মূল দলিলে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এ চুক্তির মূল চেতনার অংশ। এখন যদি ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর হতাহতের সংখ্যা বাড়তেই থাকে এবং ইরান বুঝতে পারে যে ওয়াশিংটন তার নিজের মিত্রকে থামাতে পারছে না বা থামাবে না, তবে এই ভঙ্গুর ও নতুন চুক্তি মেনে চলার কোনো আগ্রহই তেহরানের থাকবে না। চুক্তিটি ছিঁড়ে ফেলার জন্য নেতানিয়াহুর কোনো প্রকাশ্য পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। তিনি শুধু লেবাননে এখন যা করছেন, তা চালিয়ে গেলেই হবে, বাকি কাজটা ইরানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।


মূলকথা


কূটনীতির ভাষায় এমন কিছু পক্ষ থাকে, যারা কোনো চুক্তিতে বাধ্য নয় এবং যাদের কোনো ভেটো দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাও নেই, অথচ তারা পুরো চুক্তিটি নস্যাৎ করে দিতে পারে। এদের বলা হয় ‘স্পয়লার’ বা চুক্তি বিনষ্টকারী। নেতানিয়াহু এখন ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করছেন। তা তিনি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকেই করুন বা এই বিশ্বাস থেকেই করুন যে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সময়সীমার চেয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসন চাইছে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (যেমন ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বা রূপরেখার মাধ্যমে) মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত থামাতে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত হয়। এটি ওয়াশিংটনের একটি কূটনৈতিক ছক বা সময় পরিকল্পনা। তবে নেতানিয়াহু মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক করে দেওয়া এই সময়ে যুদ্ধ (ইরান কিংবা লেবাননে ইসরায়েলি হামলা) থামালে ইসরায়েলের সামরিক উদ্দেশ্য সফল হবে না। হিজবুল্লাহ বা ইরানকে পুরোপুরি দুর্বল না করে এখনই চুক্তি মেনে নেওয়াটা তাঁর মতে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ।


মনে রাখতে হবে, কোনো সংঘাত বা সংকটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার পরও যে পক্ষকে কখনোই চুক্তিতে সই করতে বলা হয়নি, শুধু তাদের নীরবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যেকোনো শান্তিচুক্তি আসলে চরম ভঙ্গুর হয়ে থাকে।





নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার আগের ও পরের চিত্র, ছবি: ইইউ স্পেস প্রোগ্রাম স্যাটেলাইট ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ২:০৮ পিএম

নেপাল সীমান্তসংলগ্ন চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ধ্বংসাবশেষের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি সরিয়ে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চীন। বুধবারের (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় সীমান্ত এলাকার শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।


বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীন উভয় দেশই হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষ জমে দুটি বাঁধসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। দলটি আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি হ্রদটির ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করছে। 


প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও জানান, দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধার ও প্রকৌশল কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।


তার মতে, হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক বাঁধের নিচু অংশে একটি পানি নিষ্কাশন চ্যানেল খনন করা। তবে চ্যানেলটির প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণের আগে পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদে কী হারে পানি জমছে, তা হিসাব করতে হবে।


জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। এতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে।


আগামী কয়েক দিনে হ্রদটির পানির স্তর ও তলদেশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন প্রকৌশলীরা।


চীন-নেপাল সীমান্তের জিরং বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্গত এলাকার উজানে মাটি ও পাথর আলগা হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহজুড়েই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।



চীনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এখনো প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলের সমান। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রচারিত একটি উদ্ধারকারী দলের আকাশপথে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাদামি রঙের বিপুল পরিমাণ পানি একটি অববাহিকায় জমে রয়েছে, যার কোনো দৃশ্যমান পানি বের হওয়ার পথ নেই। ইতোমধ্যে ওই পানি আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের তৈরি বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।


সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ৩১ দেশের প্রায় ৫৪০ জন পর্যটক রয়েছেন।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১০:২৪ এএম

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।


দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।


বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।


এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।


তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।


তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।


  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:৪৯ এএম

পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।


গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো। 


যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।


বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’ 


বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন। 


কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।


বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে। 


তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।


জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। 


এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক। 


সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’ 


অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’


কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’


ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন। 


তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা। 


এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।


৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’ 


ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’ 


অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:৫৩ পিএম

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আকস্মিক ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ওমরাহযাত্রীরা। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই মক্কার বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারের চূড়ায় একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। 


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। পবিত্র কাবা শরিফের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বিশাল ক্লক টাওয়ার। ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে একটি তীব্র আলোকচ্ছটা সরাসরি টাওয়ারের ওপর আছড়ে পড়ে।


বজ্রপাতের তীব্র আলোয় পুরো মক্কা নগরী মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে। এই রোমহর্ষক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর তা নেট দুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। 


সৌদি আরবের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় তীব্র বাতাস ও ভারী বজ্রঝড় শুরু হয়। ঝড়ের কারণে কাবা শরিফের মাতাফে (তাওয়াফের স্থান) অবস্থানরত ওমরাহযাত্রীরা তীব্র বাতাসের মুখোমুখি হন। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। 


প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মক্কা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অফিস আগামী কয়েকদিন এই এলাকায় আরও ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। 


মক্কার ক্লক টাওয়ার বা আবরাজ আল-বাইত বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন। এর চূড়ায় উন্নত বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা বা লাইটনিং রড বসানো রয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে বিশাল বজ্রপাতের পরও টাওয়ারের কোনো বড় ক্ষতি হয়নি এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে পবিত্র এলাকাটি রক্ষা পেয়েছে।


সূত্র: আল-জাজিরা


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৬:৪৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।


প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কায় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি এর তাৎপর্য নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ-ই এই তিনটি দেশ এই ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীত সময়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পারিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সাক্ষর করেছিল। তারই ধারাবাহিকতাই এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি।


এই চুক্তি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। 

তবে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের বক্তব্যই পাওয়া গেছে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশে যুক্ত হলে সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে, এই বাংলাদেশ যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী?


গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট চলছে। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এই পরিস্থিতিতে আরো জটিল করে তোলে। এমন অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। 


কেননা, এই চুক্তিতে বলা হয়েছে জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সকল দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে।


গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো সবাই এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা চুক্তি।


এই জোট গঠনের অন্যতম লক্ষ্য হলো- চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্যদেশ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এই চুক্তি বা জোটভুক্ত দেশগুলো একীভূত হয়ে তারা তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগবে।


এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


এই চুক্তিতে একই সঙ্গে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও তার বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 


তবে, কোনো এক দেশ বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি নির্ধারিত হয়নি চুক্তিতে।


এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশের এগিয়ে আসার বিষয়টিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে ‘কার্যত একই’ বলে বর্ণনা করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ।


কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না এটি বাস্তবে পরীক্ষিত হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ- সৌদি আরবের ওপর যে কোনো আক্রমণের জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে- ততক্ষণ পর্যন্ত এই চুক্তিটিকে একটি বাধ্যতামূলক ন্যাটো ধাঁচের অঙ্গীকারের পরিবর্তে একটি ‘অভিপ্রায়ের ঘোষণা’ হিসেবে দেখা উচিত।


চলতি বছরের ১৯ মার্চ ইসলামি সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে তুরস্ক-পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি কী রকম হতে পারে সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট এই চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়েছে মক্কায়।


এই চুক্তি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু এই তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বরং আরও বিস্তৃত হওয়া সম্ভব হলে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করা, যাতে একদিন এই অঞ্চলের সব দেশ এই ছাতার নিচে একত্রিত হতে পারে।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণ কী?


মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক। হঠাৎ কেন এই তিনটি দেশ এমন একটি চুক্তিকে যুক্ত হলো সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে নানা উদ্বেগ রয়েছে গত কয়েক মাস ধরে। 


বিশেষ করে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে।


এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে, এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে, শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব ও পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সেদিক থেকে তিন দেশ একে অপরের পরিপূরক।


অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই মুহূর্তে আমরা যদি দেখি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ইরান কিংবা হুথির মতো বিদ্রোহীরা। কারণ এই জটিলতা শেষ না হলে হুথি জটিলতা শেষ হবে না। সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্যাক্টটা খুব জরুরি ছিল।


অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ধরা হয় ইসরায়েলকে। সেই দিক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দেশ দুটিকে একসঙ্গে পেলে সেটি তুরস্কের জন্যও লাভবান বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, সৌদি আরবের অর্থ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ও অভিজ্ঞতা আর তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের দক্ষতা। এই দেশগুলো ভেবেছে তারা তিনটি দেশ যদি একত্রিত হয়, সেটি তাদের নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।


অন্যদিকে, ধর্মীয় দিক থেকেও এই চুক্তির বিশেষ একটি তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চুক্তিকে মুসলিম দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরতে বার হিসেবে শুক্রবার ও স্থান হিসেবে মক্কাকে বাছাই করা হয়েছে।


বাংলাদেশ কেন যুক্ত হতে চায়?


আগস্টের শুরুতে তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসছে।


বাংলাদেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে গত সপ্তাহে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এটির জবাব দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে এই জোটে বা চুক্তি যেতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান তিনি।


সেখানে হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মধ্যপ্রাচ্যে যদি এমনও হয় যে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে যাওয়াটা তো অস্বাভাবিক না। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব একটা নেই। সেদিক থেকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি আর তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল আছে। সেদিক থেকে ওই তিন দেশ সাথে একসঙ্গে থাকলে তাতে বাংলাদেশই উপকৃত হবে।


অধ্যাপক খান বলছিলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। যেহেতু বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় পাকিস্তান-তুরস্ক ও চীন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।


যদিও ইতিবাচক দিকও যেমন আছে, সেই সঙ্গে এর ঝুঁকির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা।


আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি।


তিনি বলেন, এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলে শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা।


‘এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি।’


মিশরও অনানুষ্ঠানিক এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিশর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, কারণ এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে সেই দেশগুলোর মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতও রয়েছে।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ২:৪৭ পিএম

বিশ্বে প্রথমবারের মতো সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের এক রোগীর মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করেছেন চিকিৎসকেরা। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এই অস্ত্রোপচার না করা হলে ওই ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারতেন। ৪৮ বছর বয়সী রিস হিবার্ট দুই সন্তানের বাবা। তিনি যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সরাসরি এআইয়ের সহায়তায় তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন।


অস্ত্রোপচারের সময় এআইয়ের একটি ব্যবস্থা সরাসরি ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকদের সহায়তা করে। মস্তিষ্কের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাইরে থেকে দেখা যায় না—এমন রক্তনালি ও স্নায়ুগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করে চিকিৎসকদের সতর্ক করে দেয় এআই–ব্যবস্থা। ফলে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই টিউমারটি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।


হিবার্ট বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তার দিক থেকে এআইয়ের সহায়তার বড় সুবিধা রয়েছে। কারণ, আমাদের মাথার ভেতরে তো আর পথ চেনার কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না।’


কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ৪৮ বছর বয়সী হিবার্ট ১৮ মাস আগেও সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। প্রতিদিন দুপুরে তিনি প্রায় দুই মাইল হাঁটতেন। এমনই এক দুপুরে হাঁটার সময় রাস্তায় হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ে যান তিনি এবং তাঁর খিঁচুনি শুরু হয়।


স্বাস্থ্য পরীক্ষায় হিবার্টের মস্তিষ্কে ১১ মিলিমিটার আকারের একটি টিউমার ধরা পড়ে। টিউমারটিতে ক্যানসারের ঝুঁকি ছিল না। এটি বেড়ে উঠেছিল পিটুইটারি গ্রন্থিতে। মস্তিষ্কের নিচের দিকে থাকা মার্বেলের মতো ছোট একটি গ্রন্থি পিটুইটারি। এটি শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া এবং রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে।


পিটুইটারি গ্রন্থির খুব কাছেই রয়েছে ক্যারোটিড ধমনি। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী এই রক্তনালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কাছেই রয়েছে দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অপটিক স্নায়ু।


হিবার্টের টিউমারটি বড় হতে থাকায় তাঁর অপটিক স্নায়ুর ওপর চাপ পড়তে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছিল।


শুরুতে হিবার্টের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু পরে ঝাপসা দেখার কারণে তিনি হাঁটার সময় বিভিন্ন জিনিসে হোঁচট খেতে শুরু করেন। একই সঙ্গে প্রচণ্ড ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার সমস্যাও দেখা দেয়।


হিবার্ট বলেন, ১৮ বছর ধরে দাম্পত্য জীবনে তিনি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীর জন্য এক কাপ কফি বানাতেন। তিনি ঠিক করেছিলেন, এই টিউমার তাঁকে সেই কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।


অস্ত্রোপচারের আগে হিবার্টের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মানসিক ও আবেগজনিত। তাঁর ভাষায়, অনেকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও তিনি কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি।


চিকিৎসকেরা হিবার্টকে তাঁদের তৈরি এআই–ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রথম রোগী হিসেবে অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হন।


হিবার্ট বলেন, রোগীরা গবেষণায় অংশ নিতে প্রস্তুত না হলে চিকিৎসকেরা কীভাবে শিখবেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কীভাবে হবে?


