সুপ্রিম কোর্ট
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি দিলেও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ। আলাদা দুটি বিল পাসের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে এ দুটি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হয়।
আর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
ফলে আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তিও থাকছে না। বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হল যেভাবে
বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছিল। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও সভা-সমাবেশের মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন।
সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়। সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ গত বছর ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সররকারের অনুমোদন পায়।
তার ১০ দিনের মাথায় ৩০ নভেম্বর 'সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারি হয়।
এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় করবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ’
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তখন আপত্তি জানান বিরোধী সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান।
পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এই সদস্য বলেন, “বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।” তার ভাষায়, “ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের আয়োজন চলছে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান বলেন, বিচার বিভাগ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কিছু বিচারককে শোকজও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনলে বিচারকদের দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হতো, এখন সেই পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে।
জামায়াতের এ সদস্য বলেন, হাইকোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
তার ভাষায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তন অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে এবং মূল ১১৬ অনুচ্ছেদ ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত’ হয়েছে। সে অনুযায়ী বিচারিক কার্যসম্পাদনকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়েছে।
নাজিবুর রহমান বলেন, “সে রায় বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। সেখানে রায়টি স্থগিত হওয়া কিংবা বাতিল হওয়া ছাড়া এটিকে বিলুপ্ত করা, সেই সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার জন্য বিল আনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার শামিল।”
এই সদস্য বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোরও প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “রহিতকরণ বিলটি অসাংবিধানিক। এটা কোনোভাবেই পাস করা যাবে না।”
নাজিবুর রহমান বলেন, সংসদ সার্বভৌম বলে আদালতের রায় না মানার যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তা জনমত বিভ্রান্ত করছে।
তিনি একটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের কেউই সার্বভৌম নয়; সংবিধানের সীমার মধ্যেই তাদের কাজ করতে হয়। তার ভাষায়, কোনো আইন সংবিধানবিরোধী হলে আদালত সেটি বাতিল করতে পারে।
বিরোধী দলের এ সদস্য বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়নি। সে অবস্থায় এখন রহিতকরণ বিল আনা জনগণের সঙ্গে ‘প্রতারণার’ শামিল।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা বলতে পারে; কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করতে ‘ডিক্টেট’ করতে পারে না।
মাসদার হোসেন মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আদালত আইন নিয়ে মত দিতে পারে, কিন্তু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের।
আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় এবং তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জামায়াতের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা চাই। ওনাদের পিতারা বিচার বিভাগের কাছে অবিচারের শিকার হয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতা যেমন অ্যাবিউজড হয়েছে, যারা সে বিচার করেছিলেন তারা সবচেয়ে স্বাধীন বিচারক ছিলেন।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত। তবে তার ভাষায়, সেই সুপ্রিম কোর্ট থেকেই ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ এর জন্ম হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচারের অভিযোগও উঠেছে।
খালেদা জিয়ার সাজার প্রসঙ্গ টেনে আসাদুজ্জামান বলেন, “সে সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছর থেকে ১০ বছর জেল দিয়েছিলেন।”
রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চালানোর অভিযোগও তোলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট একজন বিচারকের বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
বিচারকদের শোকজের ব্যাখ্যা
বিচারকদের শোকজ দেওয়ার অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারক থাকা অবস্থায় কেউ কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না।
তার ভাষায়, কেউ কেউ ক্লাস নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, কেউ কেউ ফেইসবুকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাজির হচ্ছেন। সে কারণেই তাদের বিষয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মতো প্রশ্নে আরও আলোচনা ও যাচাই-বাছাই দরকার। পরে কণ্ঠভোটে নাজিবুর রহমানের আপত্তি নাকচ হয় এবং বিলটি পাস হয়।
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলেও আপত্তি
পরে আইনমন্ত্রী ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের জন্য প্রস্তাব করেন। এতে আপত্তি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সদস্য আখতার হোসেন।
রংপুর-৪ আসনের এই সদস্য বলেন, অতীতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তাতে ‘দলীয় আনুগত্যসম্পন্ন ও বিতর্কিত’ ব্যক্তিরাও বিচারপতির পদে যেতে পেরেছেন।
আইনমন্ত্রীর আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচারপতিরা সাংবিধানিক সুরক্ষা পেয়েও কীভাবে ‘রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে’ বিচারকার্য চালিয়েছেন, কীভাবে বেগম খালেদা জিয়ার সাজার বাড়ানো হয়েছে এবং কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার গোড়াতেই সমস্যা ছিল।
আখতার হোসেন বলেন, “এই যে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ তৈরি হল, খায়রুল হকের মতো বিচারপতি তৈরি হল, মানিকচোরা শব্দটা এখানকার জন্যে অশোভনীয় হতে পারে, কিন্তু বাইরে এই শব্দটা এভাবেই চলছে।”
তার ভাষায়, বিচারক নিয়োগের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির নিয়োগক্ষমতা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই শেখ হাসিনার আমলে ‘মানিক চোরার মতো ব্যক্তিরা’ বিচারপতি হতে পেরেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বিচারক নিয়োগের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো বোঝাতে তিনি ঘুড়ির নাটাইয়ের উদাহরণ টানেন।
তার ভাষায়, “কোনো একটা ঘুড়িকে আপনি আকাশে উড়িয়ে দিয়েছেন, সেই ঘুড়ির নাটাই যদি আপনার হাতে থাকে, ঘুড়িকে আপনি যতই উড়ার স্বাধীনতা দেন না কেন, আকাশের মধ্যে সেই ঘুড়ি সেখানেই পাক খাবে, আপনি যখন টান দেবেন, তখন আপনার কাছেই ফিরে আসবে।”
আখতার হোসেন সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ ও ৪৮ অনুচ্ছেদে প্রধান বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়ে কি বলা হয়েছে, তা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, এই কাঠামোর কারণেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নিয়োগ সম্ভব হয়েছে।
এনসিপির এ সদস্য বলেন, “সেই ধরনের একটা পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনের দিনে চলুক, এটা তো আমরা কেউই চাই না।”
আখতার হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আনা অধ্যাদেশে বিচারপতি নিয়োগের জন্য একটি ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করা হয়েছিল।
তার মতে, ওই অধ্যাদেশে বয়স, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক গুণাবলী ও প্রকাশনার মতো যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা অতীতে ছিল না।
আখতার হোসেন বলেন, অধ্যাদেশটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণার জন্য রিট হয়েছিল, কিন্তু আদালত তা খারিজ করে দিয়েছিল। তার ভাষায়, “সেই অধ্যাদেশের মধ্যে কোনো অসাংবিধানিকতা নাই।”
আখতারের বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তাত্ত্বিকভাবে তিনি বিরোধী সদস্যের বক্তব্যের সঙ্গে একমত যে অতীতে বিচারপতি নিয়োগে ভয়াবহ সমস্যা ছিল।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে গত ১৭ বছরের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আমলে পার্টি ক্যাডারদেরকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে খায়রুল হকের জন্ম হয়েছে।”
মন্ত্রী বলেন, সরকারও চায় বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হোক, ভালো বিচারপতি নিয়োগ হোক, সুপ্রিম কোর্ট মানুষের ন্যায়বিচারের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক।
তবে তার ভাষায়, অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি আগে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা ছিল তৎকালীন সরকারের পক্ষে আইনি অবস্থান তুলে ধরা। এখন তিনি এই সরকারের মন্ত্রী, আর সরকারের নীতি হল-বিচার বিভাগে নিয়োগে ‘সম্পূর্ণরূপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’ নিশ্চিত করা।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বিচারক নিয়োগের বিষয়টি সংবিধানে নয়, আইনে করার কথা বলেছে। সেই অবস্থান থেকেই সরকার বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কারের পথে যেতে চায়।
তার ভাষায়, “আমরা বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করব। আমরা সংবিধান সংশোধনের যে বিশেষ কমিটি করতে চাচ্ছি, আমরা সেই কমিটির কাছে ফিরে যাই।”
তিনি বলেন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা, মানদণ্ড, কাঠামো ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সব প্রশ্নই সেই আলোচনায় আসতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো খায়রুল হক গজায় উঠুক। আমরা চাই না আর কোনো বিচার বিভাগীয় কিলিং হোক।”
পরে কণ্ঠভোটে আখতার হোসেনের আপত্তি নাকচ হয়ে যায়। বিলটিও পাস হয়।
বিল পাসের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, আলোচনার সময় একজন বিচারপতির নামের শেষে একটি বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছিল, সেটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি
স্বামী তৌফীক নেওয়াজের মৃত্যুর পর এখন আর বাসায় ফেরার তাগিদ অনুভব করছেন না জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে নিজের জামিন আবেদন প্রত্যাহার চেয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
ট্রাইব্যুনালকে তিনি বলেন, আমি দুই বছর ধরে কারাবন্দি। গত এপ্রিল মাসে আমার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এখন আমি জামিন চাই না। জামিন আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এসব কথা বলেন দীপু মনি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। আজ তার জামিনের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল।
জামিন শুনানি শুরুর আগে কথা বলার অনুমতি চান দীপু মনি। ট্রাইব্যুনাল তাকে কথা বলার অনুমতি দেন। পরে ট্রাইব্যুনালের এজলাসের কাঠগড়ায় দীপু মনি এসব কথা বলেন।
সাবেক এ মন্ত্রী ট্রাইব্যুনালে বলেন, এর আগে জামিন আবেদন শুনানির সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, বাসায় গিয়ে কী করবেন? এখন আমার আর বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। আমার স্বামী তৌফিক নেওয়াজ সাত বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। তার বাকশক্তিও ছিল না। কোনো কথা বললে চোখের পলক ফেলে উত্তর দিতেন তিনি। আমি পাঁচ বছর সরকারি দায়িত্বপালনের সময় শয্যাশায়ী স্বামীর যত্ন নিয়েছি। এ অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে আমার স্বামীকে দুই বছর অজ্ঞাত স্থানে থাকতে হয়েছে। আশ্রিত অবস্থায় ছিলেন। আমিও যত্ন নিতে পারিনি। এ জীবন তিনি মেনে নিতে পারেননি।
গত ১৮ আগস্ট রাতে দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজ মারা যান। গত ২৬ এপ্রিল দীপু মনির জামিন আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার মাস আগে তার স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলেও উল্লেখ করেন দীপু মনি। তিনি বলেন, তখন তার কাছে যাওয়ার জন্য জামিন আবেদন করেছিলাম। ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর শেষ সময়ে কাছে থাকতে পারিনি। এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমি আর কার কাছে যাবো? সন্তানরা জামিন চায়। আমার বাসায় যাওয়ার আর তাড়া নেই।
তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা খুবই ব্যথিত। আপনার আবেদনের যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু আরও অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এরপর দীপু মনির জামিন শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তাকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বিচারক মো. হাবিবুল গনিকে তার শপথ গ্রহণের তারিখ হতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগদান করেছেন।’
শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রমে যুক্ত হবেন। তার যোগদানের পর আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়াবে পাঁচজনে।
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৬২ সালের ৩১ মে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৯ সালের ৩ এপ্রিল জেলা আদালতে এবং ১৯৯২ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি।
দীর্ঘ আইন পেশার পর ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে তিনি দেওয়ানি ও ফৌজদারি-দুই ধরনের মামলার শুনানিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন সময়ের কার্যতালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিচারপতি হাবিবুল গনি বিভিন্ন বিচারপতির সঙ্গে বেঞ্চে বসে ফৌজদারি আপিল, জামিন, রিভিশন, মৃত্যুদণ্ডের রেফারেন্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুনেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিচারপতি হাবিবুল গনি আইন ও বিচারবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। তিনি কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ভুটান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সফর করেছেন।
মির্জা আব্বাস
বিনা দরপত্রে ১৮টি সরকারি বাড়ি বিক্রির অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতির ১৫ মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাসকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মুহাম্মদ কামরুল হাসান খান এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলাগুলো ২০০৭ সালে দায়ের করা হয়। এতে বিনা দরপত্রে সরকারি ১৮টি বাড়ি বিক্রির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার আদালত মির্জা আব্বাসকে এসব মামলার অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি-মন্ত্রীসহ ১০ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে বিভিন্ন কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে হাজির করা ১০ জন হলেন- সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, গোপালগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফারুক খান, সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক এমপি সোলাইমান সেলিম এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ দিন ধার্য রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কারাগারে থাকা ১০ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, হামলা, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।
শুরুতে এ মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৬ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
এরই মধ্যে দীপু মনি ও আব্দুর রাজ্জাককে শাপলা চত্বরে গণহত্যার মামলায়ও আসামি করা হয়েছে।
হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর কারাগারে যাওয়ার সময় আসামি সাহিদা ও কবির। ছবি: সংগৃহীত।
রাজধানীর সবুজবাগে ছুরাইয়া আক্তার ফালানী নামে এক তরুণীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের মামলায় তার বান্ধবী নুসরাত জাহান সাহিদাসহ ২ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, আসামি সাহিদার স্বামী রাব্বির সঙ্গে তার বান্ধবী ফালানী অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি সাহিদা জেনে যান। ঘটনার দিন রাব্বির সঙ্গে ফালানিকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন সাহিদা। সঙ্গে সঙ্গে সাহিদা ছুরি দিয়ে হত্যা করেন ফালনীকে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সবুজবাগ থানার এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী ৬ আসামিকে আদালতে হাজির করেন। তাদের মধ্যে ফেলানীর বান্ধবী নুসরাত জাহান সাহিদা ও তার ‘পাতানো ভাই’ কবির হোসেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তা রেকর্ড করা হয়। বাকিদের কারাগারে পাঠানোর আবেদন করা হয়।
এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই আদালত থেকে অপর চার আসামিকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ আসে।
কারাগারে যাওয়া বাকি চার আসামি হলেন- ফারুক ওরফে জামাই ফারুক, সুজন, মামুন, রাফি ইসলাম ওরফে বাপ্পি ও রকি। এ তথ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মমিনুল ইসলাম।
পুলিশ বলছে, দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ফালানি হত্যার কারণ উঠে এসেছে।
ঘটনার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে এ হত্যার ঘটনা। সাহিদার স্বামী রাব্বির সঙ্গে তার বান্ধবী ফালানী অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি সাহিদা জেনে যান। ঘটনার দিন রাব্বির সঙ্গে ফালানিকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন সাহিদা। সঙ্গে সঙ্গে সাহিদা ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন ফালনীকে।’
‘পরে লাশ গুমের জন্য সাহিদার সঙ্গী শাওন নামে আরেকজন নিহতের মাথা বিচ্ছিন্ন করেন। শাওন ও সাহিদার স্বামী রাব্বি বর্তমানে পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া কবির সাহিদার পাতানো ভাই।’
গত ৬ আগস্ট সবুজবাগের মাদারটেক বাগানবাড়ির গরুর খামার লাগোয়া সেতুর নিচ থেকে একটি খণ্ডিত মাথা ও দুই হাত উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ছবি দেখে দেহাংশটি ছুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানীর বলে শনাক্ত করেন তার মা-বাবা। ১৯ বছর বয়সী ফালানী মুন্সীগঞ্জের ঢালীকান্দি গ্রামের বজলুল ব্যাপারীর মেয়ে। এ ঘটনায় ওইদিনই অজ্ঞাতদের আসামি করে সবুজবাগ থানায় মামলা দায়ের করেন এসআই রাশেদুল হাসান।
ঘটনাটি তদন্তে নেমে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় গত ২১ আগস্ট ফালানীর বান্ধবী সাহিদা, ফারুক, সুজন, মামুন, বাপ্পিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শনিবার তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম প্রত্যেক আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে, গত ৫ আগস্ট খিলগাঁও থানা পুলিশ রকিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে রকি কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। এরমধ্যেই ফালানী হত্যার সঙ্গে রকির সম্পৃক্ততা পেয়ে তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে রোববার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আসামির উপস্থিতিতে গত সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আরেক আদালত তার চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। স্বীকারোক্তি দেওয়া কবিরকে গত মঙ্গলবার খিলগাঁও এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ছবি : সংগৃহীত
ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশটি যথাযথ ছিল না। ওই মামলায় ফেনী জজ কোর্টের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ যথাযথভাবে বিচারিক মানসিকতা প্রয়োগ করেননি- পর্যবেক্ষণে এমন অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফৌজদারি মামলার বিচারকাজ থেকে তাঁকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার আপিলের রায় ঘোষণার সময় এ আদেশ দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর আলোচিত এই মামলাটির রায় দিয়েছিলেন নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি হাইকোর্টে আসে। পরে আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন তাঁর মা শিরীন আখতার। এ মামলার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পর তাঁর অনুগত কয়েকজন জনমত গঠন করে তাঁকে কারাগার থেকে বের করে আনার চেষ্টা করে। ৩ এপ্রিল অভিযুক্ত খুনিরা কারাগারে সিরাজের সঙ্গে পরামর্শ করে। ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ৬ এপ্রিল নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাঁকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। সেখান থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছর ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত। এ ঘটনায় তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান হত্যা মামলা করেন।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্যরা হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্সের জন্য রায়সহ নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়, যা ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।