যুক্তরাষ্ট্রে দুই যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষের পর প্যারাস্যুট নিয়ে বেরিয়ে আসেন চার ক্রু।

  • প্রকাশ : সোমবার ১৮ মে, ২০২৬, সময় : ৬:৩৬ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম আইডাহোর ‘মাউন্টেন হোম এয়ারফোর্স বেজ’-এ গতকাল রোববার এয়ার শো চলাকালে নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষ হয়েছে। তবে এ দুর্ঘটনার শিকার যুদ্ধবিমানের চারজন ক্রুই নিরাপদে প্যারাস্যুট দিয়ে নেমে আসতে সক্ষম হয়েছেন।


যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফ্লিটের নৌবাহিনীর মুখপাত্র কমান্ডার অ্যামেলিয়া উমায়াম এক বিবৃতিতে জানান, যুদ্ধবিমান দুটি যখন আকাশে কসরত দেখাচ্ছিল, তখনই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুই বিমানের চারজন ক্রু নিরাপদে বের হয়ে আসতে পেরেছেন এবং দুর্ঘটনাটির তদন্ত চলছে। বিমানঘাঁটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্রুদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।


এয়ার শোর অন্যতম পরিকল্পনাকারী সংস্থা সিলভার উইংস অব আইডাহোর বিপণন পরিচালক কিম সাইকস বলেন, সামরিক ঘাঁটিতে থাকা অন্য কেউ এ ঘটনায় আহত হননি। বিমানঘাঁটি কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই পুরো ঘাঁটি লকডাউন (অবরুদ্ধ) করা হয় এবং এয়ার শোর বাকি অংশ বাতিল করা হয়।


দর্শনার্থীদের অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, বোইসি শহর থেকে প্রায় ৫০ মাইল (৮০ কিলোমিটার) দক্ষিণে ঘাঁটির কাছে বিমান দুটি যখন মাটিতে আছড়ে পড়ছিল, তখন আকাশে চারটি প্যারাস্যুট খুলছে।


‘ইএ-১৮জি গ্রোলার’ হলো আধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তিসমৃদ্ধ ‘এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট’ ফাইটার জেটের একটি উন্নত সংস্করণ।


প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ


শেন অগডেন নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, যুদ্ধবিমান দুটি যখন কাছাকাছি আসছিল, তখন তিনি ভিডিও করছিলেন। তাঁর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিমান দুটির একটির সঙ্গে অন্যটির সংঘর্ষ হয়। এরপর একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামতে থাকে। ঠিক তখনই ক্রু সদস্যরা বিমান প্যারাস্যুট নিয়ে থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর বিমান দুটি একসঙ্গে মাটিতে আছড়ে পড়ে বিশাল আগুনের গোলায় পরিণত হয়। আর ক্রু সদস্যরা পাশেই মাটিতে নেমে আসেন।


টেক্সট বার্তায় অগডেন বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম বিমান দুটি আলাদা হয়ে যাবে, তাই ভিডিও করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ওটা ঘটে গেল এবং আমি বাকি অংশটুকুও ভিডিও করলাম।’ দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীদের কাজে যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।


আয়োজকেরা জানান, এই জনপ্রিয় এয়ার শোতে বিমান চালনা ও প্যারাস্যুট জাম্পের প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিমান চালনার ইতিহাস এবং আধুনিক সামরিক সক্ষমতা তুলে ধরা হচ্ছিল। দুই দিনব্যাপী এই শোর মূল আকর্ষণ ছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘থান্ডারবার্ডস’ স্কোয়াড্রন।


মার্কিন আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় আকাশ পরিষ্কার ছিল এবং বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৯ মাইল (৪৭ কিলোমিটার)।


বিশেষজ্ঞদের মতামত


মাঝ আকাশে সংঘর্ষের পরও দুই বিমানের সব ক্রুর বেঁচে ফেরাটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। বিমানের নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ জেফ গুজেত্তি বলেন, বিমান দুটি যেভাবে সংঘর্ষের পর মাঝ আকাশে আটকে ছিল এবং একসঙ্গে মাটিতে আছড়ে পড়েছে, সম্ভবত সে কারণেই ক্রুরা বের হওয়ার সময় পেয়েছেন। সাধারণত মাঝ আকাশে সংঘর্ষ হলে ক্রুদের বের হওয়ার সুযোগ থাকে না।


