ঢাকা ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ
কালীগঞ্জে ঈদ পূর্নমিলনী ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পঞ্চগড়ে ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে ব্যাপক কাযক্রম গ্রহণ রংপুরে তিস্তা নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার যৌথবাহিনীর হাতে রসিক কাউন্সিলর গ্রেফতার লোহাগাড়া সড়ক দূর্ঘটনা ট্রাজেডি: মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হল আরও ৩জন লোহাগাড়ায় থামছেইনা মহাসড়কের মৃত্যুর মিছিল, দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত-৫ আহত ৯ সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রংপুরে ১২০ পরিবারে ঈদ পালন লঞ্চ থেকে আবর্জনা নদীতে ফেললে নেয়া হবে ব্যবস্থা রংপুরে প্রধান ঈদের জামাত সকাল সাড়ে আটটায় বরগুনায় বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন ভাই নিহত
স্বৈরাচারের দোসরদের আওয়ামী চেম্বারে জামাই আদর

রংপুরে বাণিজ্য মেলা, ফের সেই নতুন বোতলে পুরানো মদ

বিশেষ প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৭:১৭:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪
  • / ১১৬ Time View

মদ নয়, বোতল পরিবর্তন হচ্ছে। এক সাগর রক্ত ঢেলে দেশের যে পট-পরিবর্তন, শহীদ আবু সাঈদের কফিন ছুঁয়ে স্বৈরাচার পতনের যে অগ্নিশপথ, অঙ্গীকার, তাকে খোদ আবু সাঈদের জন্মভিটা রংপুরেই বিদ্রুপ করা হচ্ছে। বিদ্রুপের দুঃসাহস দেখাচ্ছে স্বৈরাচার পতনের পক্ষকালের মধ্যে গজিয়ে ওঠা “মেলা লীগ”।

“মেলা লীগ” প্রধান আমিরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে রংপুরের ব্যবসা- বাণিজ্যের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান মেট্রোপলিটন চেম্বার ও রংপুর চেম্বার। দুই চেম্বারের পক্ষ থেকে গোপালগঞ্জের একজন আওয়ামী লীগ নেতাসহ সিলেটের যুবলীগ নেতা ও তার সহকারি-সহচর জাকির, তারেক, আসলাম গংদের একরকম জামাই আদর দেয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি মোহাম্মদ আকবর আলী রংপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট। তার কেবিনেটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু হেনা মোহাম্মদ রেজাউল করিমও আওয়ামী লীগের পরিচিত নেতা। পারিবারিক ব্যবসা মায়া বিড়ি উৎপাদকদের একজন উদ্যোক্তা।

জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর কিছুদিন গা ঢাকা দিলেও সম্প্রতি অতি সন্তর্পনে তারা বের হতে শুরু করেছেন। চেম্বারে অফিসও করছেন। অতঃপর যথারীতি ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেরা লাভবান হওয়ার, তাদের দল আওয়ামী লীগের লোকজনদের পুনর্বাসন ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেয়ায় মনোযোগী হয়েছেন। তারা “মেলা লীগ”কে লালনের মধ্য দিয়ে তাদের মূল দলের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করার প্রয়াস পাচ্ছেন।

শুধু রংপুর নয়, দেশের ৮৪টি চেম্বারের মধ্যে ৫০টিরও বেশি চেম্বারে এখানো আওয়ামী স্বৈরাচারের দোর্দন্ড প্রতাপ রয়ে গেছে। স্বৈরাচার প্রধানের প্রেতাত্মারা ইতোমধ্যে নড়েচড়ে সেসব চেম্বারের চেয়ার আঁকড়ে বসেছে। এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ধাপেই তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ষড়যন্ত্র করে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করার কৌশল নেয়। জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী ঘরানার যশোর চেম্বারের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মিজানুর রহমান খান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আবদুল ওয়াহেদ এবং নাটোর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল মান্নাফ এসব কথা বলেন।

রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট রেজাউল ইসলাম মিলন এবং রংপুর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আকবর আলী তাদের দলীয় মিত্রদের জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশেষ সুযোগ দিতে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাখ-ঢাক করে শিল্প ও বাণিজ্য মেলা করার জন্য পৃথক দু’টি চুক্তি করেন। মেট্রোপলিটন চেম্বারের চুক্তিটি হয় গোপালগঞ্জের কাশালিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক লুৎফর রহমানের পক্ষে তার অনুগত মেলার চটপটি দোকানদার মিজান মোল্লার নামে। আর রংপুর চেম্বারের চুক্তিটি হয় সরাসরি সিলেট যুবলীগের যুগা সম্পাদক কথিত “মেলা লীগ” প্রধান আমির হোসেনের সঙ্গে। জানান রংপুর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আকবর আলী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মোজাম্মেল হক ডাম্বেল। মেট্রো ও রংপুর চেম্বার দু’টোরই আলাদা সচিবালয় রয়েছে। দুই চেম্বারের সচিবই চেম্বারের ব্যবসা বাণিজ্যের কিছুই জানেন না। এই দুই চেম্বারের সবকিছুই দুই প্রেসিডেন্টের পকেটে। কার্যত সচিবরা কেবল স্টোরকিপারের মতো দায়িত্ব পালন করেন।

দুই দশকেরও বেশি আগে দেশে মেলা বাণিজ্যের সূচনা লগ্নের একজন উদ্যোক্তা-আয়োজক রংপুরের স্থানীয় ব্যক্তি এ বিষয়ে জানান, তিনি সম্প্রতি রংপুর চেম্বার এবং রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের সঙ্গে যৌথভাবে মেলা আয়োজনের জন্য পৃথকভাবে দুই চেম্বারের সাথে যোগাযোগ করেন। দুই চেম্বারের সচিবের সঙ্গে কথা বলেন। সচিবরা তাকে বলেছেন, “মেলাতো দেয়া হয়ে গেছে।” কাকে দেয়া হলো এবং চেম্বারের কত টাকার বাণিজ্য হলো তার কিছুই তারা জানেন না বলে তাকে জানান। “সবকিছুই প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত গোপনে হ্যান্ডেল করেন” বলে তাকে জানানো হয়।
রংপুর চেম্বার প্রেসিডেন্ট আকবর আলী অবশ্য জানতে চাইলে খোলাখুলিই বলেছেন, “সিলেটের আমির হোসেনের সঙ্গে তার মেলার ব্যবসার চুক্তি হয়েছে। আমিরের ১০ লাখ টাকা চেম্বারের ফান্ডে জমা দেয়া হয়েছে। আর ১৫ লাখ টাকা তার নিজের পকেটেই রয়ে গেছে।”

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী, আত্মীয় বা গোষ্ঠীকে কোন ধরনের মদদ দান বা তাদের ব্যাপারে সুপারিশ না করার কঠোর বার্তা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু বুঝে বা না বুঝে হোক কিংবা একান্ত নিজ স্বার্থে বিএনপি পরিচয়ধারী দু-একজন রংপুরের বাণিজ্য মেলার অনুমতি প্রাপ্তির ব্যাপারে এই দুই আওয়ামী নেতার পক্ষে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তারা ভুল বুঝিয়ে এই দুইজনের পক্ষে পৃথকভাবে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ পর্যন্ত আদায় করেছেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ব্যাপারটি আগেই জানাজানি হওয়ায়। বিষয়টি জেনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার উভয়ই মেলার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনমনীয় হয়েছেন।

অতঃপর মদ নয়, বোতল পরিবর্তনের কৌশল নেয়া হয়েছে। লক্ষ্য বাস্তবায়নে মুখোশের আড়ালে মুখ লুকানো হচ্ছে। “মেলা লীগ” প্রধান আমিরের স্থলে তদবিরে সামনে দাঁড় করানো হচ্ছে তার সুদীর্ঘ দিনের সহকারী ২-৫% পার্টনার তারেক আহমেদ, জাকির হুসেন এবং আসলাম মাহমুদকে। এদের মুখের পেছনেই রয়েছে আমিরের মুখ।

