ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় এখন ইসরায়েলকে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। নেতিবাচকভাবে দেখা দেশের তালিকায় ইসরায়েলের আগে আছে উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরান। আর পঞ্চম স্থানে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ বিশ্বের যে পাঁচটি দেশকে সবচেয়ে খারাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র চলে এসেছে।
আন্তর্জাতিক ডেটা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নিরা ডেটা’ প্রকাশিত ২০২৬ সালের গণতন্ত্র ও দেশ–সম্পর্কিত এক বৈশ্বিক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ইতিবাচক মনোভাব থাকা শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো সুইজারল্যান্ড, কানাডা, জাপান, সুইডেন ও ইতালি।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ (বৈশ্বিক দেশ–ধারণা সূচক, ২০২৬) তলানিতে জায়গা পেয়েছে ইসরায়েল। বিশ্বের ১২৯টি দেশ ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর ৪৬ হাজার ৬৬৭ জন উত্তরদাতার মতামতের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
তালিকাটি নিরা ডেটার ‘ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ (গণতন্ত্র ধারণা সূচক, ২০২৬) এর সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ৯৮টি দেশের ৯৪ হাজার ১৪৬ জন নাগরিক তাঁদের দেশের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা কেমন, সে বিষয়ে সরাসরি মতামত দিয়েছেন।
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত হত্যা, ফিলিস্তিনিদের গণবাস্তুচ্যুতি, অনাহার নীতি ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল যে দিন দিন একঘরে হয়ে পড়ছে, এ ফলাফল তারই আরেক বড় প্রমাণ।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আদালতগুলো দখলদার এ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক করার পর থেকেই বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ধসে পড়েছে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক অবস্থানে বড় ধরনের ধস নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে ওয়াশিংটন এখন বিশ্বের সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন হওয়া পাঁচ দেশের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তারা এখন রাশিয়া ও চীনেরও নিচে নেমে গেছে।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের নেট রেটিং বা স্কোর ২০২৪ সালের প্লাস ২২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে মাইনাস ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ৩৮ পয়েন্টের বড় পতন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ক্ষোভের কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের এ পতন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, আগ্রাসী শুল্কনীতি, গ্রিনল্যান্ডসংক্রান্ত হুমকি, ইউক্রেনে সহায়তা হ্রাস, ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে ওয়াশিংটনের ভূমিকা।
জরিপ অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইসরায়েলের পর যুক্তরাষ্ট্রকে এখন বিশ্বের জন্য একটি বড় বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ গণতন্ত্র মূল্যায়ন সূচকটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক গণতান্ত্রিক জরিপ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি অন্যান্য সূচকের মতো না হয়ে, এটি সরাসরি নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত নেয়। এতে নির্বাচন, বাক্স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, নাগরিক শিক্ষা, ক্ষমতার পৃথক্করণ, আইনের শাসন, সরকারি স্বচ্ছতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তরসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হয়।
গাজায় নৃশংস হামলা চালানোর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জনমত তীব্রভাবে বিপক্ষে চলে যাওয়ার কারণেই মূলত দখলদার ইসরায়েলের এমন নেতিবাচক অবস্থান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, গাজার অধিকাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে এবং প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও গণহত্যাবিষয়ক গবেষকেরা গাজার এই পরিস্থিতিকে একটি পরিকল্পিত জাতিগত হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরিপের ফলাফল স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলকে ক্রমাগত সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ায় ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হচ্ছে। একের পর এক যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসনগুলো জাতিসংঘে ইসরায়েলকে জবাবদিহি করা থেকে রক্ষা করেছে এবং অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
তবে এ জরিপ দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক জনমত এখন মার্কিন শক্তিকে বিচারহীনতা, দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ ও মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার যুদ্ধের এক প্রতীক হিসেবেই বেশি দেখছে।
ছবি : সংগৃহীত
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) চলতি বছরের অক্টোবরে রায় ঘোষণা করতে পারে বলে জানিয়েছে গাম্বিয়া।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওআইসির ২৩তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনের ফাঁকে বিশেষ বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে এই তথ্য জানান গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী দাওদা এ. জাল্লোর।
গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে জানান, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জেনোসাইড সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অক্টোবরে রায় দিতে পারে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার দায় নির্ধারণে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তা তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখতে এবং এ টেকসই সমাধানে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করে তাদের মিয়ানমারে ফেরার পথ সুগম করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালের রসুয়া অঞ্চল থেকে সৃষ্ট বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছে ২৩০০ জনের বেশি মানুষ। এর মধ্যেই তিব্বতের দিকে ভূমিধসে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবরে সেখানে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নেপালের কয়েকটি জেলায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে উদ্ধার অভিযান। শুক্রবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদীর পানি নতুন করে বাড়তে শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে থাকেন।
রয়টার্সকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, নদীর পানি বাড়ার আশঙ্কায় অনেকেই পাহাড়ের উঁচুতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহের ভিত্তিতে নিহতের সংখ্যা ৪৮৯ নিশ্চিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আটটি জেলা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে চিতওয়ানে ১৮৬ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পূর্বে) ১১২ জন, গোর্খায় ৪৪ জন, ধাদিংয়ে ৪০ জন, নুয়াকোটে ৩৭ জন, তানাহুনে ২৯ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পশ্চিমে) ২৮ জন এবং রসুয়া জেলায় ১৩ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি এখনো ২,৩৮১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ।
নিখোঁজদের মধ্যে ৬৪৪ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যারা মূলত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেইন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডার অধিবাসী। এছাড়া বিদেশ থেকে নেপালে ঘুরতে আসা ১২৭ জন প্রবাসী নেপালি এবং ১,৭৩৭ জন স্থানীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জানায়, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চললেও নতুন করে প্লাবনের শঙ্কায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
তিব্বতে ভূমিকম্প
ভয়াবহ হিমবাহধস ও বন্যার পর এবার তিব্বতে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫। এর উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর তিব্বতে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) গভীর রাতে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় বলে জানিয়েছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড)। প্রতিবেদন রয়টার্সের।
জিএফজেডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর তিব্বতে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ও চীনের অঞ্চলগুলো থেকে কয়েক শ মাইল উত্তরে অবস্থিত।
এর আগে বুধবার তিব্বতের নাগকু এলাকায় ৪ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের খবর জানিয়েছিল চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে, তিব্বতে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিকভাবে পানি আটকে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় চীন বন্যা মোকাবিলায় চতুর্থ স্তরের ‘ফ্লাড রেসপন্স’ ব্যবস্থা চালু করেছে।
সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হ্রদটির পানির স্তর ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দলকে গিরং কাউন্টিতে পাঠানো হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার আগের ও পরের চিত্র, ছবি: ইইউ স্পেস প্রোগ্রাম স্যাটেলাইট ছবি
নেপাল সীমান্তসংলগ্ন চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ধ্বংসাবশেষের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি সরিয়ে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চীন। বুধবারের (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় সীমান্ত এলাকার শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।
বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীন উভয় দেশই হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষ জমে দুটি বাঁধসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। দলটি আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি হ্রদটির ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করছে।
প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও জানান, দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধার ও প্রকৌশল কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।
তার মতে, হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক বাঁধের নিচু অংশে একটি পানি নিষ্কাশন চ্যানেল খনন করা। তবে চ্যানেলটির প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণের আগে পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদে কী হারে পানি জমছে, তা হিসাব করতে হবে।
জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। এতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে।
আগামী কয়েক দিনে হ্রদটির পানির স্তর ও তলদেশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন প্রকৌশলীরা।
চীন-নেপাল সীমান্তের জিরং বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্গত এলাকার উজানে মাটি ও পাথর আলগা হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহজুড়েই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এখনো প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলের সমান। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রচারিত একটি উদ্ধারকারী দলের আকাশপথে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাদামি রঙের বিপুল পরিমাণ পানি একটি অববাহিকায় জমে রয়েছে, যার কোনো দৃশ্যমান পানি বের হওয়ার পথ নেই। ইতোমধ্যে ওই পানি আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের তৈরি বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ৩১ দেশের প্রায় ৫৪০ জন পর্যটক রয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।
গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো।
যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।
বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’
বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে।
তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।
জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা।
এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক।
সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’
ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’
ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।