তার ছাড়াই চার্জ হবে ফোন, নিউজিল্যান্ডে বসে বাংলাদেশি যুবকের গবেষণা
- Update Time : ০৩:১৮:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৪ Time View
ছেলেবেলা থেকেই ইলেকট্রনিকসের প্রতি টান। চট্টগ্রামের সেন্ট প্ল্যাসিডস উচ্চবিদ্যালয় কিংবা হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে যখন ছাত্র ছিলেন, তখন গণিত ও বিজ্ঞান একটু বাড়তি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন সাইদুল আলম চৌধুরী। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলে ভর্তির পর ঝোঁকটা আরও বাড়ে।
সেই সাইদুল আলমই চুয়েটের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়া, আর বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে গবেষণা করছেন।
এখন তাঁর কাজের বিষয় ‘স্মার্ট পাওয়ার বক্স’। এটি এমন এক বাক্স, যার মধ্যে মুঠোফোন, ইয়ারবাড, স্মার্ট ওয়াচসহ নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্র যেভাবেই রাখা হোক, স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হয়ে যাবে। কোনো নির্দিষ্ট সকেট মেলানোর ‘টেনশন’ নেই, তার বয়ে নেওয়ার ঝামেলা নেই। বলা যায়, একধরনের ‘ওয়াই–ফাই চার্জিং’ পদ্ধতি।
বাক্সের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা রেজোন্যান্ট কয়েলগুলো ত্রিমাত্রিক জায়গায় অর্থাৎ বাক্সের ভেতরের পুরো জায়গায়ই সমানভাবে ম্যাগনেটিক ফিল্ড (চৌম্বক ক্ষেত্র) তৈরি করে, আর যন্ত্রগুলো তার প্রয়োজনমতো শক্তি টেনে নেয়। অতিরিক্ত তাপ বা ওভারলোড, সবই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এই বাক্সের ভেতরে।
দেশেই হয়তো চাকরি করতে পারতেন সাইদুল আলম। পারিবারিক নিরাপত্তাও ছিল। তবে মাথায় ঘুরত একটি প্রশ্ন, কেন যন্ত্রগুলো এমনভাবে কাজ করে? অন্যভাবে কি করা যায়? এই প্রশ্নই তাঁকে ঠেলে দেয় আন্তর্জাতিক গবেষণার মাঠে।
২০১৯ সালের শুরুর দিকের কথা। বহু ই–মেইল, কোটেশন, প্রত্যাখ্যান ও অপেক্ষার পর অবশেষে মেলে সুযোগ। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি শীর্ষ গবেষণাগারে পিএইচডি করার অনুমতি পান। দেশ ছাড়ার মুহূর্তে মা–বাবা বলেছিলেন, ‘চেষ্টা করে যাস।’ নতুন ভাষা, নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, সব মিলিয়ে শুরুটা কঠিনই ছিল। কিন্তু গবেষণাগারে পা রাখতেই সাইদুল বুঝতে পেরেছিলেন, এই সেই জায়গা, যেখানে তিনি পৌঁছাতে চেয়েছিলেন, যেখানে মিলতে পারে তাঁর মাথায় খেলে যাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর।
কোরিয়ায় কাটানো চার বছর সাইদুলের জীবন বদলে দেয়। দেখতে পান, ‘ওয়্যারলেস পাওয়ার ট্রান্সফার’ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের খুব সহজ অথচ প্রযুক্তিগতভাবে জটিল একটি বিষয়। আর এই জায়গায়ই হয়ে ওঠে তাঁর গবেষণার বিষয়।
কীভাবে চার্জিং আরও সুবিধাজনক করা যায়? যন্ত্রটি নড়াচড়া করলেও কীভাবে ‘পাওয়ার লস’ কমানো যায়? কীভাবে চার্জারের রেজোন্যান্স নিজে থেকেই মিলে গিয়ে সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সাইদুল উদ্ভাবন করেন নতুন ধরনের রিসিভার আর্কিটেকচার ও স্বয়ংক্রিয় টিউনিং অ্যালগরিদম। তাঁর এই কাজ শুধু আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিতই হয়নি, দুটি মার্কিন পেটেন্টের ভিত্তিও তৈরি করেছে। পিএইচডি শেষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন ‘এক্সিলেন্ট রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড’। কোরিয়ায় বিদেশি গবেষকদের মধ্যে এই সম্মাননা বিরলই বলতে হয়।
এই অর্জনের সুবাদেই নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব অকল্যান্ডে জায়গা করে নেন সাইদুল। বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে ওপরের দিকে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনোভেটিভ ওয়্যারলেস পাওয়ার রিসার্চ’ গ্রুপটি অনেক বছর ধরেই ‘কন্ট্যাক্টলেস চার্জিং’ নিয়ে কাজ করছে, বলা যায় সারা বিশ্বকেই পথ দেখাচ্ছে। সেখানে পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলো হিসেবে যোগ দেন সাইদুল আলম। উদ্ভাবন করেন ‘স্মার্ট পাওয়ার বক্স’। তাঁর এ গবেষণায় অনুদান দিয়েছে ‘ওয়ারউইক অ্যান্ড জুডি স্মিথ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ডোমেন্ট ফান্ড’। সুপারভাইজার অধ্যাপক আইগু প্যাট্রিক হু’র সহযোগিতা ও গবেষণাগারের দলগত কাজই সাহস জুগিয়েছে, জানালেন তিনি।
সাইদুল বলেন, ‘আমার ইচ্ছা ছিল এমন কিছু উদ্ভাবন, প্রতিদিন যা ব্যবহার করবে মানুষ। যে প্রযুক্তি চোখে ধরা পড়বে না, কিন্তু সুবিধা এনে দেবে। গবেষণাগারে স্মার্ট পাওয়ার বক্সের প্রোটোটাইপ অর্থাৎ প্রাথমিক একটি মডেল আমরা বানিয়েছি। কার্যকারিতাও পরীক্ষা করেছি। ফলাফল আশানুরূপ। আমার স্বপ্ন, একদিন ঘরের আসবাবের মতো সাধারণ হয়ে যাবে এই স্মার্ট পাওয়ার বক্স।’
বিদেশে বসে কাজ করলেও সাইদুলের চিন্তায় বাংলাদেশ থাকে সব সময়। ভবিষ্যতে দেশে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) ডিভাইস, স্মার্ট হাসপাতাল ও স্মার্ট হোম নিয়ে কাজ করতে চান। সাশ্রয়ী প্রযুক্তি বানিয়ে দেশেই কিছু করার তাঁর প্রবল ইচ্ছা।
চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে তারহীন প্রযুক্তি হবে ভবিষ্যতের এক নতুন অধ্যায়। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চান সাইদুল আলম।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
জনপ্রিয়







































































































































































































