ছবি : সংগৃহীত
ব্যাপক হামলা-পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ ১১তম দিন অতিক্রম করেছে। এ অবস্থায় যুদ্ধ শুরুর পর গত সোমবার রাতে প্রথমবারের মতো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ওই আলোচনার পর গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, শিগগিরই এ যুদ্ধের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, এটি আধিপত্য ধরে রাখতে যুদ্ধ; আলোচনা, যুদ্ধবিরতি এবং আবার যুদ্ধ– এ চক্র চালু রাখার চেষ্টা। ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। মঙ্গলবার ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো ও অবস্থানে হামলা চালায় ইরান।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৩৩৯ জন আহতকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ জন চিকিৎসাধীন। গতকাল এক দিনে ১৯১ জনকে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ১০ জন আতঙ্কজনিত রোগে ভুগছেন। বিবিসি জানায়, গতকাল মধ্য ইসরায়েলের আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।
বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি আবাসিক ভবনে ইরানের হামলায় ২৯ বছরের এক তরুণী নিহত হয়েছেন। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, হামলায় আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। সৌদি আরব বলছে, গত সোমবার রাতে তারা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পাঁচটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনী বলছে, তারা ছয়টি ড্রোন ধ্বংস করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল মঙ্গলবার জানায়, তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকিয়েছে। দেশটি জানায়, ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় ইরবিলে তাদের কনস্যুলেটে ড্রোন আঘাত হেনেছে। বাহরাইনের একটি হোটেলে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তেহরান টাইমস জানায়, ওই হোটেলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন।
বিবিসি ফার্সি জানিয়েছে, ইরানের তেহরান ও কারাজে গত রাতে তীব্র হামলা হয়েছে। বাসিন্দারা বলছেন, এসব হামলা আগের রাতের তুলনায় বেশ তীব্র। বারবার তারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। আলজাজিরা জানায়, গতকাল পূর্ব তেহরানের আবাসিক এলাকায় হামলায় অন্তত ৪০ ইরানি নিহত হয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য উল্লেখ করে এএফপি জানায়, ইরানে ১০ দিনে পাঁচ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ৫০টির বেশি নৌযানকে।
গত সোমবার ইস্পাহানসহ অন্যান্য বড় শহরেও হামলা হয়। ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি এলাকায় হামলা হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। এ ছাড়া গভর্নরের কার্যালয়েও হামলা হয়েছে। ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব-ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত একটি প্রাচীন প্রাসাদও বোমায় গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি দুই দফা যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টি ইঙ্গিত করেন। দুবারই আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়। তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বলছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য শর্ত হলো; ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কখনও আক্রমণ করা হবে না– এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমা হামলা উপেক্ষা করে নতুন নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জানাতে রাজধানী তেহরানে হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ দৃশ্য দেখা যায়। রয়টার্স জানায়, তাদের হাতে ইরানের পতাকা ও আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি দেখা গেছে।
গতকাল ইসরায়েলের বেইত শমেশ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে ইরান। তা ছাড়া মধ্য ইসরায়েলে সাইরেন শোনা গেছে। এটি ইরানের ৩৩তম হামলা। এ ছাড়া উত্তর ইরাকের কুর্দি অঞ্চলের হারির ঘাঁটিতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক সদরদপ্তরে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথাও জানিয়েছে দেশটি।
ইরানে খাবার ও মানবিক সহায়তা দিচ্ছে আজারবাইজান। ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলি লারিজানি বলেছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হুমকিতে ভয় পায় না। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে আইআরজিসি।
এদিকে ট্রাম্প যুদ্ধ থামানোর আভাস দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১৩% কমে গেছে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের অবাধ প্রবাহের অনুমতি দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ ‘ব্যর্থ’ হয়েছে: আরাঘচি
আলজাজিরা জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে একটি ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেন, ‘তাদের প্রথম পরিকল্পনা (প্ল্যান এ) ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা অন্য পরিকল্পনাগুলো কার্যকর করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেগুলোও একইভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। এ কারণেই তারা আবাসিক এলাকাগুলোতে নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে তারা বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে। আমি দেখছি না– তারা কোনো যৌক্তিক লক্ষ্য অনুসরণ করছে। শুরুতে তারা তাদের উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। এখন ১০ দিন পার হওয়ার পর আমার মনে হয়, তারা পুরোপুরি লক্ষ্যহীন হয়ে পড়েছে।’
আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচার মাধ্যম পিবিএস নিউজকে গত সোমবার রাতে বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে মোজতবা খামেনির নিয়োগ প্রসঙ্গে বলেন, আলি খামেনির ছেলেকে নিয়োগ দেওয়ায় শাসন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে। সেই সঙ্গে কিছুটা স্থিতিশীলতাও এনে দেবে।
যুদ্ধবিরতি চায় না ইরান, বললেন দেশটির স্পিকার
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না। সামাজিক মাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। কারণ আমরা মনে করি, আগ্রাসনকারীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে, যাতে সে শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনও আমাদের প্রিয় ইরানে হামলার কথা ভাবতে না পারে। তিনি বলেন, ‘জায়নবাদী শাসন ব্যবস্থা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য যুদ্ধ, আলোচনা, যুদ্ধবিরতি এবং আবার যুদ্ধ– এ চক্র চালু রাখতে চায়। আমরা এই চক্র ভেঙে দেব।’
যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরান এ যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ করবে: আইআরজিসি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) বলেছে, ইরানই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলা যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ করবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ‘(মধ্যপ্রাচ্য) অঞ্চলের সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে; মার্কিন বাহিনী এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারবে না।’ এর আগে আইআরজিসি বলেছিল, তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি করতে দেবে না।
শিগগিরই ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটবে, বলছেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ‘শিগগিরই’ শেষ হতে যাচ্ছে। গত সোমবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, এ যুদ্ধ পরিকল্পনার চেয়েও দ্রুতগতিতে লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে। এ বক্তব্যের আগে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ট্রাম্প বলেন, পুতিন মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত নিরসনে ‘সহায়তা করতে’ ইচ্ছুক। এ সময় ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মনে করেন, ‘যুদ্ধটি সম্পূর্ণ; প্রায় সম্পূর্ণ।’ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা নিয়েও তিনি ইরানকে সতর্ক করেন।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো তেল রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না– আইআরজিসির এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তেলের প্রবাহ বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের ওপর এ যাবৎকালের চেয়ে ২০ গুণ কঠোর হামলা চালানো হবে।’
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প-পুতিনের প্রথম ফোনালাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ফোনে কথা বলেছেন ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, গত সোমবার রাতে এ ফোনালাপে ইরান যুদ্ধের দ্রুত অবসানে পুতিন তাঁর প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ। উশাকভ বলেন, ‘ইরান সংঘাতের দ্রুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট বেশ কিছু বিবেচ্য বিষয় তুলে ধরেছেন।’
পুতিন-পেজেশকিয়ান ফোনালাপ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন টেলিফোনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি ইরানকে উত্তজেনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ক্রেমলিনের বরাত দিয়ে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাস এ কথা জানায়। এতে বলা হয়, পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনাকালে পুতিন দ্রুততম সময়ে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনা হ্রাস এবং রাজনৈতিক উপায়ে এর সমাধানের পক্ষে তাঁর নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন। এর আগে সোমবার ট্রাম্প ও পুতিনের ফোনালাপ হয়।
তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ‘ন্যায্যতা নেই’: এরদোয়ান
বিবিসি জানিয়েছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘন কোনোভাবেই ন্যায্যতা পেতে পারে না। তিনি বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর হামলা কোনো পক্ষকেই সাহায্য করছে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে এরদোয়ান বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনীতির পথ খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে তুরস্ক।
নেতানিয়াহু নিহত হওয়ার খবর, অস্বীকার ইসরায়েলের
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি লিখেছে, তেহরানের চালানো হামলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মারা গেছেন বা আহত হয়েছেন– এমন জল্পনা হিব্রু ভাষার বিভিন্ন সূত্রে ক্রমেই বাড়ছে। তবে ওই খবর নাকচ করে ইসরায়েলের জেরুজালেম পোস্ট লিখেছে, নেতানিয়াহুর মৃত্যু বা আহত হওয়ার ‘গুজব ছড়াচ্ছে ইরানের গণমাধ্যম’।
