ঢাকা ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ
কালীগঞ্জে ঈদ পূর্নমিলনী ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পঞ্চগড়ে ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে ব্যাপক কাযক্রম গ্রহণ রংপুরে তিস্তা নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার যৌথবাহিনীর হাতে রসিক কাউন্সিলর গ্রেফতার লোহাগাড়া সড়ক দূর্ঘটনা ট্রাজেডি: মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হল আরও ৩জন লোহাগাড়ায় থামছেইনা মহাসড়কের মৃত্যুর মিছিল, দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত-৫ আহত ৯ সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রংপুরে ১২০ পরিবারে ঈদ পালন লঞ্চ থেকে আবর্জনা নদীতে ফেললে নেয়া হবে ব্যবস্থা রংপুরে প্রধান ঈদের জামাত সকাল সাড়ে আটটায় বরগুনায় বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন ভাই নিহত

১৬ বছরে মা’সহ ২৬ স্বজনকে হারিয়েছেন বরগুনার আলতাফ

চৌধূরী মুনীর হোসেন, বরগুনা প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৪:৪৩:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৫
  • / ১১৭ Time View

দীর্ঘ ১৬ বছর কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন পিলখানা হত্যাকান্ডের মামলায় জামিন পাওয়া বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাবেক ল্যান্স নায়েক বরগুনার আলতাফ হোসেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি হারিয়েছেন মাসহ পরিবারের ২৬ জন স্বজনকে। এমনকি মায়ের জানাজায় উপস্থিত থাকতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলেও মেলেনি অনুমতি। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে মুক্তির পর এখন চাকরি পুনর্বহালের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন আলতাফ ও তার পরিবারের সদস্যরা।

আলতাফ হোসেনের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ১ নম্বর বদরখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাওয়ালকার এলাকায়। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে ১৯৯২ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি বিডিআরে যোগ দেন। পরবর্তীতে সরকারের নির্দেশনায় ২০০৯ সালের ৩ মার্চ বিডিআর ১৩ ব্যাটালিয়নে ল্যান্স নায়েক হিসেবে পিলখানায় যোগদান করেন আলতাফ হোসেন। এরপর মর্মান্তিক পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় ওই বছরের ২৩ মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় ২ বছর বয়সী এক ছেলে এবং ৪ বছর বয়সী এক মেয়েকে রেখে কারাবন্দি হতে হয় আলতাফ হোসেনকে।

পরবর্তীতে আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরসহ হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়। এর মধ্যে বিভাগীয় মামলায় তার সাত বছরের কারাদন্ড এবং দায়েরকৃত হত্যা মামলায় তিনি খালাস পান। এছাড়া বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটিতে গত ১৯ জানুয়ারি জামিন পেয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২৩ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৬ বছর পর বরগুনায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন আলতাফ হোসেন। তবে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে ২৬ জন স্বজনের সঙ্গে ২০২২ সালে মৃত্যু হয় তার মা আমেনা বেগমের।

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কারাগারে থাকায় ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া ও ভরণপোষণসহ পরিবারের হাল ধরেন আলতাফ হোসেনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা। একদিকে স্বামীর মামলা পরিচালনার খরচ, অপরদিকে দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে অমানবিক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। বুঝতে শেখার আগে বাবা দূরে আছেন জানিয়ে বুকে কষ্ট চাপিয়ে বড় করতে হয়েছে ছেলে-মেয়েকে। টাকার অভাবে অনেক সময় তিনবেলা ঠিকভাবে খাবার যোগাতেও হিমশিম খেতে হয়েছে শিরীন সুলতানাকে।

সরেজমিনে আলতাফ হোসেনের বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ বছর পর আলতাফ জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে ফেরায় আনন্দের জোয়ার বইছে বাড়িজুড়ে। দূর-দুরন্ত থেকে স্বজনরা ছুটে এসেছেন আলতাফের সঙ্গে দেখা করতে। ১৬ বছর পর স্ত্রী সন্তানদের কাছে পেয়ে আনন্দের অশ্রুও ঝরছে আলতাফের। ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতি বিজড়িত স্থানসহ বিভিন্ন স্বজন ও মায়ের কবর দেখতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। তবে সব কিছু কাছে পেয়েও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো বরগুনার আরও দুজন কারাগারে থাকায় পরিপূর্ণ আনন্দ নেই আলতাফ হোসেনের মনে। খুব দ্রুতই তাদেরও মুক্তি মিলবে এমটাই আশা করছেন তিনি।

বাবাকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতে পেরে আলতাফ হেসেনের ছেলে আকিব হোসেন রাফি বলেন, ‘ছোটবেলায় মায়ের কাছে শুনেছি বাবা দূরে কোথাও আছেন। আমাদেরকে কখনোই ঠিকভাবে বলেনি বাবা কারাবন্দি। বুঝতে শেখার পরে জেনেছি বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় বাবা কারাগারে আছে। ছোট বেলায় যখন দেখতাম স্কুলের বিভিন্ন বাচ্চাদেরকে তাদের বাবা এসে নিয়ে যায় কিন্তু আমরা বাবার সেই আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছি। মায়ের সঙ্গে কান্নাকাটি করতাম আমাদের বাবা কেনো আসে না, কখন আসবে তা জানতে চাইতাম। দীর্ঘ বছর পর বাবাকে ছাড়া আমাদের পথ চলটা খুবই কষ্টের ছিল। মা একা আমাদেরকে মানুষ করেছে। আমার বোন বরিশালে কৃষি ডিপ্লোমা এবং আমি বরগুনা সরকারি কলেজে লেখাপড়া করছি। তবে আমাদের বিপদের সময় বরগুনার মানুষ বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

স্বামীর অবর্তমানে পরিবারের হাল ধরা আলতাফ হোসেনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা বলেন, ‘আমার স্বামী জেলে যাওয়ার পর থেকেই আমাদের জীবনযুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর স্বামী থাকতেও স্বামী ছাড়া থাকতে হয়েছে, এ কষ্ট শুধু একজন ভুক্তভোগী নারীই বুঝতে পারবে। আমার মেয়েটাকে ডাক্তারি পড়ানোর ইচ্ছে থাকলেও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জেলে থাকায় তা আর সম্ভব হয়নি। আল্লাহর হুকুম এবং আমার বাবা, মা, ভাই ও দেবরের সহযোগিতায় যতটুকু সম্ভব হয়েছে ছেলেমেয়েদের জন্য চেষ্টা করেছি। এমনও অনেক দিন গেছে টাকা নেই, ঘরে খাবার নেই। খাবারের জন্য মেয়ে কান্না করছে, তখন বলেছি আম্মুকে চুমা দেও দেখবা তোমার খুদা কমে গেছে। একজন পরাজিত মায়ের সন্তানের সামনে এর থেকে কষ্টের জীবন আর কী হতে পারে? ছেলেমেয়ের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারা মায়ের বেঁচে থাকা আর না থাকা সমান কথা।’

তিনি আরও বলেন, ‘যখন ছেলেমেয়েকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম তখন ছেলে তার বাবাকে চিনতে পারতো না। বাবা তার মেয়েকে চিনতে পারতো না। আমরাও এই দেশের জনগণ কিন্তু সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকার কখনো কোনো বিডিআর সদস্যের পরিবারের খোঁজখবর নেয়নি। এছাড়াও যখন আমার শাশুড়ি মারা যায় তখন সরাসরি আমি জেলারের কাছে ফোন করেছিলাম। জানাজায় উপস্থিত থাকতে এবং মৃত মাকে দেখার জন্য অনুমতি চাইলেও তিনি তখন বলেন সম্ভব না। অবশেষে জামিনে আমার স্বামীর মুক্তি মিলেছে। আমাদের একটাই দাবি বিনাদোষে কেনো আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে? কেন আমাদের জীবন ধ্বংস করা হয়েছে? আমরা ওই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিচার চাই। এছাড়াও আমরা পুনরায় চাকরি ফেরত এবং ক্ষতিপূরণসহ বেতন ভাতা পরিশোধ করার দাবি জানাই।’

আলতাফ হোসেন বলেন, ‘বন্দিদশা জীবনের শুরু হলে সন্তানসহ পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমার পরিবারটি আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারব কিনা তার কোনো নিশ্চয়তাই আমাদের ছিল না। সব থেকে বেশি পীড়া দেওয়ার বিষয় হচ্ছে যখন ছেলেমেয়ে কারাগারে আমার সঙ্গে দেখা করতে যেত তখন তারা আমাকে চিনতো না। বাবাকে সন্তানেরা চেনে না এটা যে কত কষ্টের তা বলে বুঝানো যাবে না। এছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে আমি যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তা অপূরণীয়। ‘

তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পূর্বে ধরেই নিয়েছিলাম আর কখনো হয়তো কারাগার থেকে বের হতে পারব না। জেলখানায় একটি কথা প্রচলন আছে ‘হয়তো হাটিয়া নয়তো খাটিয়া’ আমাদের ধারণা ছিল আমাদের খাটিয়াই বের হবে। ৫ আগস্টের পর আমাদের ধারণা পাল্টাতে শুরু হয়। তবে এখনো পরিপূর্ণ আনন্দ প্রকাশ করতে পারছি না। বরগুনার আরও দুজন একত্রে আমরা সঙ্গে কারাগারে বন্দি ছিল। তাদের এখনো জামিন হয়নি, যখন তারাও বের হয়ে আসবে তখন পরিপূর্ণ আনন্দ প্রকাশ করতে পারব।’

পিলখানার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে আলতাফ বলেন, ‘পিলখানা একটি বড় এলাকা, সবকিছু আমরা জানি না। কী ঘটেছিল তা বলতে পারব না। নতুন করে তদন্ত করা হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস এখন সবকিছুরই সঠিক তথ্য বের হয়ে আসবে।’

ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিডিআর সদস্যদের জন্য বিডিআর কল্যাণ পরিষদ নামে একটি গ্রুপ আছে। ওই পরিষদের মাধ্যমে আমাদের চাকরি পুনর্বহাল, আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়াসহ যে সিদ্ধান্ত আসবে আমি সেই সিদ্ধান্তে একমত। ব্যক্তিগতভাবে কোনো চাওয়া নেই। তবে এটুকু বলতে পারি দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে কয়েকবার আমি হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছি। কিন্তু বারবার আপিল করে আমাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে। যেহেতু আমি হত্যা মামলা থেকে নির্দোষ হিসেবে অব্যাহতি পেয়েছি এ কারণে আমার চাকরি ফিরে পাওয়াসহ ক্ষতিপূরণে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।’

Please Share This Post in Your Social Media

১৬ বছরে মা’সহ ২৬ স্বজনকে হারিয়েছেন বরগুনার আলতাফ

চৌধূরী মুনীর হোসেন, বরগুনা প্রতিনিধি
Update Time : ০৪:৪৩:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৫

দীর্ঘ ১৬ বছর কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন পিলখানা হত্যাকান্ডের মামলায় জামিন পাওয়া বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাবেক ল্যান্স নায়েক বরগুনার আলতাফ হোসেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি হারিয়েছেন মাসহ পরিবারের ২৬ জন স্বজনকে। এমনকি মায়ের জানাজায় উপস্থিত থাকতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলেও মেলেনি অনুমতি। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে মুক্তির পর এখন চাকরি পুনর্বহালের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন আলতাফ ও তার পরিবারের সদস্যরা।

আলতাফ হোসেনের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ১ নম্বর বদরখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাওয়ালকার এলাকায়। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে ১৯৯২ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি বিডিআরে যোগ দেন। পরবর্তীতে সরকারের নির্দেশনায় ২০০৯ সালের ৩ মার্চ বিডিআর ১৩ ব্যাটালিয়নে ল্যান্স নায়েক হিসেবে পিলখানায় যোগদান করেন আলতাফ হোসেন। এরপর মর্মান্তিক পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় ওই বছরের ২৩ মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় ২ বছর বয়সী এক ছেলে এবং ৪ বছর বয়সী এক মেয়েকে রেখে কারাবন্দি হতে হয় আলতাফ হোসেনকে।

