আজ সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠন করা জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি আজ মঙ্গলবার প্রথম বৈঠকে বসছে। জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কী হবে, সংবিধান সংশোধন কমিটি কীভাবে কাজ করবে, কত দিনের মধ্যে এ কমিটি প্রতিবেদন দেবে- এসব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
আজ প্রথম বৈঠকে কমিটির কর্মপরিকল্পনা ঠিক করার কথা রয়েছে।
সংবিধান সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছিল, সেটি অনুসরণ করছে না নির্বাচিত বিএনপি সরকার। বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদ।
এই কমিটির কার্যপরিধি হলো, ‘সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিমিত্ত সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে রিপোর্ট পেশ’। এ কাজ করার ক্ষেত্রে কমিটি কী কী করবে, কীভাবে কাজ করবে, তার বিস্তারিত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঠিক হয়নি। কত দিনের মধ্যে কমিটিকে সংসদে প্রতিবেদন দিতে হবে, সেটাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিটির সংসদে প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত কমিটিও অংশীজনদের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে আলোচনা করবে। এ ছাড়া কমিটি বিদ্যমান সংবিধান পর্যালোচনা, জুলাই সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব, বিএনপির দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত যেসব দফা ছিল, সেগুলোও পর্যালোচনা করবে। এসবের ভিত্তিতে সংবিধানের কোথায় কোথায় কী কী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, সে সুপারিশ করবে বিশেষ কমিটি।
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রথম বৈঠকে কমিটি নিজেদের কর্মকৌশল ঠিক করবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির অঙ্গীকার আছে। এর বাইরেও বিএনপির নিজস্ব কিছু অঙ্গীকার আছে। সংবিধানে কী কী সংশোধনী আনা যায়, তা নিয়ে বিশেষ কমিটি সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ সব স্তরের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করবে। এরপর কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করে সংসদে পেশ করবে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় সংসদে বিল আনবে। সে বিলের ওপর আবার সংসদে আলোচনা হবে। তারপর বিলের ওপর ভোটাভুটি হবে।
বিরোধী দল থেকে এই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিল সরকারি দল। তবে কারও নাম দেয়নি বিরোধী দল। গঠনের দিনই এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল।
সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সংসদে বলেছিলেন, এ ধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাঁদের ধারণাগত মতপার্থক্য আছে। তাঁরা সংবিধান সংস্কার চান।
সংবিধান সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর একটি ছিল অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, জনমত জরিপসহ বিভিন্নভাবে নেওয়া মতামতের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি ওই কমিশন বিস্তারিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়।
পরে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফায় দীর্ঘ আলোচনা করে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ।
সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ এ ধরনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। তবে এ ধরনের কিছু প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) ছিল।
ভিন্নমত থাকা বিষয়গুলো বিএনপি যেভাবে চায়, সেভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরেছিল। যেমন তারা একটি দলের নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের কথা বলেছে। জুলাই সনদের প্রস্তাবে নিম্নকক্ষে সারা দেশে পাওয়া ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের কথা বলা আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের নভেম্বরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়েছিল। সেটার আলোকে সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির ভিন্নমতের বিষয়গুলো গণভোটে উল্লেখ ছিল না।
অর্থাৎ ঐকমত্য কমিশনের মূল প্রস্তাবগুলোর ওপর গণভোট হয়েছে। এতে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা নেননি। ফলে ওই সংস্কার পরিষদও গঠিত হয়নি। বিএনপি দাবি করেছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ। এ ধরনের শপথ নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে তারা ভিন্নমতসহ স্বাক্ষর করেছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করবে।
বিশেষ কমিটি কি জুলাই সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে, নাকি সেগুলোকে কেবল বিবেচনায় রেখে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে নতুন করে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরি করবে- এমন প্রশ্নও আছে। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, সংবিধান সংস্কারে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান- মুসলিম বিশ্বের এই তিন দেশ সম্প্রতি যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে, তাতে বাংলাদেশও যোগ দেবে কিনা তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। একদিকে সামরিক তাৎপর্য, অন্যদিকে জোটের সম্প্রসারণের চেষ্টা দুটি মিলিয়েই এই চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশেরও আগ্রহ আছে।
যদিও বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখানো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পায়নি। যদিও চুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশ ‘ইতিবাচক অবস্থানে’ আছে বলে তিনি জানান।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া কতটা জরুরি? এই প্রশ্ন উঠছে, কারণ মক্কা জোটে যোগ দিলে ভূ-রাজনৈতিক নানা ঝুঁকির কথাও বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের লাভ কী এবং এতে কোনো ঝুঁকি আছে কি-না।
এই জোটের গুরুত্ব কী?
মুসলিম বিশ্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ-সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান। সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারকদের একটি এবং একইসঙ্গে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। তুরস্ক নেটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী। তাদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত মানের এবং দেশটির আধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন, মিসাইল সমৃদ্ধ শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে।
আর মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রশক্তির দেশ পাকিস্তান। তিনটি দেশ মিলে যে চুক্তি সই করে তার আনুষ্ঠানিক নাম মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। এটা স্বাক্ষরও হয় মুসলিমদের সর্বোচ্চ পবিত্র নগরী মক্কায়। একে এমন একটি জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে যেখানে মুসলিম দেশগুলো একত্রিত হচ্ছে।
সামরিক জোটের অংশ হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় আর গোয়েন্দা তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে কোন দেশ কতটুকু অবদান রাখবে, তা নিয়ে সব দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
ফলে সামরিক তাৎপর্য থাকায় তিনটি দেশের এই যৌথ প্রতিরক্ষা জোট বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি করে। অনেকেই এটাকে ‘মুসলিম নেটো’ নামেও ডাকছেন।
কারণ, চুক্তি অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ঠিক একইরকম ধারা ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধীতায় মার্কিন নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নেটোতেও রয়েছে। ফলে মক্কা জোটের সামরিক উদ্দেশ্য তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট এই চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কী বলেছেন?
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, মক্কা প্যাক্টকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ। তবে এ নিয়ে আলোচনা করার সময় এখনো আসেনি।
‘এতে যোগদান করার বিষয়টি এখানো আসেনি। কারণ এটা নির্ভর করছে যারা এই প্যাক্টের সদস্য, তাদের অভিপ্রায়ের ওপর। তারা যদি অভিপ্রায় প্রকাশ করেন বাংলাদেশকে এই প্যাক্টে নেওয়ার জন্য, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই সেটা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করবো।’
মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ না পেলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশ এতে যোগ দিতে আগ্রহী।
‘মক্কা প্যাক্ট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটা ব্যবস্থা এবং এটা আমাদের মুসলিম পরিবারের আভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং এটা নিয়ে কারো, অন্যান্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নাই,’ বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
একইসঙ্গে তিনি জানান, যেহেতু এই জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হয়নি ফলে এখানে যোগ দিলে কী লাভ হবে সেগুলোও আলোচনা করার সময় এখনো আসেনি।
বাংলাদেশের লাভ কী?
মক্কা প্যাক্ট মূলত প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি। নামেই প্রতিরক্ষা শব্দটি আছে। চুক্তিতেও আলোচনা হচ্ছে মূলত এই জোটের যৌথ সামরিক সক্ষমতা নিয়ে। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তুরস্ক ও পাকিস্তান।
যৌথ জোটের দেশগুলো সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় থেকে শুরু করে অস্ত্র প্রযুক্তি বিনিময় পর্যন্ত যেতে পারে। জোটের তিনটি দেশের তিন ধরনের সক্ষমতা আছে। যেটা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। সৌদি আরবের আছে অঢেল অর্থ, তেল, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা এবং রাজনৈতিক শক্তি।
তুরস্কের আছে অত্যাধুনিক সামরিক শিল্প, ড্রোন প্রযুক্তি, মিসাইল, সেন্সর, নৌশক্তি এবং ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা। আছে উন্নত মানের অস্ত্র প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ। পাকিস্তানের আছে দক্ষ সৈন্য, বিশাল পেশাদার সেনাবাহিনী ও অবকাঠামো, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরমাণু অস্ত্র।
এই চুক্তির ফলে সৌদি আরবের জন্য আমেরিকার বাইরে অস্ত্র সংগ্রহের নতুন দ্বার খুলে যাচ্ছে। তারা তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র আমদানি করতে পারবে। অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের দরকার অর্থ। তারা অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিক্রি করে সেটা পাবে এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নতুন বিনিয়োগ করতে পারবে। এই দেশগুলো যদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যৌথভাবে কাজ করে তাহলে সেটা দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আর এখানেই আসছে বাংলাদেশসহ নতুন দেশগুলো যদি মক্কা জোটে যুক্ত হয়, তাহলে তাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ। সেগুলো কী?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজ বলেন, ‘এখানে বাংলাদেশের প্রাপ্তির অনেক কিছুই আছে। সেটা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে পার্টনারশিপ হতে পারে, ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সম্পর্ক সৃষ্টি হতে পারে যেটা আসলে বড় বড় সামরিক জোটে এধরনের তথ্য আদান-প্রদান হয়ে থাকে।’
তিনি ঢাকা ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
‘আমরা তুরস্ক থেকে বায়রাক্তার ড্রোন, আরমার্ড ভেহিকেল এরকম অনেক কিছুই আমদানি করি। এই অংশীদারত্বটা আরো বড় হতে পারে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের একটা সুযোগও আসে যে, তুরস্কের মতো একটা দেশের সঙ্গে আমরা জয়েন্ট কোলাবরেশনে গিয়ে কোনোকিছু উন্নত করতে পারি কিনা, বিশেষত মিলিটারি টেকনোলজির ক্ষেত্রে,’ যোগ করেন হাসিব আজিজ। এছাড়া এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের নৌপথের কৌশলগত সাপ্লাই চেইনকেও শক্তিশালী করবে।
হাসিব আজিজ আরও বলেন, ‘আপনি যদি ম্যাপ খেয়াল করেন। বঙ্গোপসাগর, তারপর ভারত মহাসগর এবং এরপরে আরব সাগর। সুতরাং আমরা যখন ভারত মহাসগরকে ক্রস করে যাচ্ছি, তখন যদি আমার ওই অঞ্চলে একটা চুক্তি থাকে, তাহলে সেটা আমাদের প্রবেশাধিকারকে অনেক সহজ করে। আমরা ওখান থেকে এলএনজি আনছি, পেট্রোলিয়াম আসে। সুতরাং সেখানকার কোনো একটা সিগনিফিকেন্ট অ্যাক্টরের সঙ্গে যদি সামরিক সম্পর্ক থাকে, সেটা তো আমার বেনিফিটে কাজ করার কথা। এবং একইসঙ্গে এটা আমার ইকোনমিক লাইফ লাইনকেও সাহায্য করবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিনও মনে করেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমুদ্রে নৌ-চলাচল এবং নিরাপত্তা একটা বড় উদ্দেশ্য। তাছাড়া সৌদি আরবে বহুসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন। দেশটি বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের একটি প্রধানতম উৎস। সৌদি আরব বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগীও বটে। ফলে চুক্তিতে থাকলে সেটা বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানো থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সহায়তারও নতুন দ্বার খুলতে পারে।
বাংলাদেশের ঝুঁকি কী?
বাংলাদেশ যদি চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে ঝুঁকি অনেকগুলোই আছে।
প্রথমটিই হচ্ছে, জোটের একটি নির্দিষ্ট নীতি যেখানে বলা হয়েছে, কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেটা জোটের বাকি দেশগুলোর উপরও হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে বলা হচ্ছে, নেটোর আদলে এমন কোনো জোটে বাংলাদেশ থাকলে সেটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করবে।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি। মক্কা জোটে পাকিস্তান থাকায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত শুরু থেকেই এই জোটকে এক ধরনের হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান যেকোনো সংঘাতে মক্কা জোটের ভূমিকা কী হবে এবং বাংলাদেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে কিনা সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্টের ঝুঁকি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে।
মক্কা জোটে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন।
‘আমাদের প্রায়োরিটি অনেকগুলো আছে। সেগেুলো মাথায় রেখে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে, আমি একটি সামরিক জোটে জয়েন করতে চাই কিনা। একইসঙ্গে আমাকে চিন্তা করতে হবে যে, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের জন্য আমার দক্ষিণ এশিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাকি একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বেশি প্রয়োজন।’
‘এখানে অবশ্য বিষয়টা এমন না যে, যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। এখানে দুটোই একইসঙ্গে সম্ভব। কিন্তু চুক্তিতে ডিফেন্স কথাটা যেহেতু আছে এবং ডিফেন্স প্যাক্টের মতো করে এটা চিন্তা করা হচ্ছে, সুতরাং এই এলাকায় এর প্রভাবটাও বিবেচনা করতে হবে,’ বলেন অধ্যাপক ইয়াসমিন।
তার মতে, বাংলাদেশ সবসময় সামরিক জোট থেকে দূরে থাকার নীতি অতীতে দেখিয়েছে।
‘বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত কখনই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। যদি এখন যোগ দিতে চায় তাহলে সেটা হবে প্রথম। সুতরাং কোনো কিছুতে প্রথম হওয়ার আগে জাতীয় পর্যায়ে এটাকে আলোচনা করা দরকার।’
এছাড়া জোটে পাকিস্তান থাকায় এই জোট নিয়ে ভারতের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।
বাংলাদেশের একজন ভূ-রাজনীতির গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি।
‘এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলে শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরাইল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা।’
‘এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি।’
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। এর আওতায় ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী আমলের দুর্নীতি, দুঃশাসন, সিন্ডিকেট ও অনিয়মের কারণে বন্ধ থাকা শ্রমবাজারকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। এই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এই সরাসরি বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের ঐতিহাসিক ও বিশাল সম্ভাবনার দ্বার আজ উন্মোচিত।
মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেখানে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এ ধরনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ। এই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকায় মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত বাংলাদেশের পক্ষে পরিবর্তন সহজ নয়। তবে এ বিষয়ে বর্তমান সরকার মালয়েশিয়ার সরকারের সঙ্গে আলোচনার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ সরকারের মূল সাফল্য এখানেই যে, মালয়েশিয়ার নিজস্ব আইনি শর্তাবলি ও নীতিমালার সঙ্গে সর্বোচ্চ সমন্বয় রক্ষা করে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কল্যাণ ও সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বর্তমান সরকারের অব্যাহত সফল প্রচেষ্টার ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে যাচ্ছে। একটি বড় মাইলফলক হলো, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (জিরো কস্ট) নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয়মুক্ত এই কর্মীদের প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মাধ্যমেই আবার শুরু হবে এই শ্রমবাজার।
মালয়েশিয়া সরকারের মন্ত্রিসভার নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচটি দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়, যা মালয়েশিয়া সরকারের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দৃঢ়ভাবে অনুরোধ জানানো হয়, যেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে যারা ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী এবং সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সবাইকে বাদ দিয়ে অবশিষ্টদের মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, গত ছয় মাস ধরে বাংলাদেশ সরকারের ধারাবাহিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বিবেচনায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সুযোগ দিয়েছে। মালয়েশিয়া তাদের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত করেছে এবং বাংলাদেশের অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে আরও ৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছে। এর পাশাপাশি, একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলও যথারীতি এই প্রক্রিয়ায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। বিদ্যমান বহুবিধ নিয়মতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও একযোগে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর এই সুযোগ এক ঐতিহাসিক অর্জন।
এজেন্সি যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি সম্পন্ন করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি। অতীতে এ ধরনের স্বচ্ছ ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো নজির ছিল না। এই বাছাই প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের ন্যূনতম কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ সমাপ্ত হলে নতুন সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে বলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় দৃঢ়ভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। সেই সঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অংশ হিসেবে আমরা চাই যেন সব রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। তবে চলমান উদ্যোগের ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া যে সীমাবদ্ধতায় নির্বাচিত সরকার আবদ্ধ, আশা করি তা সবাই উপলব্ধি করবেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্তকরণের স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারগুলো পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধিদল সরেজমিনে বাংলাদেশে এসে প্রতিটি মেডিকেল সেন্টার পরিদর্শনের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে, সেহেতু এই প্রক্রিয়ায় সময়ের প্রয়োজন। তাই মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিতর্কিত মেডিকেল সেন্টার বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১৬টি সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, শ্রমবাজার চালুর পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করে সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করবে।
মন্ত্রণালয় জানায়, কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিমানবন্দরে অতীতের সব প্রকার হয়রানি বন্ধ করা, সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কাজে যোগদান এবং মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি, অভিবাসন সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হবে।
এদিকে এই শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণকে ঘিরে নানামুখী বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে যে প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির যে কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে সেটি দেশের জন্য একটি বিশাল অর্জন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসবে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও সুদৃঢ় হবে। তাই রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমাদের সবার উচিত ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ করা যায় এবং অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। এ লক্ষ্যে দল, মত ও পথের ঊর্ধ্বে উঠে শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে সব অংশীজনকে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হচ্ছে, যোগ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি প্রেরণ শুরু হবে, তার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অবহিত করবে। সুতরাং, মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা জারি না করা পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল টেস্ট করা কিংবা পাসপোর্ট জমা দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আগ্রহ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব বিষয়ের ওপর তারা ‘নিবিড়’ নজর রাখছেন। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুর সাংবাদিক কল্লোল ভট্টাচার্য।
তিনি জানতে চান, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ থেকে যেসব মন্তব্য আসছে, সে বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী।
কল্লোল বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই চুক্তির বিষয়ে কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ এতে যোগ দেবে কি না, তা একান্তই তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং এটি নিয়ে কারও অস্বস্তির কিছু নেই। তিনি এ চুক্তিকে ‘ইসলামি পরিবারের নিজেদের বিষয়’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
এ প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, "আপনার প্রশ্নের জবাবে আমার এটুকুই বলার আছে যে, ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সব গতিবিধির দিকে আমরা নিবিড়ভাবে নজর রাখছি এবং আমাদের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করব।"
গত ৭ অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে এই ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে তৈরি এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো যৌথ নিরাপত্তা।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, এই তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে, তা তিন দেশের ওপরই হামলা বলে গণ্য করা হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বলেন, সদস্য দেশগুলো যদি বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়, তবে ঢাকা তা অবশ্যই ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও বলেছিলেন, সরকার এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে এবং দেশের অর্থনীতি, মানুষ ও পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থ মূল্যায়ন করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়েও মুখপাত্রের কাছে জানতে চাওয়া হয়।
সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু পরিবারগুলোকে ‘নিশানা’ করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ সরকার সেখানে যথাযথ পদক্ষেপ ‘নিচ্ছে না’। এ নিয়ে ভারতের কোনো উদ্বেগ রয়েছে কি না?
জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উত্তরে বলেন, "বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব।"
আইরিন জুবাইদা খান
জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন খ্যাতিমান মানবাধিকার কর্মী আইরিন জুবাইদা খান। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে তিনি পরিচয়পত্র পেশ করেন বলে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে আইরিন খান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার হিসাবে ২০২০ সালের ১ অগাস্ট থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন আইরিন খান। এই পদে কাজ করা প্রথম নারী তিনি।
গেল ৮ জুলাই আইরিন খানকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং সে অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
২০০১ সাল থেকে আট বছর মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন আইরিন খান জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হলেন।
সালাহউদ্দিন নোমানকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে এনে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা আইরিন খান জেনিভার গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষক।
২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সময়ে তিনি আইনের শাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা আন্তঃসরকার সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল’ অর্গানাইজেশনের (আইডিএলও) নেতৃত্ব দেন।
২০১১ সালে নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ল স্কুলের ভিজিটিং অধ্যাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন করা আইরিন খান যুক্তরাজ্যের স্যালফোর্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ছিলেন ২০০৯ থেকে ২০১৫ সময়ে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরে কর্মজীবন শুরু করে সেখানে ২১ বছর কাজ করেছেন তিনি, দায়িত্ব পালন করেছেন সদরদপ্তরসহ বিভিন্ন দেশে। ভারতে ইউএনএইচসিআরের মিশন প্রধানের দায়িত্বও সামলেছেন।
বিশ্ব ব্যাংকের জেন্ডার উপদেষ্টা পরিষদ, ইউএনএইডসের এইচআইভি প্রতিরোধ ও মানবাধিকার উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল এবং জাতিসংঘের গ্লোবাল কমপ্যাক্ট বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসাবেও আইরিন খান দায়িত্ব পালন করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এবং উগান্ডার ‘বেয়ারফুট ল’ প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যও ছিলেন তিনি।
২০১০-২০১১ সময়ে ডেইলি স্টার পত্রিকার কনসাল্টিং এডিটর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন আইরিন খান।
তিনি পড়াশোনা করেছেন ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি এবং হার্ভার্ড ল স্কুলে।
মানবাধিকারের লড়াইয়ে অবদানের জন্য ২০০৬ সালের সিডনি শান্তি পুরস্কারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন আইরিন খান।
প্রতীকী ছবি
সারা দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করছে। চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩২ হাজার ৫৯০ জন। এ সময় প্রাণ হারিয়েছেন ৮৮ জন। অধিকাংশ রোগী ও মৃত্যুর হার রাজধানীকেন্দ্রিক। তবে চলতি বছর ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন খুলনা বিভাগে।
এ বছর খুলনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৯ শতাংশ খুলনায়। এ সময় খুলনায় রোগটি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজারের বেশি। এই পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিন বছর আগে ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণ ছিল বরিশাল ও চট্টগ্রামে। ওই সময় বরিশালে ৩৮ হাজার ৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ২০৯ জন মারা যান। ২০২৪ সালে ঢাকার বাইরে মৃত্যুর হিসাবে তৃতীয় শীর্ষে উঠে আসে।
গত বছরও প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থা ছিল। এ বছর ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর মৃত্যুচিত্রে ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটছে। চলতি মাসের শেষদিকে ঢাকার বাইরে খুলনা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু সংক্রমণের তীব্রতা ও মৃত্যুর অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। এ বছর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এডিস মশা নিধনে জোর দিতে হবে। সেপ্টেম্বর মাসে এডিস মশার প্রজনন রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা খুলনা এলাকায় আরও বাড়তে পারে।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ নয়। গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণের তীব্রতা ও মৃত্যুর কেন্দ্র পরিবর্তিত হচ্ছে। এ বছর ঢাকার বাইরে খুলনা অঞ্চলে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। বর্ষার শেষভাগে এডিস মশার প্রজনন বাড়ে, ফলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই শুধু হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সেখানে আগেভাগেই ব্যবস্থা নেওয়াটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
ঢাকার বাইরে মৃত্যুতে দ্বিতীয় বরিশাল-ময়মনসিংহ ঢাকা বিভাগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন হাসপাতালে ৩১, উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন হাসপাতালে ১১ ও সিটি করপোরেশনের বাইরে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। খুলনায় এ বছর এ পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যার মধ্যে শুধু খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১৩ জন। খুলনা বিভাগের পরই ঢাকার বাইরে প্রাণহানির তালিকায় যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ। এই দুটি বিভাগের প্রতিটিতেই ডেঙ্গুতে আটজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। বরিশালে মৃত আটজনের মধ্যে চয়জন মারা গেছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ছাড়া পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলায় একজন করে মোট দুইজন রোগী মারা গেছেন। বরিশাল বিভাগে এ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৪৪৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ময়মনসিংহ বিভাগে মৃত আটজনের মধ্যে ময়মনসিংহ জেলা সদরে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। যাদের সবাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া শেরপুর জেলায় একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে এ পর্যন্ত রোগটি শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৯৬ জনের। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচজন, রাজশাহী বিভাগে চারজন এবং সিলেট ও রংপুর বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।
শনাক্তের হিসেবে অধিকাংশই পুরুষ, মৃত্যুহার বেশি নারীর ডেঙ্গু শনাক্তের হিসেবে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর হিসেবে নারীর সংখ্যাই বেশি। এ বছর শনাক্ত ৩২ হাজার ৫৯০ রোগীর মধ্যে ২০ হাজার ৩৮ জন পুরুষ। আর ১২ হাজার ৩৫৫ জন নারী। অর্থাৎ, ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ, আর ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ নারী। এ বছর মোট মারা যাওয়া ৮৮ জনের মধ্যে ৫১ জন নারী, আর ৩৬ জন পুরুষ। অর্থাৎ, ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারী, আর ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ।
ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ২ হাজারের বেশি রোগী ডেঙ্গু নিয়ে নতুন ৩৪২ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮০ জন। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ৬১৭ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে। এ ছাড়া খুলনায় ৫৭৫, বরিশালে ৩৫৬, ময়মনসিংহে ১৭৯, চট্টগ্রামে ১৬৩, রাজশাহীতে ১৫৩, রংপুরে ৩০ ও সিলেট বিভাগে সাতজন চিকিৎসাধীন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩২ হাজার ৫৯০ জন। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩০ হাজার ৪২২ জন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
বাংলাদেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে দায়িত্ব পালনে নতুন রাষ্ট্রপতির সাফল্য কামনা করেন তিনি।
ঢাকার রুশ দূতাবাস জানায়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় ভ্লাদিমির পুতিন তার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানান। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের মঙ্গলকামনা, সুস্বাস্থ্য এবং বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম জনগণের কল্যাণে তার ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টায় সাফল্য কামনা করেন তিনি।
রুশ প্রেসিডেন্টের এই অভিনন্দন বার্তায় বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটেছে।
গত ২০ আগস্ট বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান হয়। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।