যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ১৪ দফার নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ করা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা।
গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নতুন প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছেন, তবে এখনো চুক্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের পাঠানো আগের প্রস্তাবটি নিয়ে হতাশা প্রকাশের এক দিন পর এ কথা বলেন ট্রাম্প।
গত বৃহস্পতিবার রাতে তেহরান ১৪ দফা প্রস্তাব পাকিস্তানকে পাঠায়। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যে ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল, তার পাল্টায় ১৪ দফা প্রস্তাব তৈরি করে তেহরান।
ইরানে যুদ্ধবিরতি শুরুর কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। তবে এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরান কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। তেহরান চায় যুদ্ধের স্থায়ী অবসান। আর ট্রাম্প চাইছেন ইরান প্রথমে হরমুজ প্রণালিতে চলমান অবরোধ বন্ধ করুক। গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি নিয়েও আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ শুরু করে ইরান। পরে ট্রাম্প প্রশাসনও ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ শুরু করে। যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যেও নৌ অবরোধ চলতে থাকে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের জাহাজে হামলা, আটক এবং বাধা দেওয়ার ঘটনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের নতুন প্রস্তাবটিতে কী আছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা গ্রহণ করবেন কি না।
ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবে কী আছে
ইরানের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের ১৪ দফা প্রস্তাবটি মূলত ওয়াশিংটনের দেওয়া ৯ দফা শান্তি পরিকল্পনার জবাব। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রস্তাবের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দুই মাসের একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। ইরানের এই ১৪ দফা পরিকল্পনা মূলত একটি বিস্তৃত শান্তিকাঠামো, যা শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতির বদলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে ইঙ্গিত করছে।
নতুন শান্তি প্রস্তাবে ইরান বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর চেয়ে যুদ্ধ অবসানের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চায়। এ ছাড়া তারা ৩০ দিনের মধ্যে সব বিষয় নিষ্পত্তি করতে চায়।
নতুন প্রস্তাবে ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা, ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, শতকোটি ডলার মূল্যের জব্দকৃত ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, সব শত্রুতা বন্ধ (লেবাননসহ) এবং ‘হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
গত বছরের জুনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছিল ইরান। দেশটি ভবিষ্যতে যেকোনো আগ্রাসন না হওয়ার নিশ্চয়তা চায়। ইসরায়েল এর আগে ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় নাশকতা চালিয়েছে।
ট্রাম্প কি এ প্রস্তাব গ্রহণ করবেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে বলেছেন, তিনি ইরানের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ইরান বাজে আচরণ করলে ওয়াশিংটন নতুন করে হামলা শুরু করবে।
গত শনিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত আছেন।
কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনার মধ্যেও আবার হামলা শুরু করা না–করা প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট আগের মতোই কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন।
হামলা আবার শুরু হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি খারাপ কিছু করে, তাহলে সেটা আবারও ঘটার সম্ভাবনা আছে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব ভালো অবস্থানে’ আছে। তিনি দাবি করেন, ইরান সমঝোতার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। কারণ, কয়েক মাসের সংঘাত ও নৌ অবরোধে দেশটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়েছেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ইরানের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হওয়া কঠিন। কারণ, গত ৪৭ বছরে ইরান মানবজাতি এবং বিশ্বকে যে ক্ষতির মধ্যে ফেলেছে, তার জন্য যথেষ্ট মূল্য পরিশোধ করেনি তারা।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মুসগ্রেভ মনে করেন, ট্রাম্প সম্ভবত ইরানের নতুন প্রস্তাবটি না পড়েই বা এর সম্পর্কে পুরোপুরি তথ্য না নিয়েই তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আগের শান্তি প্রস্তাবগুলোতে কী ছিল
ইরানে গত মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির এক দিন আগে তেহরান একটি ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, ইরানের ১০ দফা ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব’, তবে ‘যথেষ্ট ভালো নয়’।
২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা ১৫ দফা পরিকল্পনার জবাবে গত ৭ এপ্রিল ইরান এ প্রস্তাব দিয়েছিল।
ওয়াশিংটনের ওই পরিকল্পনায় এক মাসের যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ ছিল। তাতে বলা হয়েছিল, এ সময়ের মধ্যে দুই পক্ষ পাকিস্তানের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা করবে।