পরবর্তীতে আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরসহ হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়। এর মধ্যে বিভাগীয় মামলায় তার সাত বছরের কারাদন্ড এবং দায়েরকৃত হত্যা মামলায় তিনি খালাস পান। এছাড়া বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটিতে গত ১৯ জানুয়ারি জামিন পেয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২৩ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৬ বছর পর বরগুনায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন আলতাফ হোসেন। তবে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে ২৬ জন স্বজনের সঙ্গে ২০২২ সালে মৃত্যু হয় তার মা আমেনা বেগমের।

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কারাগারে থাকায় ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া ও ভরণপোষণসহ পরিবারের হাল ধরেন আলতাফ হোসেনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা। একদিকে স্বামীর মামলা পরিচালনার খরচ, অপরদিকে দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে অমানবিক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। বুঝতে শেখার আগে বাবা দূরে আছেন জানিয়ে বুকে কষ্ট চাপিয়ে বড় করতে হয়েছে ছেলে-মেয়েকে। টাকার অভাবে অনেক সময় তিনবেলা ঠিকভাবে খাবার যোগাতেও হিমশিম খেতে হয়েছে শিরীন সুলতানাকে।

সরেজমিনে আলতাফ হোসেনের বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ বছর পর আলতাফ জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে ফেরায় আনন্দের জোয়ার বইছে বাড়িজুড়ে। দূর-দুরন্ত থেকে স্বজনরা ছুটে এসেছেন আলতাফের সঙ্গে দেখা করতে। ১৬ বছর পর স্ত্রী সন্তানদের কাছে পেয়ে আনন্দের অশ্রুও ঝরছে আলতাফের। ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতি বিজড়িত স্থানসহ বিভিন্ন স্বজন ও মায়ের কবর দেখতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। তবে সব কিছু কাছে পেয়েও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো বরগুনার আরও দুজন কারাগারে থাকায় পরিপূর্ণ আনন্দ নেই আলতাফ হোসেনের মনে। খুব দ্রুতই তাদেরও মুক্তি মিলবে এমটাই আশা করছেন তিনি।

বাবাকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতে পেরে আলতাফ হেসেনের ছেলে আকিব হোসেন রাফি বলেন, ‘ছোটবেলায় মায়ের কাছে শুনেছি বাবা দূরে কোথাও আছেন। আমাদেরকে কখনোই ঠিকভাবে বলেনি বাবা কারাবন্দি। বুঝতে শেখার পরে জেনেছি বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় বাবা কারাগারে আছে। ছোট বেলায় যখন দেখতাম স্কুলের বিভিন্ন বাচ্চাদেরকে তাদের বাবা এসে নিয়ে যায় কিন্তু আমরা বাবার সেই আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছি। মায়ের সঙ্গে কান্নাকাটি করতাম আমাদের বাবা কেনো আসে না, কখন আসবে তা জানতে চাইতাম। দীর্ঘ বছর পর বাবাকে ছাড়া আমাদের পথ চলটা খুবই কষ্টের ছিল। মা একা আমাদেরকে মানুষ করেছে। আমার বোন বরিশালে কৃষি ডিপ্লোমা এবং আমি বরগুনা সরকারি কলেজে লেখাপড়া করছি। তবে আমাদের বিপদের সময় বরগুনার মানুষ বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

স্বামীর অবর্তমানে পরিবারের হাল ধরা আলতাফ হোসেনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা বলেন, ‘আমার স্বামী জেলে যাওয়ার পর থেকেই আমাদের জীবনযুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর স্বামী থাকতেও স্বামী ছাড়া থাকতে হয়েছে, এ কষ্ট শুধু একজন ভুক্তভোগী নারীই বুঝতে পারবে। আমার মেয়েটাকে ডাক্তারি পড়ানোর ইচ্ছে থাকলেও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জেলে থাকায় তা আর সম্ভব হয়নি। আল্লাহর হুকুম এবং আমার বাবা, মা, ভাই ও দেবরের সহযোগিতায় যতটুকু সম্ভব হয়েছে ছেলেমেয়েদের জন্য চেষ্টা করেছি। এমনও অনেক দিন গেছে টাকা নেই, ঘরে খাবার নেই। খাবারের জন্য মেয়ে কান্না করছে, তখন বলেছি আম্মুকে চুমা দেও দেখবা তোমার খুদা কমে গেছে। একজন পরাজিত মায়ের সন্তানের সামনে এর থেকে কষ্টের জীবন আর কী হতে পারে? ছেলেমেয়ের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারা মায়ের বেঁচে থাকা আর না থাকা সমান কথা।’

তিনি আরও বলেন, ‘যখন ছেলেমেয়েকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম তখন ছেলে তার বাবাকে চিনতে পারতো না। বাবা তার মেয়েকে চিনতে পারতো না। আমরাও এই দেশের জনগণ কিন্তু সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকার কখনো কোনো বিডিআর সদস্যের পরিবারের খোঁজখবর নেয়নি। এছাড়াও যখন আমার শাশুড়ি মারা যায় তখন সরাসরি আমি জেলারের কাছে ফোন করেছিলাম। জানাজায় উপস্থিত থাকতে এবং মৃত মাকে দেখার জন্য অনুমতি চাইলেও তিনি তখন বলেন সম্ভব না। অবশেষে জামিনে আমার স্বামীর মুক্তি মিলেছে। আমাদের একটাই দাবি বিনাদোষে কেনো আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে? কেন আমাদের জীবন ধ্বংস করা হয়েছে? আমরা ওই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিচার চাই। এছাড়াও আমরা পুনরায় চাকরি ফেরত এবং ক্ষতিপূরণসহ বেতন ভাতা পরিশোধ করার দাবি জানাই।’

আলতাফ হোসেন বলেন, ‘বন্দিদশা জীবনের শুরু হলে সন্তানসহ পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমার পরিবারটি আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারব কিনা তার কোনো নিশ্চয়তাই আমাদের ছিল না। সব থেকে বেশি পীড়া দেওয়ার বিষয় হচ্ছে যখন ছেলেমেয়ে কারাগারে আমার সঙ্গে দেখা করতে যেত তখন তারা আমাকে চিনতো না। বাবাকে সন্তানেরা চেনে না এটা যে কত কষ্টের তা বলে বুঝানো যাবে না। এছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে আমি যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তা অপূরণীয়। ‘

তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পূর্বে ধরেই নিয়েছিলাম আর কখনো হয়তো কারাগার থেকে বের হতে পারব না। জেলখানায় একটি কথা প্রচলন আছে ‘হয়তো হাটিয়া নয়তো খাটিয়া’ আমাদের ধারণা ছিল আমাদের খাটিয়াই বের হবে। ৫ আগস্টের পর আমাদের ধারণা পাল্টাতে শুরু হয়। তবে এখনো পরিপূর্ণ আনন্দ প্রকাশ করতে পারছি না। বরগুনার আরও দুজন একত্রে আমরা সঙ্গে কারাগারে বন্দি ছিল। তাদের এখনো জামিন হয়নি, যখন তারাও বের হয়ে আসবে তখন পরিপূর্ণ আনন্দ প্রকাশ করতে পারব।’

পিলখানার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে আলতাফ বলেন, ‘পিলখানা একটি বড় এলাকা, সবকিছু আমরা জানি না। কী ঘটেছিল তা বলতে পারব না। নতুন করে তদন্ত করা হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস এখন সবকিছুরই সঠিক তথ্য বের হয়ে আসবে।’

ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিডিআর সদস্যদের জন্য বিডিআর কল্যাণ পরিষদ নামে একটি গ্রুপ আছে। ওই পরিষদের মাধ্যমে আমাদের চাকরি পুনর্বহাল, আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়াসহ যে সিদ্ধান্ত আসবে আমি সেই সিদ্ধান্তে একমত। ব্যক্তিগতভাবে কোনো চাওয়া নেই। তবে এটুকু বলতে পারি দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে কয়েকবার আমি হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছি। কিন্তু বারবার আপিল করে আমাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে। যেহেতু আমি হত্যা মামলা থেকে নির্দোষ হিসেবে অব্যাহতি পেয়েছি এ কারণে আমার চাকরি ফিরে পাওয়াসহ ক্ষতিপূরণে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।’