খবরটি সামাজিক মাধ্যমে বেশ প্রচার হচ্ছে। নেতানিয়াহু যে সত্যিই মারা গিয়ে থাকতে পারেন, তার পক্ষে কিছু যুক্তি হাজির করেছে তাসনিম নিউজ এজেন্সি। তারা বলছে, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত চ্যানেলে তাঁর সর্বশেষ ভিডিও প্রকাশের পর প্রায় তিন দিন পেরিয়ে গেছে। এর পর থেকে তাঁর নামে যেসব বক্তব্য আসছে, তার সবই লিখিত। কয়েকটি হিব্রু সূত্র জানায়, ৮ মার্চ নেতানিয়াহুর বাসভবনের নিরাপত্তা বলয় আরও জোরদার করা হয়। এ ছাড়া ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার ও দূত স্টিভ উইটকফের ইসরায়েল সফর বাতিল হওয়ার ঘটনাও এ পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে তাসনিম নিউজ এজেন্সি লিখেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে এসব জল্পনার বিষয়ে কিছু নিশ্চিত করা যায়নি। জেরুজালেম পোস্ট এ গুঞ্জনকে ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করেছে। নেতানিয়াহুর বাসভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নেতানিয়াহুর ভাই নিহত হয়েছেন ও বেন-গাভির গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
লেবানন সীমান্তের কাছে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে রকেট হামলা
লেবানন সীমান্তের কাছে ইসরায়েলের সেনাদের লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, তাদের যোদ্ধারা স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় লেবাননের সীমান্ত শহর মেইস আল-জাবালে ইসরায়েলের সেনাদের ওপর হামলা চালায়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আল-নামিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন। আলজাজিরার প্রতিনিধিরা জানান, দক্ষিণ লেবাননের বিনত জবেইল জেলার হাদ্দাতা শহরেও ইসরায়েল বিমান হামলা চালিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটিতে ২ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৪৪ জন।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালের রসুয়া অঞ্চল থেকে সৃষ্ট বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছে ২৩০০ জনের বেশি মানুষ। এর মধ্যেই তিব্বতের দিকে ভূমিধসে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবরে সেখানে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নেপালের কয়েকটি জেলায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে উদ্ধার অভিযান। শুক্রবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদীর পানি নতুন করে বাড়তে শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে থাকেন।
রয়টার্সকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, নদীর পানি বাড়ার আশঙ্কায় অনেকেই পাহাড়ের উঁচুতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহের ভিত্তিতে নিহতের সংখ্যা ৪৮৯ নিশ্চিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আটটি জেলা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে চিতওয়ানে ১৮৬ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পূর্বে) ১১২ জন, গোর্খায় ৪৪ জন, ধাদিংয়ে ৪০ জন, নুয়াকোটে ৩৭ জন, তানাহুনে ২৯ জন, নওয়ালপরাসী (বারদাঘাট সুস্তা পশ্চিমে) ২৮ জন এবং রসুয়া জেলায় ১৩ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি এখনো ২,৩৮১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ।
নিখোঁজদের মধ্যে ৬৪৪ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যারা মূলত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেইন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডার অধিবাসী। এছাড়া বিদেশ থেকে নেপালে ঘুরতে আসা ১২৭ জন প্রবাসী নেপালি এবং ১,৭৩৭ জন স্থানীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জানায়, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চললেও নতুন করে প্লাবনের শঙ্কায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
তিব্বতে ভূমিকম্প
ভয়াবহ হিমবাহধস ও বন্যার পর এবার তিব্বতে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫। এর উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর তিব্বতে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) গভীর রাতে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় বলে জানিয়েছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড)। প্রতিবেদন রয়টার্সের।
জিএফজেডের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর তিব্বতে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ও চীনের অঞ্চলগুলো থেকে কয়েক শ মাইল উত্তরে অবস্থিত।
এর আগে বুধবার তিব্বতের নাগকু এলাকায় ৪ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের খবর জানিয়েছিল চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে, তিব্বতে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিকভাবে পানি আটকে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় চীন বন্যা মোকাবিলায় চতুর্থ স্তরের ‘ফ্লাড রেসপন্স’ ব্যবস্থা চালু করেছে।
সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হ্রদটির পানির স্তর ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দলকে গিরং কাউন্টিতে পাঠানো হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার আগের ও পরের চিত্র, ছবি: ইইউ স্পেস প্রোগ্রাম স্যাটেলাইট ছবি
নেপাল সীমান্তসংলগ্ন চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে ধ্বংসাবশেষের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি সরিয়ে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি কমাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চীন। বুধবারের (২৬ আগস্ট) আকস্মিক বন্যায় সীমান্ত এলাকার শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্সের।
বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীন উভয় দেশই হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষ জমে দুটি বাঁধসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। দলটি আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি হ্রদটির ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করছে।
প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও জানান, দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি প্রাচীর তৈরি হয়েছে, যা উদ্ধার ও প্রকৌশল কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।
তার মতে, হ্রদটির ঝুঁকি কমানোর সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিক বাঁধের নিচু অংশে একটি পানি নিষ্কাশন চ্যানেল খনন করা। তবে চ্যানেলটির প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণের আগে পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদে কী হারে পানি জমছে, তা হিসাব করতে হবে।
জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। এতে বর্তমানে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে আছে।
আগামী কয়েক দিনে হ্রদটির পানির স্তর ও তলদেশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন প্রকৌশলীরা।
চীন-নেপাল সীমান্তের জিরং বন্দর এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্গত এলাকার উজানে মাটি ও পাথর আলগা হয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহজুড়েই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এখনো প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে। এই পানির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুলের সমান। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রচারিত একটি উদ্ধারকারী দলের আকাশপথে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাদামি রঙের বিপুল পরিমাণ পানি একটি অববাহিকায় জমে রয়েছে, যার কোনো দৃশ্যমান পানি বের হওয়ার পথ নেই। ইতোমধ্যে ওই পানি আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের তৈরি বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ৩১ দেশের প্রায় ৫৪০ জন পর্যটক রয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।
গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো।
যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।
বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’
বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে।
তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।
জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা।
এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক।
সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’
ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’
ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আকস্মিক ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ওমরাহযাত্রীরা। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই মক্কার বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারের চূড়ায় একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। পবিত্র কাবা শরিফের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বিশাল ক্লক টাওয়ার। ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে একটি তীব্র আলোকচ্ছটা সরাসরি টাওয়ারের ওপর আছড়ে পড়ে।
বজ্রপাতের তীব্র আলোয় পুরো মক্কা নগরী মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে। এই রোমহর্ষক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর তা নেট দুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সৌদি আরবের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় তীব্র বাতাস ও ভারী বজ্রঝড় শুরু হয়। ঝড়ের কারণে কাবা শরিফের মাতাফে (তাওয়াফের স্থান) অবস্থানরত ওমরাহযাত্রীরা তীব্র বাতাসের মুখোমুখি হন। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মক্কা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অফিস আগামী কয়েকদিন এই এলাকায় আরও ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
মক্কার ক্লক টাওয়ার বা আবরাজ আল-বাইত বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন। এর চূড়ায় উন্নত বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা বা লাইটনিং রড বসানো রয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে বিশাল বজ্রপাতের পরও টাওয়ারের কোনো বড় ক্ষতি হয়নি এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে পবিত্র এলাকাটি রক্ষা পেয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা