পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। ছবি: সংগৃহীত
পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস সরাফাতসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গত বৃহস্পতিবার রাজধনীর গুলশান থানায় মামলাটি করে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। মামলার অন্য আসামিরা হলেন চৌধুরী নাফিস সরাফাতের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ, তাদের ছেলে রাহীব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরী ও সহযোগী ড. হাসান তাহের ইমাম।
গতকাল শুক্রবার সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, চৌধুরী নাফিস সরাফাত তার সহযোগী ড. হাসান তাহের ইমামকে সঙ্গে নিয়ে ২০০৮ সালে রেইস ম্যানেজমেন্ট নামে একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির লাইসেন্স গ্রহণ করে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে অবৈধ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। পরে স্ত্রী ও সহযোগী কাহের ইমামকে নিয়ে ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগ করে তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) শেয়ার কেনেন এবং পরে ব্যাংকটির পর্ষদের পরিচালক পদ লাভ করেন। এমনকি কৌশলে চৌধুরী নাফিস সরাফাত তার স্ত্রীকে সাউথইস্ট ব্যাংকেরও পরিচালক করেন। এরপর অভিযুক্তরা চতুরতার সঙ্গে ফান্ডের টাকায় মাল্টি সিকিউরিটিজ নামে একটি ব্রোকার হাউজ করে তার ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে প্রতারণা করে ফান্ডের অর্থ হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া চৌধুরী নাফিস সরাফাত পদ্মা ব্যাংকের টাকা দিয়ে পদ্মা ব্যাংক সিকিউরিটিজসহ তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে স্ট্র্যাটেজিক ইক্যুইটি নামে ফান্ড কেনেন বা বিনিয়োগ করেন, যার অধীন একাধিক ফান্ড রয়েছে।
জসীম উদ্দিন খান বলেন, অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, জাল-জালিয়াতির ব্যাপ্তি এতই বিস্তিৃত ছিল যে, হিসাব বিও ও অন্যান্য ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনাসহ রাজউক থেকে একাধিক প্লট হাতিয়ে নিয়ে বিভিন্ন নামীয় প্রতিষ্ঠান/বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে বিদেশে অর্থ পাচারের পথ সুগম করেছিলেন অভিযুক্তরা।
অনুসন্ধানকালে চৌধুরী নাফিস সরাফাত, তার স্ত্রী ও ছেলে এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে ৭৮টি হিসাব পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ওই হিসাবগুলোতে ১ হাজার ৮০৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা জমা এবং প্রায় ১ হাজার ৮০৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানকালে সিআইডি আরও জানতে পেরেছে, চৌধুরী নাফিস সরাফাত ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন কানাডা ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত কোম্পানি এবং আঞ্জুমান আরা শাহীদের নামে সিঙ্গাপুরের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ১৫টি যৌথ হিসাব রয়েছে। সেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা জমা রয়েছে। এ ছাড়া রাহীব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরীর নামে বিদেশে বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে ৭৬টি হিসাব পরিচালনা করার তথ্য পাওয়া যায়। চৌধুরী নাফিস সরাফাতের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তিন রুমের একটি ফ্ল্যাট ও পাঁচ রুমের একটি ভিলা রয়েছে বলেও তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার পতাকা
যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে যুদ্ধজনিত নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ডলার- কারণে দেশটির ব্যবসায়ীরা সরাসরি মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন না। সে জন্য তাঁরা তৃতীয় কোনো দেশ থেকে পরিশোধ করতে চান বাংলাদেশি পণ্যের দাম।
এদিকে মিয়ানমারে রপ্তানি হওয়া পণ্যের দাম তৃতীয় কোনো দেশ থেকে আনার অনুমতি চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন করেছে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান।
এ নিয়ে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আবেদনটি অনুমোদন করা হবে। জানা গেছে, ‘এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গত জুলাই মাসে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে রপ্তানির অর্থ আনার অনুমতি চেয়ে এনবিআরে আবেদন করে। আবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, আলু ও ওষুধ আমদানি করতে আগ্রহী; কিন্তু সেখানে যুদ্ধপরিস্থিতিতে নিরাপত্তাঝুঁকি ও ডলার-সংকট থাকায় তাঁরা সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন না। তাই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা দুবাই থেকে বাংলাদেশি পণ্যের দাম পরিশোধ করতে চান।
বাংলাদেশের পণ্য টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়েই মিয়ানমারে রপ্তানি হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের অনেক সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক যোগাযোগও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুডের মালিক এম ডি আলম বলেন, মিয়ানমারে সিমেন্ট কারখানা কম। তাই সেখানে সিমেন্টের চাহিদা অনেক; কিন্তু প্রয়োজনীয় এনওসি ও অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে রপ্তানির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, দেশি আলু ও বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংকস রপ্তানিরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
কীভাবে মিলবে অনুমোদন
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, তাঁরা এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুডের তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানি আয় আনার আবেদনটি প্রথমে নিজেরা পর্যালোচনা করেছেন। এরপর ব্যাংক খাতের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু মূল লক্ষ্য রপ্তানি সহজ করা, সেহেতু অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিগগির জানানো হবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানি আয় আনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বাধা নেই। তাই বৈদেশিক মুদ্রা আয় সহজ করতে আবেদনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রজ্ঞাপনেও এ ধরনের সুযোগের বিধান রয়েছে। ২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রা বিভাগ থেকে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে ভিন্ন কোনো দেশ থেকেও রপ্তানি মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে অনুমোদনের বিষয়টি এখন (রোববার) পর্যন্ত টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে পৌঁছায়নি। ফলে রপ্তানির অপেক্ষায় রয়েছেন এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুডের মালিক এম ডি আলম।
তিনি বলেন, ‘বিদেশি মুদ্রা আয়ের এমন সুযোগের জন্যও ঘুরতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়।’
এদিকে মিয়ানমারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে সিমেন্ট ও আলুর পাশাপাশি ছিল ইয়ার্ন ও পাটপণ্য।
ব্যবসা কমেছে, জেগেছে নতুন আশা
মিয়ানমারের সঙ্গে পণ্য রপ্তানি-আমদানিতে যুক্ত রয়েছেন শতাধিক ব্যবসায়ী। চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় চীন এই করিডর গঠনের প্রস্তাব দেওয়ায় এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য সম্ভাবনার কথা ভাবছেন।
বাংলাদেশ–মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এস এম নুরুল হক বলেন, রোহিঙ্গা আগমনের পর দুই দেশের বাণিজ্য আগের তুলনায় কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হলে ব্যবসা আবার গতি পাবে। নতুন করিডর হলে সরাসরি চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গেও পণ্য বিনিময় করা যাবে। লিড টাইম ১০ দিন থেকে ১ দিনে নেমে আসবে।
মিয়ানমারে পণ্য পাঠিয়ে অন্য দেশ থেকে তার দাম পাওয়ার বিষয়ে এস এম নুরুল হক বলেন, মিয়ানমারের অনেক ধনী ব্যবসায়ী থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। তাই তাঁরা সেসব দেশ থেকে বিল পরিশোধ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক নিয়মে এটি সম্ভব। যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারে ডলার-সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে গেছে। আগে সেখানে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা ছিল, এখন সেটিও নেই। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ মিয়ানমারের বাজারে বেশ জনপ্রিয়।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মুর্শেদ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সিমেন্ট রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছুটা কঠোরতা রয়েছে। কারণ, এসব সিমেন্ট দিয়ে আরাকান আর্মি বাংকার তৈরি করতে পারে, এমন আশঙ্কা আছে।
স্বর্ণের দাম ফের ঊর্ধ্বগতি
