আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।
আইন মন্ত্রনালয়ে লিয়াকত আলী মোল্লা আইন সচিব হিসেবে যোগদানের পর মুখ থুবড়ে পড়েছে মন্ত্রনালয়ের সকল কার্যক্রম। নেয়া হচ্ছেনা অভিযুক্ত দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম ও থমকে গেছে। নিয়োগ বাণিজ্য ঘুষ দুর্নীতি নারী নির্যাতন ও নারী কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধেও নেয়া হচ্ছেনা কোন ব্যবস্থা।
বর্তমান আইনসচিব জনাব লিয়াকত আলী মোল্লা চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা জজ থাকাকালে গোমস্তাপুর থানার মামলা নাম্বার-২ (২/১২/২০১৯ তারিখে) জিআর নং-২৯৪/১৯ (গোমস্তাপুর) ১০ কেজি পরিমাণ হেরোইন সহ গ্রেফতারকৃত আসামী হিরা ওরফে হিরো ওরফে প্রিন্স খানকে ২৬/২/২০২০ তারিখে ফৌজদারি মিস ৩৬৬/২০২০ মোকদ্দমায় জামিন প্রদান করেন।
এরআগে অপর আরো একটি হেরোইন মামলায় ৩কেজি২০০গ্রাম হেরোইন ও ৩২ প্যাকেট ইয়াবাসহ গ্রেফতারকৃত আসামী শফিকুল ইসলাম ওরফে লাদেনকে ৫/১১/১৮ ইং তারিখে জামিন দেন আলোচ্য জেলা জজ লিয়াকত আলী মোল্লা। যার জি আর নং-৪৪৩/১৬ (চাঁপাই) ফৌজদারি মিসকেস নং-১৪৭৭/১৮ আদেশ নং-২ তারিখ ৫/১১/২০১৮।
এভাবে মাদক মামলার বহু আসামীকে নির্দ্বিধায় জামিন দিয়েছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জজ কোর্ট প্রাঙ্গণের দোকান-পাট, হোটেল ও গ্যারেজ ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত ১৪ লক্ষ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন তৎকালীন জেলা জজ লিয়াকত আলী মোল্লা।
এছাড়া, কোর্টের নতুন ভবনের নথি সংরক্ষণের জন্য সরবরাহকৃত নতুন ৩০টি লোহার র্যাক (যার একেকটির ওজন ২০০ থেকে ২৫০ কেজি ) গোপনে রাতের আঁধারে তৎকালীন নায়েব নাজির মাহবুব আলমের যোগসাজশে মাহবুব ফার্নিচার মার্টের নিকট চড়া মূল্যে বিক্রি করে দেয়। র্যাক বিক্রির টাকাও তিনি সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে রয়েছে নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগ।
১০ কেজি হেরোইন সহ গ্রেফতারকৃত আসামী দীর্ঘদিন জেলে আটক মর্মে অজুহাত দেখিয়ে ৪২ দিনের মধ্যে জামিন দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পাত্র হয়ে উঠেন লিয়াকত আলী।
এনিয়ে, ২০২০ সালের ২ মার্চ নওরোজ এ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হলে ৭২ ঘন্টার মধ্যে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে শাস্তিমূলক বদলী হিসেবে রাজশাহী মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে বদলী করা হয়।
পরবর্তীতে “জয় বাংলা” গান গেয়ে স্বৈরাচার হাসিনা ও সাবেক আইন মন্ত্রী আনিসুল হককে খুশি করে ঢাকার নিম্নতম মজুরী বোর্ডের চেয়ারম্যান হন তিনি। এরপর তিনি মানিকগঞ্জের জেলা জজ হিসেবে পদায়ন পান।
অতঃপর ৫ই আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর ভোল পাল্টিয়ে নিজেকে বিএনপির লোক হিসেবে জাহির করে বিচারপতি হবার জন্য প্রধান বিচারপতির কার্যালয়ে ভাইবা বোর্ডে উপস্থিত হন। কিন্তু তাকে নিয়ে নানা বিতর্ক, ঘুষ-দুর্নীতি সহ অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারপতির হওয়া থেকে বাদ করে দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ভাইভা বোর্ড।
এতেও তিনি থেমে থাকেন নি। অবশেষে, খোদ আইন মন্ত্রনালয়ের আইন সচিবের মত গুরুত্বপূর্ণ পদটি বাগিয়ে নেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই জেলা জজ, যে ১০ কেজি হেরোইন মামলার আসামিকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে জামিন দিয়েছিলেন সেই মূল আসামীকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে সাজা প্রদান করেন তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরবর্তী জেলা জজ আদিব আলী।
তিনি সেই আদিব আলী যার জন্মস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জে। পৈতৃক বাসস্থান ভিটে মাটি আত্মীয় স্বজন সবাই বসবাস করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
তার পিতার কর্মস্থল পার্শ্ববর্তী জেলায় হবার সুবাদে ওই জেলার পরিচয়েই তিনি নিজ জেলায় পরপর ৪বার পদায়ন নেন। যুগ্ম জেলা জজ থেকে শুরু করে অতিরিক্ত জেলা জজ ও জেলা জজ হিসেবে তিনি প্রায় এক যুগের মত চাকরি করেছেন নিজ জেলাতেই।
নিজ এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে আদালতে উকিল থেকে শুরু করে নিকট আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন অবলীলাক্রমে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথমার্ধে বিশাল অংকের নিয়োগ বাণিজ্য ও নানা দুর্নীতির অভিযোগে আদিব আলীকে ওএসডি করা হয়। মন্ত্রণালয়ে তাকে ওএসডি করার পর তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক প্রসিডিং শুরুর প্রক্রিয়া চলমান থাকাবস্থায় তারই ঘনিষ্ট বন্ধু লিয়াকত আলী মোল্লা আইন মন্ত্রণালয়ের আইন সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। লিয়াকত আলী মোল্লার সচিব হিসেবে যোগদানের পর থেমে গেছে আদিব আলীর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত কার্যক্রম।
লিয়াকত আলী মোল্লাকে নিয়ে নওরোজ এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর আইন উপদেষ্টাও বিব্রত বোধ করেন, জানিয়েছেন আইন মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-৩ এর প্রধান মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান।
তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, “উপদেষ্টা স্যার সচিবালয়ে তার কক্ষে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তাকে বলেন সচিবকে নিয়ে কেনো নওরোজে এতো লেখালেখি হচ্ছে? আপনারা মানা করতে পারেন না?”
তিনি এও বলেন, “আমি সচিব স্যারের সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জে তার অধীনে চাকরি করেছি। স্যার সম্পূর্ণ নির্দোষ। এসব জামিন বাণিজ্য স্যার করেন নি, করেছেন তার স্ত্রী। ভাবিকেই দেখতাম চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে জামিন টামিন করাতে।”
মনিরুজ্জামানের এই সরল স্বীকারোক্তি কি প্রমান করেনা যে তিনি (সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা) ধোঁয়া তুলসী পাতা নন?
সুধী পাঠক, আইন মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর জানতে চোখ রাখুন নওরোজের আগামী পর্বে।
নিউজ করায় ফাঁসানো হয়েছে আমাকে: নওরোজ সম্পাদক
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি
স্বামী তৌফীক নেওয়াজের মৃত্যুর পর এখন আর বাসায় ফেরার তাগিদ অনুভব করছেন না জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে নিজের জামিন আবেদন প্রত্যাহার চেয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
ট্রাইব্যুনালকে তিনি বলেন, আমি দুই বছর ধরে কারাবন্দি। গত এপ্রিল মাসে আমার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এখন আমি জামিন চাই না। জামিন আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এসব কথা বলেন দীপু মনি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। আজ তার জামিনের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল।
জামিন শুনানি শুরুর আগে কথা বলার অনুমতি চান দীপু মনি। ট্রাইব্যুনাল তাকে কথা বলার অনুমতি দেন। পরে ট্রাইব্যুনালের এজলাসের কাঠগড়ায় দীপু মনি এসব কথা বলেন।
সাবেক এ মন্ত্রী ট্রাইব্যুনালে বলেন, এর আগে জামিন আবেদন শুনানির সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, বাসায় গিয়ে কী করবেন? এখন আমার আর বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। আমার স্বামী তৌফিক নেওয়াজ সাত বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। তার বাকশক্তিও ছিল না। কোনো কথা বললে চোখের পলক ফেলে উত্তর দিতেন তিনি। আমি পাঁচ বছর সরকারি দায়িত্বপালনের সময় শয্যাশায়ী স্বামীর যত্ন নিয়েছি। এ অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে আমার স্বামীকে দুই বছর অজ্ঞাত স্থানে থাকতে হয়েছে। আশ্রিত অবস্থায় ছিলেন। আমিও যত্ন নিতে পারিনি। এ জীবন তিনি মেনে নিতে পারেননি।
গত ১৮ আগস্ট রাতে দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজ মারা যান। গত ২৬ এপ্রিল দীপু মনির জামিন আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার মাস আগে তার স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলেও উল্লেখ করেন দীপু মনি। তিনি বলেন, তখন তার কাছে যাওয়ার জন্য জামিন আবেদন করেছিলাম। ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর শেষ সময়ে কাছে থাকতে পারিনি। এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমি আর কার কাছে যাবো? সন্তানরা জামিন চায়। আমার বাসায় যাওয়ার আর তাড়া নেই।
তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা খুবই ব্যথিত। আপনার আবেদনের যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু আরও অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এরপর দীপু মনির জামিন শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তাকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বিচারক মো. হাবিবুল গনিকে তার শপথ গ্রহণের তারিখ হতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগদান করেছেন।’
শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রমে যুক্ত হবেন। তার যোগদানের পর আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়াবে পাঁচজনে।
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৬২ সালের ৩১ মে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৯ সালের ৩ এপ্রিল জেলা আদালতে এবং ১৯৯২ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি।
দীর্ঘ আইন পেশার পর ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে তিনি দেওয়ানি ও ফৌজদারি-দুই ধরনের মামলার শুনানিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন সময়ের কার্যতালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিচারপতি হাবিবুল গনি বিভিন্ন বিচারপতির সঙ্গে বেঞ্চে বসে ফৌজদারি আপিল, জামিন, রিভিশন, মৃত্যুদণ্ডের রেফারেন্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুনেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিচারপতি হাবিবুল গনি আইন ও বিচারবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। তিনি কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ভুটান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সফর করেছেন।
মির্জা আব্বাস
বিনা দরপত্রে ১৮টি সরকারি বাড়ি বিক্রির অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতির ১৫ মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাসকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মুহাম্মদ কামরুল হাসান খান এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলাগুলো ২০০৭ সালে দায়ের করা হয়। এতে বিনা দরপত্রে সরকারি ১৮টি বাড়ি বিক্রির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার আদালত মির্জা আব্বাসকে এসব মামলার অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি-মন্ত্রীসহ ১০ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে বিভিন্ন কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে হাজির করা ১০ জন হলেন- সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, গোপালগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফারুক খান, সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক এমপি সোলাইমান সেলিম এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ দিন ধার্য রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কারাগারে থাকা ১০ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, হামলা, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।
শুরুতে এ মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৬ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
এরই মধ্যে দীপু মনি ও আব্দুর রাজ্জাককে শাপলা চত্বরে গণহত্যার মামলায়ও আসামি করা হয়েছে।
হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর কারাগারে যাওয়ার সময় আসামি সাহিদা ও কবির। ছবি: সংগৃহীত।
রাজধানীর সবুজবাগে ছুরাইয়া আক্তার ফালানী নামে এক তরুণীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের মামলায় তার বান্ধবী নুসরাত জাহান সাহিদাসহ ২ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, আসামি সাহিদার স্বামী রাব্বির সঙ্গে তার বান্ধবী ফালানী অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি সাহিদা জেনে যান। ঘটনার দিন রাব্বির সঙ্গে ফালানিকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন সাহিদা। সঙ্গে সঙ্গে সাহিদা ছুরি দিয়ে হত্যা করেন ফালনীকে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সবুজবাগ থানার এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী ৬ আসামিকে আদালতে হাজির করেন। তাদের মধ্যে ফেলানীর বান্ধবী নুসরাত জাহান সাহিদা ও তার ‘পাতানো ভাই’ কবির হোসেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তা রেকর্ড করা হয়। বাকিদের কারাগারে পাঠানোর আবেদন করা হয়।
এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই আদালত থেকে অপর চার আসামিকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ আসে।
কারাগারে যাওয়া বাকি চার আসামি হলেন- ফারুক ওরফে জামাই ফারুক, সুজন, মামুন, রাফি ইসলাম ওরফে বাপ্পি ও রকি। এ তথ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মমিনুল ইসলাম।
পুলিশ বলছে, দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ফালানি হত্যার কারণ উঠে এসেছে।
ঘটনার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে এ হত্যার ঘটনা। সাহিদার স্বামী রাব্বির সঙ্গে তার বান্ধবী ফালানী অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি সাহিদা জেনে যান। ঘটনার দিন রাব্বির সঙ্গে ফালানিকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন সাহিদা। সঙ্গে সঙ্গে সাহিদা ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন ফালনীকে।’
‘পরে লাশ গুমের জন্য সাহিদার সঙ্গী শাওন নামে আরেকজন নিহতের মাথা বিচ্ছিন্ন করেন। শাওন ও সাহিদার স্বামী রাব্বি বর্তমানে পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া কবির সাহিদার পাতানো ভাই।’
গত ৬ আগস্ট সবুজবাগের মাদারটেক বাগানবাড়ির গরুর খামার লাগোয়া সেতুর নিচ থেকে একটি খণ্ডিত মাথা ও দুই হাত উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ছবি দেখে দেহাংশটি ছুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানীর বলে শনাক্ত করেন তার মা-বাবা। ১৯ বছর বয়সী ফালানী মুন্সীগঞ্জের ঢালীকান্দি গ্রামের বজলুল ব্যাপারীর মেয়ে। এ ঘটনায় ওইদিনই অজ্ঞাতদের আসামি করে সবুজবাগ থানায় মামলা দায়ের করেন এসআই রাশেদুল হাসান।
ঘটনাটি তদন্তে নেমে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় গত ২১ আগস্ট ফালানীর বান্ধবী সাহিদা, ফারুক, সুজন, মামুন, বাপ্পিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শনিবার তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম প্রত্যেক আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে, গত ৫ আগস্ট খিলগাঁও থানা পুলিশ রকিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে রকি কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। এরমধ্যেই ফালানী হত্যার সঙ্গে রকির সম্পৃক্ততা পেয়ে তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে রোববার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আসামির উপস্থিতিতে গত সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আরেক আদালত তার চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। স্বীকারোক্তি দেওয়া কবিরকে গত মঙ্গলবার খিলগাঁও এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ছবি : সংগৃহীত
ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশটি যথাযথ ছিল না। ওই মামলায় ফেনী জজ কোর্টের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ যথাযথভাবে বিচারিক মানসিকতা প্রয়োগ করেননি- পর্যবেক্ষণে এমন অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফৌজদারি মামলার বিচারকাজ থেকে তাঁকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার আপিলের রায় ঘোষণার সময় এ আদেশ দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর আলোচিত এই মামলাটির রায় দিয়েছিলেন নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি হাইকোর্টে আসে। পরে আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন তাঁর মা শিরীন আখতার। এ মামলার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পর তাঁর অনুগত কয়েকজন জনমত গঠন করে তাঁকে কারাগার থেকে বের করে আনার চেষ্টা করে। ৩ এপ্রিল অভিযুক্ত খুনিরা কারাগারে সিরাজের সঙ্গে পরামর্শ করে। ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ৬ এপ্রিল নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাঁকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। সেখান থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছর ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত। এ ঘটনায় তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান হত্যা মামলা করেন।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্যরা হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্সের জন্য রায়সহ নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়, যা ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।