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার গাজীডেকা গ্রামের মৃত আবদুন নূরের পুত্র তারেক আহমেদ। পিতার এক তেল কোম্পানীতে চাকরির সূত্রে একসময় ঠাকুরগাঁয় থাকা এবং লেখাপড়া। তিনি বিএনপি’র সক্রিয় কোন কর্মীও নন। সবসময় আওয়ামী নেতাকে সঙ্গ দিয়েছেন। অথচ সময়ের প্রয়োজনে ছড়ানো হচ্ছে, তারেক আহমেদ বিএনপি মহাসচিবের নিকটজন। আওয়ামী সমর্থক মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের জাকির হুসেন তার হোম টেক্স-এর ব্যবসার সুবাদে আমিরের মেলা ব্যবসায় যুক্ত হন। ঢাকা রুহিতপুরের জুতা ব্যবসায়ী আসলাম মাহমুদও তাই।

সিলেটের আবদুল গাফফার, মঈন খান বাবলু, মেলা ব্যবসায় সংশ্লিষ্টদের প্রায় সকলের পরিচিত বুলবুল আহমেদ, বাশার আহমেদ (চটপটি), কুষ্টিয়ায় মেলা সংগঠক জাহাঙ্গীর আলম বাদশা ও রনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের আবদুল্লাহ আল-মামুন। সিরাজগঞ্জের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমসহ অনেকেই আমিরের সঙ্গে উল্লেখিত তারেক, জাকির ও আসলামের এক এবং অভিন্ন প্লাটফর্মে ব্যবসার কথা জানান। দীর্ঘদিন তাদের একসঙ্গে থেকে ব্যবসায় প্রচারিত সংবাদ, লিফলেট, অসংখ্য ছবি, ইত্যাদিও সেই সাক্ষ্য দেয়। মেলা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য তারা মুদ্রার এপিঠ এবং ওপিঠ।

কুষ্টিয়ায় মেলা সংগঠক জাহাঙ্গীর আলম বাদশা ও রনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের আবদুল্লাহ আল-মামুন। নিজেদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রংপুর চেম্বারের দুইজন অভিজ্ঞ কর্তাব্যক্তি বলেছেন, আওয়ামী আমলের মতো এখনো রংপুর চেম্বারে সভাপতি এবং সিনিয়র সহ-সভাপতিই সর্বময় কর্তৃত্ব ফলান। প্রকৃত পরিচিতি প্রকাশ হওয়ায় তারা রংপুরে এখন বাণিজ্য মেলা ব্যবসায় আমিরকে আড়াল করে তার সহযোগী তারেক, জাকির ও আসলামকে উপস্থাপন করছেন এবং জামাই আদর দিচ্ছেন। সর্বতোভাবে তারা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বর্তমান সরকারের চেতনার বিপরীত মেরুর হয়েও চেম্বারের নেতৃত্বে বহাল থেকে আওয়ামী পুনর্বাসনে তৎপর রয়েছেন।

নওরোজ/এসএইচ

Please Share This Post in Your Social Media

স্বৈরাচারের দোসরদের আওয়ামী চেম্বারে জামাই আদর

রংপুরে বাণিজ্য মেলা, ফের সেই নতুন বোতলে পুরানো মদ

বিশেষ প্রতিনিধি
Update Time : ০৭:১৭:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪

মদ নয়, বোতল পরিবর্তন হচ্ছে। এক সাগর রক্ত ঢেলে দেশের যে পট-পরিবর্তন, শহীদ আবু সাঈদের কফিন ছুঁয়ে স্বৈরাচার পতনের যে অগ্নিশপথ, অঙ্গীকার, তাকে খোদ আবু সাঈদের জন্মভিটা রংপুরেই বিদ্রুপ করা হচ্ছে। বিদ্রুপের দুঃসাহস দেখাচ্ছে স্বৈরাচার পতনের পক্ষকালের মধ্যে গজিয়ে ওঠা “মেলা লীগ”।

“মেলা লীগ” প্রধান আমিরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে রংপুরের ব্যবসা- বাণিজ্যের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান মেট্রোপলিটন চেম্বার ও রংপুর চেম্বার। দুই চেম্বারের পক্ষ থেকে গোপালগঞ্জের একজন আওয়ামী লীগ নেতাসহ সিলেটের যুবলীগ নেতা ও তার সহকারি-সহচর জাকির, তারেক, আসলাম গংদের একরকম জামাই আদর দেয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি মোহাম্মদ আকবর আলী রংপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট। তার কেবিনেটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু হেনা মোহাম্মদ রেজাউল করিমও আওয়ামী লীগের পরিচিত নেতা। পারিবারিক ব্যবসা মায়া বিড়ি উৎপাদকদের একজন উদ্যোক্তা।

জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর কিছুদিন গা ঢাকা দিলেও সম্প্রতি অতি সন্তর্পনে তারা বের হতে শুরু করেছেন। চেম্বারে অফিসও করছেন। অতঃপর যথারীতি ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেরা লাভবান হওয়ার, তাদের দল আওয়ামী লীগের লোকজনদের পুনর্বাসন ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেয়ায় মনোযোগী হয়েছেন। তারা “মেলা লীগ”কে লালনের মধ্য দিয়ে তাদের মূল দলের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করার প্রয়াস পাচ্ছেন।

শুধু রংপুর নয়, দেশের ৮৪টি চেম্বারের মধ্যে ৫০টিরও বেশি চেম্বারে এখানো আওয়ামী স্বৈরাচারের দোর্দন্ড প্রতাপ রয়ে গেছে। স্বৈরাচার প্রধানের প্রেতাত্মারা ইতোমধ্যে নড়েচড়ে সেসব চেম্বারের চেয়ার আঁকড়ে বসেছে। এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ধাপেই তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ষড়যন্ত্র করে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করার কৌশল নেয়। জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী ঘরানার যশোর চেম্বারের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মিজানুর রহমান খান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আবদুল ওয়াহেদ এবং নাটোর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল মান্নাফ এসব কথা বলেন।

রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট রেজাউল ইসলাম মিলন এবং রংপুর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আকবর আলী তাদের দলীয় মিত্রদের জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশেষ সুযোগ দিতে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাখ-ঢাক করে শিল্প ও বাণিজ্য মেলা করার জন্য পৃথক দু’টি চুক্তি করেন। মেট্রোপলিটন চেম্বারের চুক্তিটি হয় গোপালগঞ্জের কাশালিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক লুৎফর রহমানের পক্ষে তার অনুগত মেলার চটপটি দোকানদার মিজান মোল্লার নামে। আর রংপুর চেম্বারের চুক্তিটি হয় সরাসরি সিলেট যুবলীগের যুগা সম্পাদক কথিত “মেলা লীগ” প্রধান আমির হোসেনের সঙ্গে। জানান রংপুর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আকবর আলী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মোজাম্মেল হক ডাম্বেল। মেট্রো ও রংপুর চেম্বার দু’টোরই আলাদা সচিবালয় রয়েছে। দুই চেম্বারের সচিবই চেম্বারের ব্যবসা বাণিজ্যের কিছুই জানেন না। এই দুই চেম্বারের সবকিছুই দুই প্রেসিডেন্টের পকেটে। কার্যত সচিবরা কেবল স্টোরকিপারের মতো দায়িত্ব পালন করেন।

দুই দশকেরও বেশি আগে দেশে মেলা বাণিজ্যের সূচনা লগ্নের একজন উদ্যোক্তা-আয়োজক রংপুরের স্থানীয় ব্যক্তি এ বিষয়ে জানান, তিনি সম্প্রতি রংপুর চেম্বার এবং রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের সঙ্গে যৌথভাবে মেলা আয়োজনের জন্য পৃথকভাবে দুই চেম্বারের সাথে যোগাযোগ করেন। দুই চেম্বারের সচিবের সঙ্গে কথা বলেন। সচিবরা তাকে বলেছেন, “মেলাতো দেয়া হয়ে গেছে।” কাকে দেয়া হলো এবং চেম্বারের কত টাকার বাণিজ্য হলো তার কিছুই তারা জানেন না বলে তাকে জানান। “সবকিছুই প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত গোপনে হ্যান্ডেল করেন” বলে তাকে জানানো হয়।
রংপুর চেম্বার প্রেসিডেন্ট আকবর আলী অবশ্য জানতে চাইলে খোলাখুলিই বলেছেন, “সিলেটের আমির হোসেনের সঙ্গে তার মেলার ব্যবসার চুক্তি হয়েছে। আমিরের ১০ লাখ টাকা চেম্বারের ফান্ডে জমা দেয়া হয়েছে। আর ১৫ লাখ টাকা তার নিজের পকেটেই রয়ে গেছে।”