গুজেত্তি বলেন, ‘এটি সত্যিই দেখার মতো দৃশ্য। মনে হচ্ছে, বিমান দুটি ভিন্নভাবে একে অপরকে আঘাত করেছিল, যার ফলে বিমান দুটি ভেঙে টুকরা না হয়ে একসঙ্গে আটকে ছিল। আর এটাই হয়তো তাদের জীবন বাঁচিয়েছে।’


গুজেত্তি আরও যোগ করেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এটি পাইলটের কোনো ভুলের কারণে হয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। ফরমেশন ফ্লাইটে (একসঙ্গে দল বেঁধে ওড়ার সময়) অন্য বিমানের কাছাকাছি যাওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এটি নিখুঁতভাবে করতে হয়।’


আরেক বিমান নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ এবং সেফটি অপারেটিং সিস্টেমের সিইও জন কক্স বলেন, এয়ার শোতে যাঁরা অংশ নেন, তাঁরা সেরা পাইলটদের অন্যতম। এখানে ভুলের কোনো সুযোগ থাকে না। তিনি আরও বলেন, ‘এয়ার শোতে বিমান চালানো খুবই কঠিন কাজ। এখানে সামান্য ভুলের মাশুল অনেক বড়। আমি খুশি যে সবাই নিরাপদে বের হতে পেরেছেন।’


অতীত দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি


২০১৮ সালের পর এই ঘাঁটিতে এটিই প্রথম ‘গানফাইটার স্কাইস’ ইভেন্ট ছিল। ২০১৮ সালের ওই শোতে হ্যাং গ্লাইডার দুর্ঘটনায় একজন পাইলট মারা যান। এর আগে ২০০৩ সালে একটি থান্ডারবার্ডস বিমান কসরত দেখানোর সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। সেবার পাইলট অক্ষত ছিলেন এবং মাটিতে আছড়ে পড়ার মাত্র এক সেকেন্ড আগে বিমানটিকে দর্শকদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিজে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন।


যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ২০০টি এয়ার শো হয় এবং কয়েক বছর ধরে এর নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব এয়ার শোজ’-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও জন কুডাহি বলেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মার্কিন এয়ার শোগুলোয় বছরে গড়ে ৩ দশমিক ৮ জন মানুষের মৃত্যু হতো। সেই সংখ্যা এখন অনেক কমে এসেছে।


কুডাহি বলেন, ২০১৭ সাল থেকে মৃত্যুর গড় সংখ্যা বছরে মাত্র ১ দশমিক ১ জনে নেমে এসেছে, যার মধ্যে ২০২২ সালে ডালাসের একটি দুর্ঘটনাও রয়েছে। সেখানে দুটি পুরোনো বিমানের সংঘর্ষে ছয়জন মারা গিয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০২৩ বা ২০২৫ সালে এয়ার শোতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এবং ১৯৫২ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এয়ার শো দেখতে এসে কোনো দর্শকের মৃত্যু হয়নি।


কুডাহি বলেন, ‘নিরাপত্তার দিক থেকে আমরা সত্যিই একটি চমৎকার সময় পার করছি, যেখানে দুর্ঘটনা অনেক কম।’


তদন্তের অগ্রগতি


গতকালের দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তকারীরা হয়তো দ্রুতই জানতে পারবেন। যেহেতু দুই বিমানের সব ক্রু বেঁচে আছেন, তাই তাঁরা সংঘর্ষের ঠিক আগে কী দেখেছিলেন এবং কী ঘটেছিল, তা বিস্তারিত জানাতে পারবেন। তদন্তের দায়িত্বে থাকবে মার্কিন নৌবাহিনী। তবে সামরিক তদন্ত হওয়ায় বেসামরিক দুর্ঘটনার মতো এর সব তথ্য হয়তো জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে না।


ইরান যুদ্ধের কারণে এই বছর বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে এয়ার শো বাতিল করা হয়েছে। কারণ, সেখানকার সামরিক ইউনিটগুলো ওই যুদ্ধের মিশনে ব্যস্ত রয়েছে।



  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৪:৪৮ পিএম
  • আপডেট : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৪:৪৮ এএম

এ সম্পর্কিত আরও খবর


তিব্বতে ভূমিকম্প

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৪:৪৮ পিএম

ভয়াবহ হিমবাহধস ও বন্যার পর এবার তিব্বতে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫। এর উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর তিব্বতে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) গভীর রাতে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় বলে জানিয়েছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড)। প্রতিবেদন রয়টার্সের। 

 

জিএফজেডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর তিব্বতে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ও চীনের অঞ্চলগুলো থেকে কয়েক শ মাইল উত্তরে অবস্থিত। 


এর আগে বুধবার তিব্বতের নাগকু এলাকায় ৪ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের খবর জানিয়েছিল চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে।

 

এদিকে, তিব্বতে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিকভাবে পানি আটকে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় চীন বন্যা মোকাবিলায় চতুর্থ স্তরের ‘ফ্লাড রেসপন্স’ ব্যবস্থা চালু করেছে। 


সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হ্রদটির পানির স্তর ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দলকে গিরং কাউন্টিতে পাঠানো হয়েছে।


নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার আগের ও পরের চিত্র, ছবি: ইইউ স্পেস প্রোগ্রাম স্যাটেলাইট ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ২:০৮ পিএম

নেপাল সীমান্তসংলগ্ন চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ধ্বংসাবশেষের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি সরিয়ে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চীন। বুধবারের (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় সীমান্ত এলাকার শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।


বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীন উভয় দেশই হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষ জমে দুটি বাঁধসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। দলটি আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি হ্রদটির ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করছে। 


প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও জানান, দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধার ও প্রকৌশল কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।


তার মতে, হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক বাঁধের নিচু অংশে একটি পানি নিষ্কাশন চ্যানেল খনন করা। তবে চ্যানেলটির প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণের আগে পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদে কী হারে পানি জমছে, তা হিসাব করতে হবে।


জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। এতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে।


আগামী কয়েক দিনে হ্রদটির পানির স্তর ও তলদেশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন প্রকৌশলীরা।


চীন-নেপাল সীমান্তের জিরং বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্গত এলাকার উজানে মাটি ও পাথর আলগা হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহজুড়েই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।



চীনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এখনো প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলের সমান। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রচারিত একটি উদ্ধারকারী দলের আকাশপথে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাদামি রঙের বিপুল পরিমাণ পানি একটি অববাহিকায় জমে রয়েছে, যার কোনো দৃশ্যমান পানি বের হওয়ার পথ নেই। ইতোমধ্যে ওই পানি আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের তৈরি বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।


সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ৩১ দেশের প্রায় ৫৪০ জন পর্যটক রয়েছেন।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১০:২৪ এএম

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।


দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।


বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।


এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।


তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।


তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।


  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:৪৯ এএম

পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।


গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো। 


যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।


বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’ 


বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন। 


কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।


বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে। 


তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।


জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। 


এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক। 


সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’ 


অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’


কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’


ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন। 


তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা। 


এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।


৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’ 


ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’ 


অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:৫৩ পিএম

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আকস্মিক ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ওমরাহযাত্রীরা। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই মক্কার বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারের চূড়ায় একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। 


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। পবিত্র কাবা শরিফের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বিশাল ক্লক টাওয়ার। ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে একটি তীব্র আলোকচ্ছটা সরাসরি টাওয়ারের ওপর আছড়ে পড়ে।


বজ্রপাতের তীব্র আলোয় পুরো মক্কা নগরী মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে। এই রোমহর্ষক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর তা নেট দুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। 


সৌদি আরবের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় তীব্র বাতাস ও ভারী বজ্রঝড় শুরু হয়। ঝড়ের কারণে কাবা শরিফের মাতাফে (তাওয়াফের স্থান) অবস্থানরত ওমরাহযাত্রীরা তীব্র বাতাসের মুখোমুখি হন। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। 


প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মক্কা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অফিস আগামী কয়েকদিন এই এলাকায় আরও ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। 


মক্কার ক্লক টাওয়ার বা আবরাজ আল-বাইত বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন। এর চূড়ায় উন্নত বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা বা লাইটনিং রড বসানো রয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে বিশাল বজ্রপাতের পরও টাওয়ারের কোনো বড় ক্ষতি হয়নি এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে পবিত্র এলাকাটি রক্ষা পেয়েছে।


সূত্র: আল-জাজিরা


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৬:৪৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।


প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কায় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি এর তাৎপর্য নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ-ই এই তিনটি দেশ এই ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীত সময়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পারিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সাক্ষর করেছিল। তারই ধারাবাহিকতাই এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি।


এই চুক্তি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। 

তবে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের বক্তব্যই পাওয়া গেছে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশে যুক্ত হলে সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে, এই বাংলাদেশ যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী?


গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট চলছে। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এই পরিস্থিতিতে আরো জটিল করে তোলে। এমন অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। 


কেননা, এই চুক্তিতে বলা হয়েছে জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সকল দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে।


গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো সবাই এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা চুক্তি।


এই জোট গঠনের অন্যতম লক্ষ্য হলো- চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্যদেশ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এই চুক্তি বা জোটভুক্ত দেশগুলো একীভূত হয়ে তারা তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগবে।


এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


এই চুক্তিতে একই সঙ্গে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও তার বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 


তবে, কোনো এক দেশ বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি নির্ধারিত হয়নি চুক্তিতে।


এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশের এগিয়ে আসার বিষয়টিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে ‘কার্যত একই’ বলে বর্ণনা করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ।


কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না এটি বাস্তবে পরীক্ষিত হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ- সৌদি আরবের ওপর যে কোনো আক্রমণের জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে- ততক্ষণ পর্যন্ত এই চুক্তিটিকে একটি বাধ্যতামূলক ন্যাটো ধাঁচের অঙ্গীকারের পরিবর্তে একটি ‘অভিপ্রায়ের ঘোষণা’ হিসেবে দেখা উচিত।


চলতি বছরের ১৯ মার্চ ইসলামি সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে তুরস্ক-পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি কী রকম হতে পারে সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট এই চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়েছে মক্কায়।


এই চুক্তি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু এই তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বরং আরও বিস্তৃত হওয়া সম্ভব হলে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করা, যাতে একদিন এই অঞ্চলের সব দেশ এই ছাতার নিচে একত্রিত হতে পারে।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণ কী?


মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক। হঠাৎ কেন এই তিনটি দেশ এমন একটি চুক্তিকে যুক্ত হলো সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে নানা উদ্বেগ রয়েছে গত কয়েক মাস ধরে। 


বিশেষ করে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে।


এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে, এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে, শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব ও পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সেদিক থেকে তিন দেশ একে অপরের পরিপূরক।


অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই মুহূর্তে আমরা যদি দেখি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ইরান কিংবা হুথির মতো বিদ্রোহীরা। কারণ এই জটিলতা শেষ না হলে হুথি জটিলতা শেষ হবে না। সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্যাক্টটা খুব জরুরি ছিল।


অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ধরা হয় ইসরায়েলকে। সেই দিক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দেশ দুটিকে একসঙ্গে পেলে সেটি তুরস্কের জন্যও লাভবান বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, সৌদি আরবের অর্থ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ও অভিজ্ঞতা আর তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের দক্ষতা। এই দেশগুলো ভেবেছে তারা তিনটি দেশ যদি একত্রিত হয়, সেটি তাদের নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।


অন্যদিকে, ধর্মীয় দিক থেকেও এই চুক্তির বিশেষ একটি তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চুক্তিকে মুসলিম দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরতে বার হিসেবে শুক্রবার ও স্থান হিসেবে মক্কাকে বাছাই করা হয়েছে।


বাংলাদেশ কেন যুক্ত হতে চায়?


আগস্টের শুরুতে তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসছে।


বাংলাদেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে গত সপ্তাহে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এটির জবাব দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে এই জোটে বা চুক্তি যেতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান তিনি।


সেখানে হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মধ্যপ্রাচ্যে যদি এমনও হয় যে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে যাওয়াটা তো অস্বাভাবিক না। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব একটা নেই। সেদিক থেকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি আর তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল আছে। সেদিক থেকে ওই তিন দেশ সাথে একসঙ্গে থাকলে তাতে বাংলাদেশই উপকৃত হবে।


অধ্যাপক খান বলছিলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। যেহেতু বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় পাকিস্তান-তুরস্ক ও চীন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।


যদিও ইতিবাচক দিকও যেমন আছে, সেই সঙ্গে এর ঝুঁকির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা।


আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি।


তিনি বলেন, এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলে শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা।


‘এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি।’


মিশরও অনানুষ্ঠানিক এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিশর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, কারণ এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে সেই দেশগুলোর মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতও রয়েছে।