ইসরায়েলের চ্যানেল টুয়েলভের তথ্য বলছে, প্রস্তাবে নাতাঞ্জ, ইস্পাহান ও ফোরদোতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা, ইরানের পক্ষ থেকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার স্থায়ী অঙ্গীকার, ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে হস্তান্তর, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক অবকাঠামোর সব অংশ পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া, হরমুজ প্রণালি আবারও চালু করা এবং ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো ছিল। এ ছাড়া এতে জাতিসংঘের সেই ব্যবস্থার অবসান করার কথা বলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়।
তবে ইরান এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা বলেছিল, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পুনর্গঠিত হয়ে আবারও হামলা চালানোর সুযোগ করে দেবে। এর পরিবর্তে তারা তাদের ১০ দফা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল।
বর্তমানে পরিস্থিতি কী
যুদ্ধবিরতি চলতে থাকলেও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) শনিবার বলেছে, হামলার জবাব দিতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছে। কারণ, আগের চুক্তিগুলো মানার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনীহা দেখেছিল তারা।
গতকাল রোববার আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছে, ‘এটার অর্থ একটাই, তা হলো ট্রাম্পকে এখন অসম্ভব এক সামরিক অভিযান পরিচালনা অথবা ইরানের সঙ্গে একটি খারাপ চুক্তির মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প সুযোগগুলো কমে এসেছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে তেহরান। এতে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম গেছে বেড়ে।
ইরানকে চাপ দিতে গত ১৩ এপ্রিল সব ইরানি বন্দরে অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তেল ও গ্যাস–সংকট আরও তীব্র হয়। শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১১১ দশমিক ২৯ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৬৫ ডলারের মতো।
ট্রাম্প সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে ‘খুব লাভজনক ব্যবসা’ বলার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ট্রাম্প ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা পণ্যবাহী যান দখল করেছি। তেল দখল করেছি। এটি একটি খুব লাভজনক ব্যবসা। কে ভাবতে পেরেছিল যে আমরা জলদস্যুর মতো আচরণ করব! আমরা কিন্তু কোনো খেলা খেলছি না।’
এই মন্তব্যের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ‘জলদস্যুতার এক নিন্দনীয় স্বীকারোক্তি’ বলে আখ্যা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি আল–জাজিরাকে বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ট্রাম্পের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে এবং পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করছে।
ত্রিতা পারসি বলেন, ‘আলোচনা চলছিল এবং অবরোধ থাকুক বা না থাকুক, তা চলতে পারত।’
পারসি আরও বলেন, ‘নৌ অবরোধ ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং উল্টো এটি কূটনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।’
তাঁর মতে, নৌ অবরোধ আরোপের আগে ট্রাম্প কূটনৈতিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন। যদি তিনি সেই অবস্থায় সময়কে কাজে লাগাতেন, তাহলে ইরানের বিপরীতে তিনি অনেক শক্ত অবস্থানে থাকতেন।
ট্রাম্প জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় একটি নৌ চলাচল বিষয়ক জোট গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও ভাবছেন। এর নাম হতে পারে মেরিটাইম ফ্রিডম কন্সট্রাক্ট (এমএফসি)। এর উদ্দেশ্য হবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই জোটের মূল কাজ হবে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করা, কূটনৈতিক সমন্বয় করা এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।
ছবি : সংগৃহীত
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) চলতি বছরের অক্টোবরে রায় ঘোষণা করতে পারে বলে জানিয়েছে গাম্বিয়া।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওআইসির ২৩তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনের ফাঁকে বিশেষ বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে এই তথ্য জানান গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী দাওদা এ. জাল্লোর।
গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে জানান, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জেনোসাইড সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অক্টোবরে রায় দিতে পারে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার দায় নির্ধারণে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তা তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখতে এবং এ টেকসই সমাধানে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করে তাদের মিয়ানমারে ফেরার পথ সুগম করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালের রসুয়া অঞ্চল থেকে সৃষ্ট বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছে ২৩০০ জনের বেশি মানুষ। এর মধ্যেই তিব্বতের দিকে ভূমিধসে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবরে সেখানে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নেপালের কয়েকটি জেলায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে উদ্ধার অভিযান। শুক্রবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদীর পানি নতুন করে বাড়তে শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে থাকেন।
