মেয়র তাপস মনগড়া ও অসত্য বক্তব্য দিচ্ছেন : সাঈদ খোকন

- Update Time : ০৫:৩৪:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ মে ২০২৪
- / ১৫৫ Time View
রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস মনগড়া ও অসত্য তথ্য দিচ্ছেন দাবি করে দোষারূপের রাজনীতি পরিহার করতে তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক মেয়র ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।
আজ শনিবার (১৮ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে মিট দ্য প্রেসে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
‘এগিয়ে ছিল দক্ষিণ ঢাকা, স্মৃতির পাতায় ফিরে দেখা’- শীর্ষক এই মিট দ্য প্রেসের আয়োজন করে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন।
পাশাপাশি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসির সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মেয়র থাকাকালীন সময়ে হয়ত আহামরি ট্যাক্স-ভ্যাট আদায় করতে পারিনি। কিন্তু নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে চেষ্টা করেছি। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী জনদুর্ভোগ কমানো ছিল আমার মূল দায়িত্ব। কিন্তু এখন নগর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব আদায় বা সিটি টোলের নামে রিকশা, সিএনজি, সবজি বহনকারী ট্রাক-লরি থেকে চাঁদাবাজি করছে। আমার সময়ে এমনটা ছিল না।’
এর আগে গত বুধবার (১৫ মে) এক অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ২০১৯-এর তুলনায় ২০২৩ সালে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৪২ হাজার কম ছিল।
এ তথ্য মনগড়া উল্লেখ করে সাঈদ খোকন বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। এর মধ্যে ঢাকা শহরে রোগীর সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার ৮১০, আর বাইরে ৪৯ হাজার। অন্যদিকে গত বছর (২০২৩) দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। কেবল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে যত মৃত্যু হয়, তা আগের ২২ বছরে হয়নি।’
সাঈদ খোকন বলেন, ‘গত বছর (২০২৩) দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। এর মধ্যে ঢাকা সিটিতে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন। আর বাকি ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন আক্রান্ত হন ঢাকার বাইরে। এ ছাড়া গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ৯৮০ জন মারা যান। এই হিসেবে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ৫৮ হাজার ১৯৮ জন রোগী বেশি ছিল। অথচ তার (মেয়র তাপস) এমন তথ্য নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।’
ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে ইঙ্গিত করে সাঈদ খোকন বলেন, ‘দুঃখজনক বিষয় হলো দক্ষিণ সিটি কর্তৃপক্ষের এক দায়িত্বশীল ব্যক্তি কয়েকদিন আগে ডেঙ্গু আক্রান্তের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছেন। তিনি (মেয়র তাপস) বলেছেন, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ঢাকা শহরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৪২ হাজারের কম ছিল। পরে তার বক্তব্য যে ভুল ছিল, তা নিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।’
সাঈদ খোকন বলেন, “২০১৯ সালে যখন আমি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে ছিলাম, তখন ডেঙ্গুর সূচনা হয় এবং পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।
“আমার চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না, আমি চেষ্টা করে গেছি, দিন রাত পরিশ্রম করে গেছি, আমার এই হাজার চেষ্টার পরেও আক্রান্তের সংখ্যা সারা দেশে এক লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৫৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে এত আমি অত্যন্ত ব্যথিত ছিলাম।” তখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। এ চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখিনি। ডেঙ্গু আক্রান্ত নগরবাসীকে রেখে পরিবার নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করিনি।’
নগরীর উন্নয়ন তথ্য তুলে ধরে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ খোকন বলেন, ‘মেয়র থাকাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে প্রচুর উন্নয়ন মূলক কাজের জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন। সে বরাদ্দ দিয়ে শহরের ১৯ পার্ক, ১২টি মাঠের অবকাঠামো উন্নয়নসহ ৫০টির বেশি বড় ধরনের উন্নয়নকাজ করেছি।’
২০২৩ সালে ডেঙ্গুর বিস্তারের সময় তাপসের বিদেশ যাওয়া নিয়ে কথা বলেন খোকন। তিনি ২০১৯ সালের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “আমি চেষ্টা না করে কিন্তু বিদেশে চলে যাইনি। আমি জনগণের সঙ্গে ছিলাম। আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, আমি অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেইনি।
“কিন্তু আমি খুব দুঃখ পেলাম, খুব কষ্ট পেলাম এই দুই তিন দিন পূর্বে, বর্তমান যে কর্তৃপক্ষ (মেয়র তাপস), তিনি বললেন, ‘২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৪১ হাজার কম ছিল। আমি কষ্ট পেয়েছি, নগরবাসী হতভম্ভ হয়েছে, নগরবাসী অবাক হয়েছে। আমরা গত বছর দেখেছি, সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখের অধিক ছিল এবং সারা দেশে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৭০৫ জন, এটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র মতে, যা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত।”
এখনও ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হয়নি তার আগেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ মে আক্রান্ত ২ হাজার ৫৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত এবং ৩২ জনের মৃত্যুর কথা তুলে ধরে তাপস বলেন, “এখনও কিন্তু মৌসুম শুরু হয়নি। গতকালকেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর আগে বুধবার দিন তিনজন মারা গেছে। তারাও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।”
সামনে ডেঙ্গুর ভয়ংকর পরিস্থিততি আসছে জানিয়ে সাবেক মেয়র বলেন, “একটা সমস্যা আসতে পারে, সেটাকে আমাদের মোকাবিলা করা প্রয়োজন। আরেক জনের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজের ব্যর্থতাকে ঢাকার চেষ্টা না করে আসুন, সামনে যে একটা ভয়ংকর পরিস্থিততি হতে চলেছে, সেই পরিস্থিতিটাকে মোকাবিলার জন্য আমরা সর্বস্তরের নাগরিক, কর্তৃপক্ষ, আমাদের যাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, সবাই মিলে আগামী দিনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করি। আমরা একে অপরকে দোষারোপ না করি।দোষারোপের রাজনীতি না করে আমরা সবাই মিলে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করি।”
সিটি করপোরেশন ও মেয়র তাপসের প্রতি ইঙ্গিত করে খোকন বলেন, তিনি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, তাকে ডাকলে সহযোগিতা করতে তিনি যেতেও প্রস্তুত।
ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য বলেন, “যেহেতু সরকারের একটা কর্তৃপক্ষ আছে, তারাই নেতৃত্ব দেবে। আমরা তাকে সাহায্য করতে চাই, সহযোগিতা করতে চাই। আমরা একটা সুন্দর ঢাকা নিরাপদ ঢাকা দেখতে চাই। আমার অভিজ্ঞতা আছে, আমাকে কর্তৃপক্ষ (তাপস) যে কোনো সময় ডাকবে আমি চলে যাব।”
জনপ্রতিনিধি হয়ে একে অপরের সমালোচনা করছেন, এতে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে খোকন বলেন, “আমি আমার বক্তব্যে প্রেক্ষাপটটা বর্ণনা করেছি এবং আমি বলেছি আমরা অতীতের দিকে ফিরে যেতে চাই না। সামনে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি হওয়ার আভাস দিচ্ছে বিশ্লেষকরা, সেটাকে মোকাবিলা করার জন্য আমি সবার সঙ্গে কাজ করতে রাজি, কাজ করব।
“আমরা কাদা ছোড়াছুড়ি করতে চাই না। আমরা একই দলের সদস্য, আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করতে চাই। আগামী দিনে যে ভয়াবহতা আসতে পারে সেটা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবেলা করতে চাই।”
একই দলের হওয়ার বর্তমান মেয়রের সরাসরি সমালোচনা না করলেও নাগরিক হিসেবে গত চার বছরের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাজের মূল্যায়ন করবেন কি না- এই প্রশ্নে খোকন বলেন, “এই মূল্যায়নটা আমি আমার পরিবারের সদস্যের সঙ্গে বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় করতে পারি। আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী একজন সদস্য, আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়নের এমপি, আমার কিন্তু পাবলিক স্টেটমেন্টের ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা আছে। সুতরাং এই মূল্যায়নের ভার জনগণের কাছে।”
বর্তমানে যারা আছে তাদের ব্যর্থ মনে করছেন কি না এমন প্রশ্নে জবাব আসে, “সমালোচনা আমি করছি না, কারণ আমার লিমিটেশন রয়েছে।”
সিটি করপোরেশন পরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা আছে কি না এমন প্রশ্নে, খোকন বলেন, “বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে।”
২০১৫ সালের ১৭ মে থেকে ২০২০ সালের ১৬ মে পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ‘সাফল্যের’ ৪১টি তালিকাও তুলে ধরেন খোকন।
সিটি করপোরেশনকে ‘দুর্নীতি মুক্ত করে’ রাজস্ব আদায় ৫১২ কোটি থেকে ১০৩১ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া নিয়ে মেয়র তাপস যে বক্তব্য রেখেছেন, তার সরাসরি জবাব না নিয়ে খোকন বলেন, “আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন সিটি করপোরেশনকে জনকল্যাণমূলক সংস্থা হিসেবে রূপান্তর করেছিলাম। আমি আমার বাবার মত কোন ট্যাক্স না বাড়িয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করেছি। হয়ত রাজস্ব আদায় কম হয়েছে, কিন্তু তার দ্বিগুণ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।
“বর্তমান কর্তৃপক্ষ কবরস্থান ও শ্মশানে শেষকৃত্যের উপরেও অর্থ আদায় করছে, যা আমি বিনামূল্যে করে দিয়েছিলাম। আমি ডিএসসিসিকে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জনকল্যাণকর সংস্থা হিসেবে দেখেছি।”
এখন সিটি টোল নামে ‘চাঁদাবাজি’ হয় দাবি করে খোকন বলেন, ‘এটা বন্ধ হলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কমে যাবে।”
তিনি বলেন, “ব্রয়লার মুরগিটা কিছুদিন আগেও আমার গরিব দুঃখী মানুষ কিনে নিতে পারত। সেই মুরগি ২২৫ থেকে ২৫০ টাকায় চলে গেছে। এটাকে কমানো সম্ভব যদি কাঁচাবাজারগুলোতে আমরা চাঁদাবাজিটা বন্ধ করতে পারি।”
সিটি করপোরেশনের কর্মীরাই এই চাঁদাবাজি করেন অভিযোগ করে খোকন বলেন, “পুলিশ যখন ধরতে যায় তারা একটা কাগজ দেখায় সংশ্লিষ্ট করপোরেশনের, যে তারা বৈধতা নিয়ে চাঁদাবাজি করছেন। অর্থাৎ সিটি টোলের একটা প্রটেকশন তারা পায়।
“আমি বলেছি এই সিটি টোলের নামে যে চাঁদাবাজি, এটা যদি বন্ধ করতে পারা যায়, তাহলে এই স্বল্প আয়ের মানুষগুলো এই কাঁচাবাজারের জিনিস, শাকসবজি থেকে শুরু করে ব্রয়লার মুরগি, তেলাপিয়া মাছ, পাঙাস মাছের দাম কমানো সম্ভব।”
নিজের নির্বাচনি এলাকার কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্য খোকন বলেন, “আমার এলাকায় ইতোমধ্যে আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি, ‘আপনি এই চাঁদাবাজিটা বন্ধ করুন। সিটি টোলের নামে এই চাঁদাবাজি করতে দিতে চাই না’।”