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী, আত্মীয় বা গোষ্ঠীকে কোন ধরনের মদদ দান বা তাদের ব্যাপারে সুপারিশ না করার কঠোর বার্তা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু বুঝে বা না বুঝে হোক কিংবা একান্ত নিজ স্বার্থে বিএনপি পরিচয়ধারী দু-একজন রংপুরের বাণিজ্য মেলার অনুমতি প্রাপ্তির ব্যাপারে এই দুই আওয়ামী নেতার পক্ষে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তারা ভুল বুঝিয়ে এই দুইজনের পক্ষে পৃথকভাবে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ পর্যন্ত আদায় করেছেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ব্যাপারটি আগেই জানাজানি হওয়ায়। বিষয়টি জেনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার উভয়ই মেলার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনমনীয় হয়েছেন।

অতঃপর মদ নয়, বোতল পরিবর্তনের কৌশল নেয়া হয়েছে। লক্ষ্য বাস্তবায়নে মুখোশের আড়ালে মুখ লুকানো হচ্ছে। “মেলা লীগ” প্রধান আমিরের স্থলে তদবিরে সামনে দাঁড় করানো হচ্ছে তার সুদীর্ঘ দিনের সহকারী ২-৫% পার্টনার তারেক আহমেদ, জাকির হুসেন এবং আসলাম মাহমুদকে। এদের মুখের পেছনেই রয়েছে আমিরের মুখ।

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার গাজীডেকা গ্রামের মৃত আবদুন নূরের পুত্র তারেক আহমেদ। পিতার এক তেল কোম্পানীতে চাকরির সূত্রে একসময় ঠাকুরগাঁয় থাকা এবং লেখাপড়া। তিনি বিএনপি’র সক্রিয় কোন কর্মীও নন। সবসময় আওয়ামী নেতাকে সঙ্গ দিয়েছেন। অথচ সময়ের প্রয়োজনে ছড়ানো হচ্ছে, তারেক আহমেদ বিএনপি মহাসচিবের নিকটজন। আওয়ামী সমর্থক মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের জাকির হুসেন তার হোম টেক্স-এর ব্যবসার সুবাদে আমিরের মেলা ব্যবসায় যুক্ত হন। ঢাকা রুহিতপুরের জুতা ব্যবসায়ী আসলাম মাহমুদও তাই।

সিলেটের আবদুল গাফফার, মঈন খান বাবলু, মেলা ব্যবসায় সংশ্লিষ্টদের প্রায় সকলের পরিচিত বুলবুল আহমেদ, বাশার আহমেদ (চটপটি), কুষ্টিয়ায় মেলা সংগঠক জাহাঙ্গীর আলম বাদশা ও রনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের আবদুল্লাহ আল-মামুন। সিরাজগঞ্জের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমসহ অনেকেই আমিরের সঙ্গে উল্লেখিত তারেক, জাকির ও আসলামের এক এবং অভিন্ন প্লাটফর্মে ব্যবসার কথা জানান। দীর্ঘদিন তাদের একসঙ্গে থেকে ব্যবসায় প্রচারিত সংবাদ, লিফলেট, অসংখ্য ছবি, ইত্যাদিও সেই সাক্ষ্য দেয়। মেলা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য তারা মুদ্রার এপিঠ এবং ওপিঠ।

কুষ্টিয়ায় মেলা সংগঠক জাহাঙ্গীর আলম বাদশা ও রনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের আবদুল্লাহ আল-মামুন। নিজেদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রংপুর চেম্বারের দুইজন অভিজ্ঞ কর্তাব্যক্তি বলেছেন, আওয়ামী আমলের মতো এখনো রংপুর চেম্বারে সভাপতি এবং সিনিয়র সহ-সভাপতিই সর্বময় কর্তৃত্ব ফলান। প্রকৃত পরিচিতি প্রকাশ হওয়ায় তারা রংপুরে এখন বাণিজ্য মেলা ব্যবসায় আমিরকে আড়াল করে তার সহযোগী তারেক, জাকির ও আসলামকে উপস্থাপন করছেন এবং জামাই আদর দিচ্ছেন। সর্বতোভাবে তারা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বর্তমান সরকারের চেতনার বিপরীত মেরুর হয়েও চেম্বারের নেতৃত্বে বহাল থেকে আওয়ামী পুনর্বাসনে তৎপর রয়েছেন।

নওরোজ/এসএইচ