রয়টার্সকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, নদীর পানি বাড়ার আশঙ্কায় অনেকেই পাহাড়ের উঁচুতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহের ভিত্তিতে নিহতের সংখ্যা ৪৮৯ নিশ্চিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আটটি জেলা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে চিতওয়ানে ১৮৬ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পূর্বে) ১১২ জন, গোর্খায় ৪৪ জন, ধাদিংয়ে ৪০ জন, নুয়াকোটে ৩৭ জন, তানাহুনে ২৯ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পশ্চিমে) ২৮ জন এবং রসুয়া জেলায় ১৩ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি এখনো ২,৩৮১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ।
নিখোঁজদের মধ্যে ৬৪৪ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যারা মূলত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেইন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডার অধিবাসী। এছাড়া বিদেশ থেকে নেপালে ঘুরতে আসা ১২৭ জন প্রবাসী নেপালি এবং ১,৭৩৭ জন স্থানীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জানায়, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চললেও নতুন করে প্লাবনের শঙ্কায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
তিব্বতে ভূমিকম্প
ভয়াবহ হিমবাহধস ও বন্যার পর এবার তিব্বতে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫। এর উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর তিব্বতে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) গভীর রাতে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় বলে জানিয়েছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড)। প্রতিবেদন রয়টার্সের।
জিএফজেডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর তিব্বতে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ও চীনের অঞ্চলগুলো থেকে কয়েক শ মাইল উত্তরে অবস্থিত।
এর আগে বুধবার তিব্বতের নাগকু এলাকায় ৪ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের খবর জানিয়েছিল চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে, তিব্বতে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিকভাবে পানি আটকে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় চীন বন্যা মোকাবিলায় চতুর্থ স্তরের ‘ফ্লাড রেসপন্স’ ব্যবস্থা চালু করেছে।
সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হ্রদটির পানির স্তর ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দলকে গিরং কাউন্টিতে পাঠানো হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার আগের ও পরের চিত্র, ছবি: ইইউ স্পেস প্রোগ্রাম স্যাটেলাইট ছবি
নেপাল সীমান্তসংলগ্ন চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ধ্বংসাবশেষের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি সরিয়ে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চীন। বুধবারের (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় সীমান্ত এলাকার শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।
বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীন উভয় দেশই হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষ জমে দুটি বাঁধসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। দলটি আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি হ্রদটির ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করছে।
প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও জানান, দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধার ও প্রকৌশল কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।
তার মতে, হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক বাঁধের নিচু অংশে একটি পানি নিষ্কাশন চ্যানেল খনন করা। তবে চ্যানেলটির প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণের আগে পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদে কী হারে পানি জমছে, তা হিসাব করতে হবে।
জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। এতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে।
আগামী কয়েক দিনে হ্রদটির পানির স্তর ও তলদেশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন প্রকৌশলীরা।
চীন-নেপাল সীমান্তের জিরং বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্গত এলাকার উজানে মাটি ও পাথর আলগা হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহজুড়েই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এখনো প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলের সমান। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রচারিত একটি উদ্ধারকারী দলের আকাশপথে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাদামি রঙের বিপুল পরিমাণ পানি একটি অববাহিকায় জমে রয়েছে, যার কোনো দৃশ্যমান পানি বের হওয়ার পথ নেই। ইতোমধ্যে ওই পানি আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের তৈরি বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ৩১ দেশের প্রায় ৫৪০ জন পর্যটক রয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।
গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো।
যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।
বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’
বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে।
তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।
জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা।
এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক।
সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’
ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’
ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।