একটি প্রতারণার মামলায় ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন দুই নারী। আদালত জামিন না দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর দুদিন পর বাদী পক্ষে দাবি করা হয়েছে ওই দুই নারী আসামির একজনের বদলে তার ছোট বোন কারাগারে গেছেন। আদালত এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে এ ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় আসামি পক্ষের আইনজীবী নি:শর্ত ক্ষমা চেয়ে এ মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেছেন।
আসামি বড় বোনের পক্ষে ছোট বোনের আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যাওয়ার এ ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার। তবে বৃহস্পতিবার এ আসামির রিমান্ড শুনানিকালে বাদী পক্ষে দাবি করা হয়, কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী আসল আসামি নন। তিনি অন্য কেউ। বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে এ ঘটনা ঘটে।
এটি জানাজানি হয় রোববার; যখন এ মামলার চার আসামির আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিব ‘আয়নাবাজি’ কাণ্ডের পর এ মামলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে আদালতে আবেদন করেন।
আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তা ও আদালত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ‘বড় বোনের বদলে ছোট বোনের’ আত্মসমর্পণ ও কারাগারে যাওয়ার ‘আয়নাবাজির’ মত এ ঘটনা জানা গেছে।
আদালত সংশ্লিষ্টরা বলেন, শারমিন আক্তার একা ও লাইলী শাহনাজ খুশি নামে এ দুই আসামি মঙ্গলবার উত্তরা পূর্ব থানার প্রতারণার ওই মামলায় আত্মসমর্পণ করেন। সেদিন তাদের কারাগারে পাঠান বিচারক।
পরে একাকে জিজ্ঞাসাবাদে ১০ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ। বৃহস্পতিবার এ নিয়ে শুনানি শুরু হয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে।
শুনানিকালে একাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার বাদী আজিজুল আলমের বন্ধু বাদল আহম্মেদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারী মামলার আসামি একা নন বলে শুনানিকালে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতকে জানান বাদল। এসময় বোরকা ও নেকাপ পরিহিত ছিলেন ওই আসামি।
এমন তথ্যে আদালত ওই নারীকে মুখ দেখাতে বলেন। তখন আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর।
পরে ব্চিারক এই নারী আসামি শারমিন আক্তার একা কিনা তা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
মামলার বাদী আজিজুল আলম বলেন, “আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত আমি যাকে আসামি করেছি সেই একা ইনি নন। এটা তার ছোট বোন। তবে নাম জানি না। আদালতের সাথে প্রতারণা করেছে। একা না হয়ে একা সেজে কারাগারে রয়েছে।"
তার বন্ধু বাদল আহম্মেদ বলেন, "সেদিন আমি আদালতে উপস্থিত ছিলাম। ওই আসামি মুখে পর্দা দিয়ে রেখেছিল। বডির স্ট্রাকচার দেখে বুঝি সে একা না। আদালতকে জানাই। আদালত জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টের সাথে আসামির চেহারার মিল পাননি। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।"
মামলার চার আসামি শারমিন আক্তার একা, লাইলী শাহনাজ খুশি, এ আর রাসেল ও আব্বাসের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতেন আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিব।
এ ঘটনার পর ক্ষমা চেয়ে রোববার আদালতে করা আবেদন তিনি বলেন, “আত্মসমর্পণ করার সময় একা ও খুশি বোরকা ও নেকাপ পরিহিত থাকায় আইনজীবী হিসেবে আসামিদের নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসাবাদ করে সরল বিশ্বাসে আদালতে হাজির করাই। এর আগে আসামিদের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে তাদের বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলাম না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, বাদী ও বাদীপক্ষের আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করে পরে উপলব্ধি করতে পারি, আসামিরা আমাকে প্রতারিত করেছে।"
আদালত তার আবেদনটি নথিভুক্ত করেছেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আতিকুর রহমান। সোমবার একার রিমান্ড বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজু আহম্মেদ রাজিব বলেন, “এই আসামি যে একা না ঠিক পাইনি। এখন এর বেশি কিছু বলছি না।"
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “আয়নাবাজির মত ঘটনা ঘটেছে। আসামি একার হয়ে একজন প্রক্সি দিয়েছিল। বাদীপক্ষ বিষয়টি আদালতকে জানায়। আদালত বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত করতে বলেছেন।"
তিনি বলেন, “ওরা একটা চক্র। ওদের কাজই হলো আয়নাবাজির মত ঘটনা ঘটানো, এমন কাজ করা।”
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম বলেন, "একজনের হয়ে আরেকজন কারাগারে গেছে। বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ওই আসামি কারাগারে আছে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব কিছু জানা যাবে। তারপর আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেব।"
মামলার পূর্বাপর
প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে, ‘কুফরি-কালাম, শয়তানের নি:শ্বাসের’ মাধ্যমে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর কাছ থেকে ‘প্রতারণামূলকভাবে’ ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে এ মামলা চলছে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভয়-ভীতি দেখিয়ে চক্রটি ১৪-১৬ কোটি টাকার জমিও লিখে নিয়েছে। এ ঘটনায় আজিজুল আলম নামের ওই ব্যবসায়ী উত্তরা পূর্ব থানায় চক্রের ২৪ সদস্যের নামে মামলা করেন।
মামলার পর শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, নাজমুল হাসান, এ আর রহমান ও আবু ইবনে বিন আব্বাস ওরফে তুষারকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে শিমুল ও নাজমুল জামিন পেয়েছেন।
আজিজুল মামলায় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান তার কাছে যায়। তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চায়। আজিজুল জানান, আছে। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানায়, প্রাচীন পিলার বিদেশে বিক্রি করে বিদেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ টাকা আনবে। যার অর্ধেক আজিজুলকে দেবে।
“সোহেলের সুন্নতি লেবাস ও চটকদার কথাবার্তায় আজিজুল বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপর থেকে তার কারসাজি শুরু হয়। বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাস ব্যবহার করে হিপনোটাইজ করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তারা কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে।
“তাদের কাছে অলৌকিক ও জ্বিনের মাধ্যমে মূল্যবান প্রাচীন পিলার ম্যাগনেট এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারে বলে জানায়। এরপর তারা তার অফিসে মাঝে মধ্যে যাতায়াত শুরু করে এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও মিষ্টি খাওয়ায়। খাবার খাওয়ার পর থেকে তার মাথায় কাজ করছিল না। আজিজুল তাদের অনুগত হয়ে যান। তারা যা বলে তারা তাই করে।”
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, “কিছুদিন পর আবার জ্বিনের মা পরিচয়ে এক নারী তাকে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দেয়। তারপর থেকে নাজমুল ও সোহেল এবং অন্যদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিতে থাকে। বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে তারা তার কাছ থেকে নগদ কয়েক কোটি টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়।
“পরবর্তীতে জ্বীনের বাদশা (রাসেল) তাকে ফোন করে বলে সোহেল ও নাজমুলকে পাঠিয়েছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা দিয়ে দে। যদি না দিস তাহলে তোর ক্ষতি হবে। এভাবে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সময় ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা প্রতারণা করে নিয়ে নেয়।”
এছাড়া তার উত্তরখান এলাকা ১৪-১৬ কোটি টাকার ২৭ দশমিত ১৫ কাঠা জমি লিখে নেয় বলে অভিযোগ করেন বাদী।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি
স্বামী তৌফীক নেওয়াজের মৃত্যুর পর এখন আর বাসায় ফেরার তাগিদ অনুভব করছেন না জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে নিজের জামিন আবেদন প্রত্যাহার চেয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
ট্রাইব্যুনালকে তিনি বলেন, আমি দুই বছর ধরে কারাবন্দি। গত এপ্রিল মাসে আমার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এখন আমি জামিন চাই না। জামিন আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এসব কথা বলেন দীপু মনি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। আজ তার জামিনের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল।
জামিন শুনানি শুরুর আগে কথা বলার অনুমতি চান দীপু মনি। ট্রাইব্যুনাল তাকে কথা বলার অনুমতি দেন। পরে ট্রাইব্যুনালের এজলাসের কাঠগড়ায় দীপু মনি এসব কথা বলেন।
সাবেক এ মন্ত্রী ট্রাইব্যুনালে বলেন, এর আগে জামিন আবেদন শুনানির সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, বাসায় গিয়ে কী করবেন? এখন আমার আর বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। আমার স্বামী তৌফিক নেওয়াজ সাত বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। তার বাকশক্তিও ছিল না। কোনো কথা বললে চোখের পলক ফেলে উত্তর দিতেন তিনি। আমি পাঁচ বছর সরকারি দায়িত্বপালনের সময় শয্যাশায়ী স্বামীর যত্ন নিয়েছি। এ অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে আমার স্বামীকে দুই বছর অজ্ঞাত স্থানে থাকতে হয়েছে। আশ্রিত অবস্থায় ছিলেন। আমিও যত্ন নিতে পারিনি। এ জীবন তিনি মেনে নিতে পারেননি।
গত ১৮ আগস্ট রাতে দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজ মারা যান। গত ২৬ এপ্রিল দীপু মনির জামিন আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার মাস আগে তার স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলেও উল্লেখ করেন দীপু মনি। তিনি বলেন, তখন তার কাছে যাওয়ার জন্য জামিন আবেদন করেছিলাম। ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর শেষ সময়ে কাছে থাকতে পারিনি। এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমি আর কার কাছে যাবো? সন্তানরা জামিন চায়। আমার বাসায় যাওয়ার আর তাড়া নেই।
তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা খুবই ব্যথিত। আপনার আবেদনের যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু আরও অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এরপর দীপু মনির জামিন শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তাকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বিচারক মো. হাবিবুল গনিকে তার শপথ গ্রহণের তারিখ হতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগদান করেছেন।’
শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রমে যুক্ত হবেন। তার যোগদানের পর আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়াবে পাঁচজনে।
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৬২ সালের ৩১ মে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৯ সালের ৩ এপ্রিল জেলা আদালতে এবং ১৯৯২ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি।
দীর্ঘ আইন পেশার পর ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে তিনি দেওয়ানি ও ফৌজদারি-দুই ধরনের মামলার শুনানিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন সময়ের কার্যতালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিচারপতি হাবিবুল গনি বিভিন্ন বিচারপতির সঙ্গে বেঞ্চে বসে ফৌজদারি আপিল, জামিন, রিভিশন, মৃত্যুদণ্ডের রেফারেন্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুনেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিচারপতি হাবিবুল গনি আইন ও বিচারবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। তিনি কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ভুটান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সফর করেছেন।
মির্জা আব্বাস
বিনা দরপত্রে ১৮টি সরকারি বাড়ি বিক্রির অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতির ১৫ মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাসকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মুহাম্মদ কামরুল হাসান খান এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলাগুলো ২০০৭ সালে দায়ের করা হয়। এতে বিনা দরপত্রে সরকারি ১৮টি বাড়ি বিক্রির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার আদালত মির্জা আব্বাসকে এসব মামলার অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি-মন্ত্রীসহ ১০ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে বিভিন্ন কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে হাজির করা ১০ জন হলেন- সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, গোপালগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফারুক খান, সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক এমপি সোলাইমান সেলিম এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ দিন ধার্য রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কারাগারে থাকা ১০ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, হামলা, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।
শুরুতে এ মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৬ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
এরই মধ্যে দীপু মনি ও আব্দুর রাজ্জাককে শাপলা চত্বরে গণহত্যার মামলায়ও আসামি করা হয়েছে।
হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর কারাগারে যাওয়ার সময় আসামি সাহিদা ও কবির। ছবি: সংগৃহীত।
রাজধানীর সবুজবাগে ছুরাইয়া আক্তার ফালানী নামে এক তরুণীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের মামলায় তার বান্ধবী নুসরাত জাহান সাহিদাসহ ২ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, আসামি সাহিদার স্বামী রাব্বির সঙ্গে তার বান্ধবী ফালানী অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি সাহিদা জেনে যান। ঘটনার দিন রাব্বির সঙ্গে ফালানিকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন সাহিদা। সঙ্গে সঙ্গে সাহিদা ছুরি দিয়ে হত্যা করেন ফালনীকে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সবুজবাগ থানার এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী ৬ আসামিকে আদালতে হাজির করেন। তাদের মধ্যে ফেলানীর বান্ধবী নুসরাত জাহান সাহিদা ও তার ‘পাতানো ভাই’ কবির হোসেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তা রেকর্ড করা হয়। বাকিদের কারাগারে পাঠানোর আবেদন করা হয়।
এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই আদালত থেকে অপর চার আসামিকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ আসে।
কারাগারে যাওয়া বাকি চার আসামি হলেন- ফারুক ওরফে জামাই ফারুক, সুজন, মামুন, রাফি ইসলাম ওরফে বাপ্পি ও রকি। এ তথ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মমিনুল ইসলাম।
পুলিশ বলছে, দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ফালানি হত্যার কারণ উঠে এসেছে।
ঘটনার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে এ হত্যার ঘটনা। সাহিদার স্বামী রাব্বির সঙ্গে তার বান্ধবী ফালানী অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি সাহিদা জেনে যান। ঘটনার দিন রাব্বির সঙ্গে ফালানিকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন সাহিদা। সঙ্গে সঙ্গে সাহিদা ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন ফালনীকে।’
‘পরে লাশ গুমের জন্য সাহিদার সঙ্গী শাওন নামে আরেকজন নিহতের মাথা বিচ্ছিন্ন করেন। শাওন ও সাহিদার স্বামী রাব্বি বর্তমানে পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া কবির সাহিদার পাতানো ভাই।’
গত ৬ আগস্ট সবুজবাগের মাদারটেক বাগানবাড়ির গরুর খামার লাগোয়া সেতুর নিচ থেকে একটি খণ্ডিত মাথা ও দুই হাত উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ছবি দেখে দেহাংশটি ছুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানীর বলে শনাক্ত করেন তার মা-বাবা। ১৯ বছর বয়সী ফালানী মুন্সীগঞ্জের ঢালীকান্দি গ্রামের বজলুল ব্যাপারীর মেয়ে। এ ঘটনায় ওইদিনই অজ্ঞাতদের আসামি করে সবুজবাগ থানায় মামলা দায়ের করেন এসআই রাশেদুল হাসান।
ঘটনাটি তদন্তে নেমে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় গত ২১ আগস্ট ফালানীর বান্ধবী সাহিদা, ফারুক, সুজন, মামুন, বাপ্পিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শনিবার তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম প্রত্যেক আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে, গত ৫ আগস্ট খিলগাঁও থানা পুলিশ রকিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে রকি কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। এরমধ্যেই ফালানী হত্যার সঙ্গে রকির সম্পৃক্ততা পেয়ে তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে রোববার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আসামির উপস্থিতিতে গত সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আরেক আদালত তার চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। স্বীকারোক্তি দেওয়া কবিরকে গত মঙ্গলবার খিলগাঁও এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ছবি : সংগৃহীত
ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশটি যথাযথ ছিল না। ওই মামলায় ফেনী জজ কোর্টের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ যথাযথভাবে বিচারিক মানসিকতা প্রয়োগ করেননি- পর্যবেক্ষণে এমন অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফৌজদারি মামলার বিচারকাজ থেকে তাঁকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার আপিলের রায় ঘোষণার সময় এ আদেশ দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর আলোচিত এই মামলাটির রায় দিয়েছিলেন নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি হাইকোর্টে আসে। পরে আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন তাঁর মা শিরীন আখতার। এ মামলার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পর তাঁর অনুগত কয়েকজন জনমত গঠন করে তাঁকে কারাগার থেকে বের করে আনার চেষ্টা করে। ৩ এপ্রিল অভিযুক্ত খুনিরা কারাগারে সিরাজের সঙ্গে পরামর্শ করে। ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ৬ এপ্রিল নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাঁকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। সেখান থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছর ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত। এ ঘটনায় তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান হত্যা মামলা করেন।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্যরা হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্সের জন্য রায়সহ নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়, যা ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।