অস্ত্রোপচারের সময় হিবার্টের নাক দিয়ে একটি সরু ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে খুলির নিচের অংশে নেওয়া হয়। সেখানে টিউমারটি হাড় ও শক্ত একটি আবরণের আড়ালে ছিল। টিউমারটি বের করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা শনাক্ত করা সহজ ছিল না। কারণ, প্রত্যেক মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ গঠন কিছুটা আলাদা।


চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এ ধরনের অস্ত্রোপচারে টিউমারের পুরোটা অপসারণ করতে না পারার আশঙ্কা ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ। আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ।


এখানেই এআই–ব্যবস্থা চিকিৎসকদের সহায়তা করেছে। অস্ত্রোপচারের সময় অন্য একটি পর্দায় এআই–ব্যবস্থা সরাসরি ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করেছে এবং মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ু যেখানে থাকার সম্ভাবনা বেশি, সেসব জায়গা চিহ্নিত করেছে। কোন অংশ দিয়ে টিউমার অপসারণ করা তুলনামূলক নিরাপদ, সেটিও দেখিয়েছে।


মুঠোফোনে মুখ শনাক্ত করার প্রযুক্তির মতোই কাজ করেছে এআই–ব্যবস্থা। তবে মুখের পরিবর্তে এটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক সময় আড়ালে থাকা শারীরিক গঠন শনাক্ত করেছে।


যুক্তরাজ্যের একজন চিকিৎসক বছরে এ ধরনের ১০ থেকে ২০টি অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের আগে করা স্ক্যান দেখে রোগীর মস্তিষ্কের গঠন সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তাঁরা অস্ত্রোপচার করেন।


গবেষকেরা পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার অপসারণের শত শত অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে এআই–ব্যবস্থাটিকে প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা করেছেন। প্রতিটি ভিডিওতে রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে এআই–ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক গঠনগুলো শনাক্ত করতে শিখেছে।


অস্ত্রোপচারে যুক্ত অধ্যাপক হানি মার্কাস বলেন, একজন চিকিৎসক সারা জীবনে যত অস্ত্রোপচার দেখেন বা করেন, তার চেয়েও বেশি অস্ত্রোপচারের তথ্য দিয়েছে প্রশিক্ষিত এই এআই–ব্যবস্থা। তাই এটি একজন বিশেষজ্ঞের মতো কাজ করতে পারে।


হানি মার্কাস বলেন, পরীক্ষামূলক অন্য অনেক এআই–ব্যবস্থার সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এটি অস্ত্রোপচারের সময় সরাসরি কাজ করতে পারে।


তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এআই চিকিৎসকদের শুধু সহায়তা করেছে। অস্ত্রোপচারের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল চিকিৎসকদের হাতেই।


অধ্যাপক মার্কাস বলেন, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো চিকিৎসকদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা অনেকটা চ্যাটজিপিটির মতো কাজ করবে। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা চাইলে এর কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারবেন। আবার পরামর্শের সঙ্গে একমত না হলে তা উপেক্ষাও করতে পারবেন।


যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ এবং গুগলের অর্থায়নে গবেষকেরা কয়েক বছর ধরে পরীক্ষাগারে এআই প্রযুক্তিটি নিয়ে কাজ করেছেন। প্রথমবার বাস্তব অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার নিয়েও তাঁরা সন্তুষ্ট। এখন বড় পরিসরে এর পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।


অস্ত্রোপচারের পর হিবার্ট বলেন, চোখ খোলার পর তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন চারপাশের সবকিছু খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি এতটা পরিষ্কার দেখতে পাননি।


অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহে হিবার্টের দৃষ্টিশক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর কর্মশক্তিও ফিরে এসেছে। অস্ত্রোপচারের আগে থাকা অন্যান্য সমস্যাও চলে গেছে। তিনি বলেন, অস্ত্রোপচার তাঁকে তাঁর জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।