চলতি আগস্ট মাসে স্বর্ণের দাম ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স প্রায় ৪ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। এতে ইঙ্গিত মিলছে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে মূল্যবান ধাতুটি আবারও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ফলে ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে থাকা স্বর্ণের বাজারে আরও দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর স্বর্ণের দাম জানুয়ারিতে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৯৫ ডলার থেকে জুনে ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে যায়। তেলের দাম বাড়ার মধ্যে বিনিয়োগকারীরা নগদ অর্থ বা তারল্য ধরে রাখার দিকে ঝুঁকেছিলেন।
একই সময়ে কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সহায়তা করতে তাদের রিজার্ভ ব্যবহার করেছিল। স্বাধীন বিশ্লেষক রস নরম্যান বলেন, ‘মনে হচ্ছে যেন স্বর্ণের ওপর থেকে অবশেষে হ্যান্ডব্রেকটি সরিয়ে নেয়া হয়েছে।’
চলতি মাসে স্বর্ণের দাম দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ স্তর অতিক্রম করেছে। এর পেছনে সহায়তা করেছে তেলের দাম কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল মুদ্রাস্ফীতির তথ্য। এসব কারণে ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ার প্রত্যাশাও কমেছে।
এইচএসবিসির প্রধান মূল্যবান ধাতু বিশ্লেষক জেমস স্টিল বলেন, ‘যদি তেল আবার প্রধান আকর্ষণ না হয়ে ওঠে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে এবং তেলের দাম না বাড়ে, তাহলে স্বর্ণের দাম বাড়ার পথটিই সবচেয়ে সহজ হবে।’
গত দুই সপ্তাহে স্বর্ণের দামে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। স্টিলের মতে, এতে বোঝা যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো স্বর্ণ কিনতে সক্রিয় ছিল। তবে তিনি এটিকে নিশ্চিত তথ্য নয়, বরং একটি অনুমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্বর্ণের বড় বারের প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদাও এর দাম বাড়ার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ। চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রে স্বর্ণের প্রিমিয়াম নতুন করে কেনার আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত সপ্তাহে চীনে স্বর্ণের প্রিমিয়াম ছিল প্রতি আউন্স ১.৫০ ডলার।
স্টিল বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি আসলে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আগে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর যে অবস্থান ছিল, তা পুনর্গঠন করা।’
তবে স্বর্ণের দাম বাড়ার পথে কিছু বাধাও রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শেষ করার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা, গহনা ও মুদ্রার চাহিদা কমে যাওয়া এবং সুদের হারের প্রতি সংবেদনশীল স্বর্ণ-সমর্থিত এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগের প্রবাহ কম থাকায় বুলিয়নের ঊর্ধ্বগতি সীমিত হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথমার্ধে স্বর্ণ-সমর্থিত ইটিএফগুলোতে মাত্র ৭ বিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগ এসেছে। অথচ এসব তহবিলের ব্যবস্থাপনায় থাকা মোট সম্পদের পরিমাণ ৫৮২ বিলিয়ন ডলার।
স্বর্ণের দাম আরও বাড়ার পথে প্রযুক্তিগত কিছু সংকেতও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রিলেটিভ স্ট্রেংথ ইনডেক্স (আরএসআই) বলছে, স্বর্ণের দাম স্বল্পমেয়াদে ‘ওভারবট’ বা অতিরিক্ত কেনার পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। একই সময়ে ২০০ দিনের মুভিং অ্যাভারেজ, যা বর্তমানে ৪ হাজার ৫০৪ ডলারে রয়েছে, স্বর্ণের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ স্তর হিসেবে কাজ করছে।
ছবি : সংগৃহীত
স্পট মার্কেটের তুলনায় কম দামে ২ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে সরকার। ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার দরে দুই কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বাজারদরের তুলনায় সরকারের প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) অনলাইনে অনুষ্ঠিত জরুরি সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬ মাসে সরবরাহের জন্য জেকেএমভিত্তিক এলএনজির প্রযোজ্য মূল্য ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ১৬ দশমিক ৮০৮ মার্কিন ডলার। তবে ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে দুই কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ১৭-১৮ আগস্ট এবং ২২-২৩ আগস্ট দুই কার্গো এলএনজি সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির মূল প্রস্তাব ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ১৩ মার্কিন ডলার। তবে এলএনজির বাজারে অস্থিরতা, স্পট মার্কেটে তুলনামূলক বেশি দাম, অন্য উৎস থেকে কার্গো সংগ্রহে সময়ের স্বল্পতা এবং অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মূল্যায়ন কমিটি দরকষাকষি করে নতুন দাম নির্ধারণ করে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ১১ আগস্ট স্পট মার্কেটে জেকেএমভিত্তিক এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ দশমিক ২৮৯ মার্কিন ডলার। এই বাজারদরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫০ ডলার দরে দুই কার্গো কেনায় সরকারের আনুমানিক ৩ কোটি ৭ দশমিক ৫ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, একই বৈঠকে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় আরও পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ২৩-২৪ আগস্টের জন্য একটি কার্গো এবং ৪-৫ সেপ্টেম্বরের জন্য আরেকটি কার্গো কিনতে বিপি সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডকে সরবরাহকারী হিসেবে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিপি সিঙ্গাপুর থেকে ২৩-২৪ আগস্টের কার্গোটি প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ দশমিক ৮৭৮ মার্কিন ডলার দরে কিনতে এআইটিসহ মোট ৯২৭ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৮৩৩ টাকা ৯২ পয়সা এবং ৪-৫ সেপ্টেম্বরের কার্গোটি প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ দশমিক ৭৭৮ মার্কিন ডলার দরে কিনতে এআইটিসহ ৯২৩ কোটি ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩৬৯ টাকা ৯২ পয়সা ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহের মাধ্যমে এসব এলএনজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে সরাসরি ক্রয়ের জন্য দরকষাকষির সুযোগও রয়েছে। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট ক্রয়বিধির বিধান অনুসরণ করে এ ধরনের ক্রয়প্রক্রিয়ায় নেগোসিয়েশনের সুযোগ রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মত ইউরোপের বাজারেও পোশাক রপ্তানি কমছে বাংলাদেশের। চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা। এ অঙ্ক আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।
ইইউতে প্রতিযোগী অন্য কোনো দেশের রপ্তানি এতটা কমেনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছে তুরস্কের। ভারত ও পাকিস্তানের কমেছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৪৯ ও ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ভিয়েতনামের উল্টো শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমে যাওয়ার চিত্রটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিসের (ইউরোস্ট্যাট) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
শনিবার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ হাজার ১১০ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইইউর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। আমদানির এ পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক; মোট রপ্তানির আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পোশাক রপ্তানি থেকে মোট যে আয় আসে, তার ২০ শতাংশের মত আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। অন্যদিকে জোটগতভাবে ইউরোপের বাজারগুলো থেকে ৬০ শতাংশের বেশি।
ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সব সময়ই চীনের আধিপত্য। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে দেশটি ১ হাজার ১৮২ কোটি ২৬ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তবে তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ কম।
এ বাজারে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি করেছিল ১ হাজার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক। এ হিসাব বলছে, রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম।
২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার।
এই ছয় মাসে দেশটিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। কম্বোডিয়ার বেড়েছে সবচেয়ে বেশি ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) গত ৬ অগাস্ট এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমার কারণ হিসেবে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামগ্রিকভাবেই রপ্তানি অবস্থা ভালো না। গত অর্থবছরে আমাদের পোশাক রপ্তানি ২ শতাংশের মত কমেছে। বিশ্ব পরিস্থিতি অনুকলে নয়; অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ভালো নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নানা সমস্যা। এ অবস্থায় আগামী দিনগুলো কেমন যাবে বুঝতে পারছি না।
“তিন কারণে ইইউতে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছে। এক. বাজারটিতে ভোক্তা পর্যায়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে। দুই. চীন ইইউতে আগ্রাসী বিপণন করে ক্রয়াদেশ নিচ্ছে। তিন. ভারতের সঙ্গে এফটিএ হওয়ায় ইইউ অনেক ক্রেতা দেশটিতে ক্রয়াদেশ সরাচ্ছে।”
সুবিধাজনক অবস্থানে ভিয়েতনাম
চীন ও বাংলাদেশের পর ইইউতে শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক হলো তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। এরমধ্যে তুরস্ক গত জানুয়ারি-জুন সময়ে ৩৭৪ কোটি ৭৩ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এরপর ভারত ২৩৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে; তাদের রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
শীর্ষ ১০ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের মধ্যে ভিয়েতনামের রপ্তানি সবচেয়ে কম কমেছে, শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। ইইউর বাজারে চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটি রপ্তানি করেছে ২০৬ কোটি ৫২ ইউরোর তৈরি পোশাক।
এছাড়া কম্বোডিয়ার ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ৬৫, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ২১ এবং ইন্দোনেশিয়ার তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
ইউতে দামে পিছিয়ে বাংলাদেশ
চীন ইইউর বাজারে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি অর্থের তৈরি পোশাক রপ্তানি করলেও পরিমাণের দিক থেকে দেশটি পিছিয়ে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীন ৫৯ কোটি ৬২ লাখ কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আর বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৬২ কোটি ৩০ লাখ কেজি তৈরি পোশাক, যা গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ২২ শতাংশ কম। পরিমাণের দিক থেকে চীনের কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
ইইউতে চীনের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে মূলত তৈরি পোশাকের দামে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে চীন প্রতি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ১৯ দশমিক ৮৩ ইউরোতে। অপরদিকে বাংলাদেশ প্রতি কেজি রপ্তানি করেছে ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরোতে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম। চীনের দাম কমেছে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
যদিও তুরস্ক, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি করা প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের দাম বেড়েছে। ভারতের কমেছে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে ফজলে শামীম এহসান বলেন, “চীন যখন ইইউতে আগ্রাসী বিপণন শুরু করল, তখন তাদের রাষ্ট্র সহায়তা করেছে। ব্যাংকগুলোর খারাপ অবস্থা থাকায় সহায়তা না পেয়ে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে কিংবা তাদের রপ্তানি বন্ধ হয়েছে। তাছাড়া ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্রেতাদের চীনাদের কম দাম অফার করার সুযোগ ছিল না।”
স্বর্ণ
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আবারও বাড়ছে স্বর্ণের দাম। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদা বাড়ায় মূল্যবান এই ধাতুটির বাজারে নতুন গতি তৈরি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি আউন্স প্রায় ৪ হাজার ডলারে স্থির থাকার পর আগস্টের শুরু থেকে স্বর্ণের দাম প্রায় ৪০০ ডলার বা ১০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে চলতি আগস্টে স্বর্ণের দাম এই শতাব্দীর সেরা মাসগুলোর একটির দিকে এগোচ্ছে।
এর আগে কোনো এক মাসে স্বর্ণের দাম ১৩ শতাংশ বা তার বেশি বেড়েছিল ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে। স্বর্ণের সাম্প্রতিক এই উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে।
এর মধ্যে রয়েছে ফেডারেল রিজার্ভের নমনীয় সুদনীতি, দুর্বল কর্মসংস্থানের তথ্য এবং তুলনামূলক সহনীয় মুদ্রাস্ফীতি। এসব কারণে ফেডের সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা কমেছে এবং ডলারের দরও কমেছে। আর দুর্বল ডলার সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়াতে সহায়তা করে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও উদ্বেগজনক ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিস্থিতি। এতে বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্বর্ণের আকর্ষণ আরও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ আবারও তীব্র হয়েছে। ফলে একটি শান্তি ‘চুক্তি’র সম্ভাবনাও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথও সংকুচিত হচ্ছে।
সংঘাত আরও বাড়ানো বা আত্মসমর্পণই একমাত্র বিকল্প নয়। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে কিছু বিশ্লেষক এখন উদ্বিগ্ন।
এদিকে ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা এবং এর চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে। জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ওয়ার্শের মন্তব্যে বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট হননি।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগের পর থেকে ট্রাম্প ওয়ার্শকে একাধিকবার ফোন করেছেন। পাশাপাশি ফেডের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার প্রচেষ্টাও আবার শুরু হয়েছে।
এসব ঘটনা বন্ড বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। বেঞ্চমার্ক ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি নোটের ইল্ড গত ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ড এবং ৩০ বছর মেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি-সুরক্ষিত বন্ডের ইল্ড যথাক্রমে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিউইয়র্ক ফেডে তাদের কাস্টডিতে থাকা মার্কিন ট্রেজারির পরিমাণও কমিয়ে চলেছে। এসব সম্পদের পরিমাণ ২০১২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
অর্থনীতিবিদ ফিল সাটল গত সপ্তাহে লিখেছেন, বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে বৈশ্বিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের সুবিধা পেয়েছে, তা এখন শেষ হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এর পরের ধাপে বিদেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন ঋণ ধরে রাখার বিষয়ে আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে বাড়ছে স্বর্ণের চাহিদা
এসব কারণের কোনোটিই একা স্বর্ণের দামে এত বড় উত্থান ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তবে সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে শক্তিশালী কারণ তৈরি হয়। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রথম প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার গতি কিছুটা কম থাকলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা আবার বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ২৮৯ টন স্বর্ণ কিনেছে। আগের তিন মাসের তুলনায় যা পাঁচ গুণেরও বেশি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এটি ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার রেকর্ড।
গড় দাম বিবেচনায় ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
এই রেকর্ডও খুব শিগগির ভেঙে যেতে পারে। জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের এক জরিপে দেখা গেছে, রেকর্ড ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা আগামী ১২ মাসে নিজেদের স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
প্রাথমিক তথ্যও সেই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাইয়ে মোট ২০ মেট্রিক টন স্বর্ণ কিনেছে, যা আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর মাসিক হিসাবে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি।
এর ফলে চীনের মোট স্বর্ণের রিজার্ভ বেড়ে রেকর্ড ২ হাজার ৩৭৭ দশমিক ৫ টনে দাঁড়িয়েছে। চীন আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে বিএনওয়াইয়ের বিশ্লেষকরা গত সপ্তাহে লিখেছেন, স্বর্ণ সরাসরি ফেডের নীতির সংকেত না হলেও সরকারি খাতের অব্যাহত চাহিদা এবং বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আগ্রহ মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রা ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
স্বর্ণ কি এখনও নিরাপদ আশ্রয়?
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়ালেও তারা খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ফলে স্বর্ণের সঙ্গে তাদের নতুন করে সম্পর্ক তৈরির পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
এটি একমুখী প্রবণতাও নাও হতে পারে। গত কয়েক বছরে স্বর্ণের দামে নজিরবিহীন অস্থিরতার পর মূল্যবান এই ধাতু আগের মতো চূড়ান্ত নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছেও নয়। যদিও তারা সবচেয়ে রক্ষণশীল, দাম নিয়ে কম সংবেদনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত।
গত মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বর্ণ অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং এটি কেবল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঝুঁকি মোকাবিলা ও বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনার সুবিধা দেয়। তারল্য নিশ্চিত করার জন্য স্বর্ণ কেনা উচিত নয় বলেও গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার লেখকরা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণকে উচ্চঝুঁকির রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে কৌশলগত সম্পদ বণ্টন ও যথাযথ নীতি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির পেছনে অন্ধভাবে ছুটবে; এমন সম্ভাবনা কম।
তবে বিশ্বের রিজার্ভ সম্পদের ওপর আস্থা কমতে থাকলে স্বর্ণের আকর্ষণও শিগগির ম্লান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজের মূল্য এখন থেকে বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করতে পারবেন ভ্রমণকারীরা। স্থানীয়ভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ট্যুর অপারেটরদের বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আজ (রোববার) জারি করা নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সুবিধার কথা জানিয়েছে। ফলে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজের আওতায় হোটেল, যাতায়াতসহ গন্তব্যস্থানের অন্যান্য সেবার মূল্য টাকায় পরিশোধ করা যাবে।
নতুন ব্যবস্থায় ট্যুর অপারেটররা ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে দেশে টাকায় প্যাকেজের মূল্য সংগ্রহ করতে পারবেন। এরপর অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে সংশ্লিষ্ট ট্যুর অপারেটর, হোটেল বা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকার বিপরীতে প্রচলিত বিনিময় হারে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সুবিধা পেতে ট্যুর অপারেটরদের ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর সদস্য হতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল বা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে তাদের চুক্তি বা সমঝোতা থাকতে হবে।
বিদেশি প্যাকেজের বিপরীতে এ ব্যবস্থায় একজন ভ্রমণকারীর জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে। এই সীমা ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রার কোটার বাইরে প্রযোজ্য হবে।
তবে এ সুবিধা শুধু সেই বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যার মূল্য গ্রাহক বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকা যে প্রকৃতপক্ষে বিদেশ ভ্রমণের সেবার বিপরীতে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। এর মধ্যে বিদেশি সেবা প্রদানকারীর ইনভয়েস বা চুক্তিপত্র, বিস্তারিত ভ্রমণসূচি ও ব্যয়ের হিসাব, ভ্রমণকারীদের পাসপোর্ট নম্বরসহ তালিকা, দেশীয় ও বিদেশি ট্যুর অপারেটরের মধ্যকার চুক্তি এবং গ্রাহকের কাছ থেকে টাকায় অর্থ গ্রহণের প্রমাণ থাকতে হবে।
প্রতিটি ভ্রমণকারীর পাসপোর্ট নম্বরের বিপরীতে লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে ট্যুর অপারেটরদের। একই সঙ্গে একটি ক্যালেন্ডার বছরে প্রত্যেক ভ্রমণকারীর জন্য মোট কত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করা হয়েছে, তারও সমন্বিত হিসাব রাখতে হবে।
কোনো ভ্রমণকারী অন্য কোনো ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে তার বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রার সীমা ইতিমধ্যে ব্যবহার করেছেন কি না, সে বিষয়ে তার কাছ থেকে ঘোষণাপত্রও নিতে হবে ট্যুর অপারেটরদের।
ট্যুর অপারেটররা তাদের সেবা মূল্য বা কমিশন বাংলাদেশি টাকায় রেখে দিতে পারবেন। তবে বিদেশি অংশীদারদের কাছে পাঠানো অর্থের পরিমাণ হতে হবে প্রযোজ্য কর বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত পাওনা অর্থের সমান।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এই সুবিধা শুধু প্রকৃত বিদেশ ভ্রমণসেবার জন্য ব্যবহার করা যাবে। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অর্থ স্থানান্তর, নিশ্চিত বুকিং বা চুক্তিগত দায়বদ্ধতা ছাড়া আগাম অর্থ পাঠানো কিংবা ভ্রমণ ব্যয়ের আড়ালে মূলধনী হিসাবের লেনদেন এ ব্যবস্থার আওতায় করা যাবে না।
বিদেশে অর্থ পাঠানোর আগে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করবে এবং লেনদেনটি প্রকৃত ও বৈধ কি না, তা নিশ্চিত করবে। অর্থ পাঠানোর পর সাত দিনের মধ্যে এসব রেমিট্যান্সের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা যাচাই করবে।
বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজের বিপরীতে অর্থ পাঠানোর বিষয়ে গত ৭ মে জারি করা বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত নির্দেশনা এফইপিডি-তে থাকা বিধান সংশোধন করে নতুন নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছে।