প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন
প্রত্যেক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে খুনোখুনির ঘটনা ঘটে উল্লেখ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, এসব বন্ধে সবার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবে নির্বাচন কমিশন। রক্তপাত বন্ধ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় সরকার নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। তা মোকাবিলার জন্য ইসি সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সিইসি বলেন, বর্তমান সরকারকে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। তাই তারা অবশ্যই দেশের মঙ্গল চাইবে। সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাইবে। এতে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাতের ঘটনা বেশি ঘটে। অনেক জায়গায় শুধু প্রাণহানি নয়, বিপুলসংখ্যক মানুষ আহতও হন। এ পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে। এটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনো রক্তপাত চাই না। রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে চাই। এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ বিষয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সংঘাত প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশন সচেতনতামূলক কর্মসূচিও চালু করবে। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করা হবে, যাতে শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিইসি অতীতের সহিংসতার তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত হন। এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১১৬ জন নিহত হন।
এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি থাকবে না। সবার সহযোগিতা পেলে দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা সফল হতে পারব। গণতন্ত্র শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়;
তৃণমূলের গণতন্ত্র আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউপি সদস্যরা সরাসরি মানুষের সেবার সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক সরকারের সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
দলীয় সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন চাপ অনুভব করবে কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনের জন্য সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ, পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসনসহ সব সরকারি সংস্থাকেই আমরা কাজে লাগাই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা চেয়েছি, তারা তা দিয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ও আমরা সেই সহযোগিতা পাব বলে আশা করি।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদেরা দেশের কথা চিন্তা করেন, দেশের মঙ্গল চান। তাই সবাই মিলে আমরা ভালো নির্বাচন উপহার দিতে পারব। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এ সরকারের অধীনে এখনো আমরা কোনো নির্বাচন করিনি। তাই আগাম কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং প্রায় ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এসব পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজন একটি বিশাল দায়িত্ব। এজন্য আরও বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
ঋণখেলাপিদের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে দুটি মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে তিনি দাবি করেন, আমরা কারও প্রতি দয়া দেখাইনি।
নির্বাচনসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মশালার বিষয়ে সিইসি বলেন, কোথায় কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। একটি নির্বাচন কমিশন সাধারণত একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেই বিদায় নেয়। পরে কমিশন নতুন করে শুরু করে। তাই ভবিষ্যৎ কমিশনের জন্য আমাদের অভিজ্ঞতা রেখে যেতে চাই।
ভোটার সচেতনতা কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সংঘাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্ভব নয়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাত হয়েই থাকে। তবে জাতীয় নির্বাচন যেহেতু সংঘাতমুক্ত করা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা সম্ভব বলে আমাদের আত্মবিশ্বাস রয়েছে।
সিইসি আরও বলেন, ইসি কারও পক্ষেও নয়, কারও বিপক্ষেও নয়। আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
দেশের কল্যাণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি সিইসি না হলেও দেশের মঙ্গল নিয়ে ভাবতাম। যে কোনো পরিস্থিতিতে দেশের ভালো কী, সেটাই চিন্তা করি। আমি চাই নির্বাচিত সরকারের হাতেই ক্ষমতা যাক। জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব থাকুক। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘদিন চলা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক সরকারই দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।
নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা আমার আছে। সবার সহযোগিতা নিয়েই নির্বাচন করেছি এবং সবার সহযোগিতা পেয়েছি। কেউ আমাদের প্রত্যাখ্যান করেনি।
ছবি : সংগৃহীত
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর পাহাড়ি ঢলের পানি ভারতের বিহার হয়ে গঙ্গায় মিশে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে আসতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন।
তবে নেপালে যে ভয়াবহ মাত্রার ঢল দেখা গেছে, তা একই শক্তিতে বাংলাদেশে পৌঁছাবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নদীপথে ভাটির দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এই ঢলের সর্বোচ্চ প্রবাহ বা তীব্রতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। তাই আপাতত বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কের চেয়ে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানির উচ্চতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের ভোটি কোশি ও ত্রিশুলি নদী দিয়ে নেমে আসা বন্যার পানি গতকাল বৃহস্পতিবার নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে। ভারতের বিহারে গণ্ডক নদী নামে পরিচিত এই নদী হাজিপুর ও সোনপুরের কাছে গঙ্গায় মিশেছে।
এরপর গঙ্গার প্রবাহ পূর্বদিকে এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে গঙ্গা বা পদ্মা নামে। তাই নেপালের এই পাহাড়ি ঢলের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায় পৌঁছানোর ভৌগোলিক পথ রয়েছে। তবে এই ঢল বাংলাদেশে কতটা প্রভাব ফেলবে, সে ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি।
নেপালের ত্রিশুলি নদী গণ্ডকী নদী অববাহিকার অংশ। দেবঘাটের কাছে কালী গণ্ডকীর সঙ্গে ত্রিশুলি মিলিত হয়ে নারায়ণী নদী তৈরি করেছে। নারায়ণী নদী ভারতের বিহারের বাল্মীকিনগরের কাছে গণ্ডক নামে প্রবেশ করেছে। নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর গণ্ডক অববাহিকায় পানির প্রবাহ বাড়ার আশঙ্কায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন বিহার ও উত্তর প্রদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গণ্ডক নদীর পানিপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে। বিহারের বাল্মীকিনগর গণ্ডক ব্যারাজের ৩৬টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার রাতে সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হয়েছিল এবং পরে প্রবাহ কমতে শুরু করে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিহারের পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সরণ, মুজাফফরপুর, বৈশালীসহ কয়েকটি জেলায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশিনগরেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পাহাড়ি ঢলের পানি গণ্ডক নদী দিয়ে ভাটিতে নেমে হাজিপুর-সোনপুর এলাকায় গঙ্গায় মিশবে। এরপর গঙ্গার মূল প্রবাহের সঙ্গে পূর্ব দিকে এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা এলাকায় পৌঁছাবে। ফারাক্কার পর গঙ্গার প্রবাহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে।
অর্থাৎ সম্ভাব্য গতিপথটি হলো নেপাল-ত্রিশুলি-নারায়ণী-গণ্ডক-হাজিপুর-সোনপুর-গঙ্গা-ফারাক্কা-বাংলাদেশ-গঙ্গা পদ্মা। কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশও এই নদীপথের কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেছেন, নেপালের পাহাড়ি ঢলের পানি ফারাক্কা অতিক্রম করে বাংলাদেশের গঙ্গায় প্রবেশ করতে পারে এবং পরে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মার প্রবাহে যুক্ত হবে। তবে ঠিক কখন এই পানি বাংলাদেশে পৌঁছাবে, তা বর্তমান পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্যভাবে বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, নেপালের পানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে কয়েকশ কিলোমিটার নদীপথ অতিক্রম করবে। এই দীর্ঘপথে নদীর প্রশস্ততা, বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় পানি ছড়িয়ে পড়া, নদীর ধারণক্ষমতা এবং অন্যান্য প্রবাহের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কারণে ঢলের তীব্রতা কমে যেতে পারে।
ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের পর্যবেক্ষণেও ভাটির দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় বন্যার ঢেউয়ের তীব্রতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, বর্তমানে কোনো আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি এবং নেপালের দিকের পানির স্তর কমছে।
ভারতের গণ্ডক অববাহিকায় পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা থাকলেও নেপালের ঢলের পুরো শক্তি বাংলাদেশে পৌঁছাবে– এমন পূর্বাভাস এখনও পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেপালের ঢল গঙ্গায় পৌঁছানোর সময় নদীটির বর্তমান পানিপ্রবাহ কেমন থাকবে।
বিহারের গঙ্গা অববাহিকার কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানির উচ্চতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে নেপাল থেকে অতিরিক্ত পানি গঙ্গায় যুক্ত হলে তার প্রভাব ভাটিতে কতটা পড়ে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ফারাক্কার পর বাংলাদেশের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানির উচ্চতা বাড়ে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। তবে শুধু নেপালের এই পাহাড়ি ঢলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বড় বন্যা হবে– এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনও আসেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজরদারির বিষয় হবে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়াসহ গঙ্গা-পদ্মার তীরবর্তী এলাকা এবং চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে কিনা, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সারদার উদয় রায়হান বলেন, দেশের নদীগুলোর পানির উচ্চতা নির্ধারণে শুধু নেপালের ঢল নয়, ফারাক্কা এলাকায় পানির প্রবাহ, ভারতের গঙ্গায় থাকা পানির পরিমাণ, একই সময়ে বাংলাদেশের স্থানীয় বৃষ্টি এবং পদ্মার নিজস্ব প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই নেপালে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে, তার কারণে বাংলাদেশে একই ধরনের পরিস্থিতি হবে এমনটি ধরে নেওয়ার কারণ নেই। আবার নদীগুলোর আন্তঃসীমান্ত সংযোগের কারণে বিষয়টি একেবারে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
বেড়েছে লোডশেডিং
চলমান গ্যাস-সংকটের সঙ্গে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহস্বল্পতা দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে হঠাৎ করে দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। আর সব সময়ই কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে থাকে, এখনো আছে। সব মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।
এ সময় গরমে চাহিদা বাড়তে থাকায় বেড়েছে লোডশেডিং, বাড়ছে ভোগান্তি। দেশে এখন মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৭টি। এর মধ্যে ৬৪টি কেন্দ্র সরকারি, ৭০টি বেসরকারি ও ৩টি কেন্দ্র ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। যার মধ্যে ২০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ ছিল। বাকিগুলো সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন করেছে। ফলে গতকাল দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট।
এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। প্রায় এক মাস ধরে চলছে লোডশেডিং। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে, গরম পড়লে এটি বেড়ে যায়। শুরুতে লোডশেডিংয়ের পুরোটাই ঢাকার বাইরে চাপানো হয়েছে।
তবে ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকার কোনো একটি এলাকায় একবার এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করার কথা থাকলেও সেটি মানা হচ্ছে না।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জালোওয়াশান আখতার খান বলেন, প্রতিদিন একাধিক বার লোডশেডিং হচ্ছে। গতকালও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুবার লোডশেডিং হয়েছে। এর মধ্যে জেনারেটর নষ্ট হয়ে গেছে। লিফটে আটকে পড়ার ভীতি কাজ করে। বাসায় গ্যাসও থাকে না। তাই বাড়তি খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে ডিপিডিসি ও ডেসকো। দুই কোম্পানির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট ও ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আর বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কোনো লোডশেডিং করা হবে না। কোনো এলাকায় একবারের বেশি লোডশেডিং হবে না। তার মানে ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার একজন গ্রাহক মাত্র ১ ঘণ্টা লোডশেডিং পাবেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সরবরাহ বুঝে এর ব্যত্যয় করতে হচ্ছে।
পিডিবি ও পিজিসিবি সূত্র বলছে, এর আগে এ মাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১০ আগস্ট। ওই দিন ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছিল। ৯ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহ টানা সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। এরপর এটি কমে এলেও দুই দিন ধরে আবার বাড়ছে। জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে না। আবার চাইলেও তেলচালিত কেন্দ্র থেকে সব সময় উৎপাদন করা যায় না, মাঝেমধ্যে বিরতির কারণে অর্ধেক সক্ষমতা ব্যবহার করা যায়। এতে করে বিদ্যুৎ ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে ত্রুটি ও জ্বালানিসংকট
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। তার মানে অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বসে ছিল।
গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাসের সংকটে কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে খরচ আরও বেড়ে যাবে। তবু সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তেলচালিত কেন্দ্র বেশি হারে চালাতে বলা হয়েছে। রাতে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন করা হচ্ছে। দিনে এটি দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকছে।
জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদন ক্ষমতা আছে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। পিজিসিবি সূত্র বলছে, গতকাল ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহস্বল্পতা ছিল।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা এখন প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। কারিগরি ত্রুটির কারণে পটুয়াখালীর পায়রা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ। বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি আছে। এর বাইরে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা দেড় হাজার মেগাওয়াট। কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। দিনের বেলায় ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ দিচ্ছে তারা।
ঢাকার বাইরে সারা দেশের গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতি। আরইবির পাশাপাশি কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি।
আরইবি সূত্র বলছে, সরবরাহ ঘাটতির কারণে তাদের একই এলাকায় একাধিকবার করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গত বুধবার রাত ১২টায় সারা দেশে মোট লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট। একই সময়ে আরইবির এলাকায় লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, ২০২০-২০২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এরপর বকেয়া বাড়তে থাকলে উৎপাদন কমানো হয়। লোডশেডিং বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে বকেয়াসহ পিডিবির যেসব বিরোধ আছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করা হলে এখনো তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
বাড়েনি গ্যাসের সরবরাহ
যাত্রাবাড়ী বিবির বাগিচার বাসিন্দা শর্মিলা শর্মি বলেন, বুধবার ছুটির দিনে বিকেলে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। এরপর রাত ১০টার সময় গিয়ে সাড়ে ১১টায় আসছে বিদ্যুৎ। গতকাল সকাল ১০টা ১০ মিনিটে গিয়ে এক ঘণ্টা পর আসছে। বেশির ভাগ সময় গ্যাসও থাকে না। তাই বিদ্যুৎ-চালিত চুলা ব্যবহার করেন। খরচ বেড়েছে কিন্তু ভোগান্তি কমেনি।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমছে নিয়মিত। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় ১০৫ কোটি ঘনফুট। গতকাল এলএনজি থেকে সরবরাহ হয়েছে ৭৪ কোটি ঘনফুটের কম। এতে করে গ্যাসের মোট সরবরাহ ছিল গতকাল ২৩৫ কোটি ঘনফুট। গ্যাস-সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে, শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, রান্না ও পরিবহনে গ্যাসের ভোগান্তি বেড়েছে।
আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়, বেড়ে যায় সংকট।
এরপর ১৫ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ উপযোগী হয় এক্সিলারেটের টার্মিনাল। কিন্তু নির্ধারিত সময় এলএনজির কার্গো না আসায় সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ বাড়তে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সংকটের মধ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজে এলএনজি আমদানি, চীনের অনভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ-এসবের মধ্যে সংকট উত্তরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কাঠামোগত সংস্কার দরকার। না হলে অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, চুরি বন্ধ হবে না; সংকটও কাটবে না।
মরদেহের কফিন ছুঁয়ে আর্তনাদ করেন স্বজনেরা।
সৌদি আরবের রিয়াদে একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪০ ফ্লাইটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।
এর আগে, গত ৯ অগাস্ট রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ওই অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করে।
৯ জনের মধ্যে- নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাতজন, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার একজন এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার একজন রয়েছেন।
বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে মরদেহগুলো গ্রহণ করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
মরদেহ গ্রহণের পর কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাকি ৭ জন নিহত কর্মীর ফিংগার প্রিন্ট পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় সিআইডির তত্ত্বাবধানে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ‘‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহত নয় কর্মীর প্রতি পরিবারের জন্য লাশ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং এককালীন আর্থিক অনুদান বাবদ ৩ লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।’’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা বিদেশ যান, অনেক কষ্টের কাজ করে পরিবারের জন্য টাকা পাঠান। যারা মারা গেছেন, মৃতদেহ এখনো আনতে পারিনি দেশে, তাদের মৃতদেহ দেশে আনতে সৌদি দূতাবাসের সবাই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। যেহেতু আগুন লেগেছে, তাদের ডিএনএ টেস্ট হবে, পরিবারের সাথে কথা হয়েছে, দ্রুত দেশে ফেরত আনা হবে।”
সচিবালয়ে কথা বলছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ। ছবিঃ সংগৃহীত
স্বাধীন ও উন্মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন নবনিযুক্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ।
একইসঙ্গে সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থার প্রধানদের কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রবিবার (২৩ আগস্ট) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রথম কর্মদিবসে আয়োজিত এক পরিচিতি সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।
তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, “সংবাদমাধ্যম হচ্ছে গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। বিগত ১৭ বছর আমাদের মূল লড়াই ছিল দেশে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে গণমাধ্যমের ওপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল, সেই কালচার থেকে বেরিয়ে স্বাধীন ও উন্মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “আন্দোলনে সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকদের অবদান খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের তথ্য জানার অধিকার রয়েছে এবং আমরা কী কাজ করছি তা সঠিকভাবে তাদের সামনে তুলে ধরা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব “
কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর আস্থা ব্যক্ত করে মন্ত্রী আরও বলেন, “আপনারা প্রশাসনিক কাজে আমার চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। দেশের স্বার্থে এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমরা সবাই এক হয়ে কাজ করব, যেন আমাদের কোনো সিদ্ধান্তের কারণে কারো প্রতি অন্যায় ও অবিচার না হয়।”
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানার সভাপতিত্বে সভায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বক্তব্য রাখেন।
পরিচিতিমূলক সভায় অন্যান্যের মধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ ও অধীনস্থ অন্যান্য দপ্তর-সংস্থার প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন।
পরিচিত সভা শুরু হওয়ার আগে সকাল সাড়ে ৯টায় মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। এ সময় নবনিযুক্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ ফুল দিয়ে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান।
সংসদ
পরিপূর্ণ সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে আংশিক সংস্কারের অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের ঠিক আগ মুহূর্তে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। সংসদে বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর আইনপ্রণয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে বিরোধী দলীয় সদস্য ডা. শফিকুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি নিয়ে কথা বলেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়ার কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধী দলীয় নেতা। পরে তিনি আজ উত্থাপনের জন্য নির্ধারিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপন হলে তাতে অংশ নেবেন না বলে ওয়াকআউট করেন।
রাত ৮টা ৬ মিনিটে সংসদ থেকে বেরিয়ে যায় বিরোধী দল। পরে তারা গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। নিয়মানুযায়ী, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে এগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এগুলো অনুমোদন বা অননুমোদনের শেষ সময় ছিল ১০ এপ্রিল।
নির্ধারিত সময়ে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা হয়নি। ফলে এগুলো কার্যকারিতা হারায়। আর সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।
গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ যে ১৬ অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে বিল আকারে আনা হয়নি, সেগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আনার কথা বলেছিল সরকার। এর একটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ।
অন্যদিকে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনঃপ্রচলনে এই সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল পাস করা হয়েছিল। তখন অধিকতর যাচাই–বাছাই করে মানবাধিকার কমিশন আইন আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছিল সরকার।
এর মধ্যে গত ৩ আগস্ট গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয় ১০ আগস্ট। এই দুটি আইনের খসড়া অনুমোদন করার পর থেকে মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। খসড়ার কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।
চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঢাকার আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে কিনবে সরকার। এ প্রকল্পে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
বিদ্যুতের দাম বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বিদ্যুৎ তাদের কাছ থেকে কিনবো ২৫ টাকা ইউনিট হিসেবে। প্রকল্পটি ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসেবে ২০২৮ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর নাগাদ আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
মীর শাহে আলম বলেন, বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি মনে হলেও এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় একটি সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশ সরকারকে এ প্রকল্পে কোনো বিনিয়োগ করতে হবে না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই জাতির জন্য, ঢাকা শহরের জন্য ময়লা-আবর্জনা একটা বড় বোঝা। মূল্যটা হয়তো বেশি মনে হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশের দিক বিবেচনা করলে, কার্বন ক্রেডিট বিবেচনা করলে আমাদের ওই খরচটা আবার অন্যভাবে চলে আসবে।
তিনি জানান, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার পাশাপাশি সেখান থেকে জৈব সারও উৎপাদন করা হবে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য সিটি করপোরেশনকে মাসিক ভাড়া দেবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আমিনবাজারের পাশাপাশি ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলে জমে থাকা বর্জ্য থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে চীনের পাওয়ার চায়না নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।