ঢাকা ০১:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ
বাকৃবিতে কম্বাইন্ড ডিগ্রি আন্দোলনে বহিরাগতদের হামলা, আহত ১৫ নেসকোতে প্রকৌশলী রোকনের গ্রেপ্তারের দাবিতে লংমার্চ ঘোষণা মদ বিক্রি না করায় টঙ্গীর জাবান হোটেলে ভাংচুরের অভিযোগ ইলিয়াস আলীসহ গুম হওয়া সবাইকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি স্বজনদের গুলিস্তানে চোরাই মোবাইল চক্রের দশ সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার: উদ্ধার ১০৩টি ফোন মুনিয়া হত্যাকাণ্ডে আফ্রিদির সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখবে সিআইডি : রাষ্ট্রপক্ষ পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল ১২ কোটি টাকা নিজের জুস পান করে নিজেই বেহুঁশ অজ্ঞান পার্টির সদস্য ! জামাতের গায়ে ছুঁচোর গন্ধ বনাম নির্বাচন বানচালের নতুন তত্ত্ব “পি আর”  ফরিদপুরের গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী চুন্নু লাগামহীন দুর্নীতির পরও বহাল তবিয়তে

টঙ্গীতে তামীরুল মিল্লাতে আন্দোলনের জের: শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রতিশোধের অভিযোগ।

মোঃ হানিফ হোসেন,টঙ্গী প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৯:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫
  • / ৬৮ Time View
দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা টঙ্গীতে চলছে তীব্র অস্থিরতা। প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এ প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক শিক্ষার্থীরা হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেলেও দীর্ঘদিন ধরে হল সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। গত ৩০ জুলাই রাত ১১টার দিকে ১৩ দফা দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীরা হোস্টেলের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে আন্দোলন শুরু করে। প্রথমে ব্লক শিক্ষকরা সমঝোতার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে হল সুপার মাওলানা নুরুল হক এবং উপাধ্যক্ষ মাওলানা মিজানুর রহমান শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে এলে তারাও ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনিক ভবনে চলে যান। টানা চার ঘণ্টা উত্তেজনার পর ছাত্র সংসদের জিএস সাইদুল ইসলাম এবং এজিএস মঈনুল ইসলামের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে। তবে পরদিন সকাল ১০টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষার্থীরা পুনরায় আন্দোলনে বসলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. হিফযুর রহমান ১৩টি দাবির মধ্যে ১২টি দাবি মেনে নেন। পরবর্তীতে এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (টাকসু) সন্তুষ্ট নয়। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা মানে প্রহসন। টাকসুর মতে, যদি গভর্নিং বডি কিংবা স্বতন্ত্রভাবে কমিটি গঠন করা হতো তবে তা অধিক গ্রহণযোগ্য হতো। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনের পর থেকে তাদের ওপর ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কারো ক্ষেত্রে টিসি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কাউকে বাইরে ডেকে শিক্ষক কর্তৃক মানসিক চাপ প্রয়োগ করে আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্ন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা মনে করছেন, আন্দোলনের ইসু নিয়ে টেকনিক্যালি কারো কারো সিট কেটে দেওয়া হচ্ছে। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় এক বিষয়ের বেশি ফেল করলে সিট কেটে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও একাধিক শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পাস করেও কোনো উল্লেখযোগ্য কারণ ছাড়া সিট হারিয়েছেন। এবং এক বিষয় ফেল করা শরীয়ত উল্লাহ হলের প্রায় ১০ এর অধিক শিক্ষার্থীর বিভিন্ন কারণ সামনে নিয়ে এসে সিট কেটে দেওয়া হয়েছে।  শরীয়ত উল্লাহ হলের ১১২ নম্বর রুমের আটজন শিক্ষার্থীর সিট কেটে দেওয়া হয়, যদিও তারা সবাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছিল। জানা যায়, গত ২৭ জুলাই তারা হোস্টেলের জুতার বক্সের রং অনুমতি ব্যতীত নিজেদের রুমের জানালায় লাগান। পরবর্তীতে হোস্টেল সুপার তাদের ডেকে শাসন করেন এবং হলে বিভিন্ন সময় যে আন্দোলন হয় তার নেতৃত্বদাতাদের নাম প্রকাশের জন্য চাপ দেন। এবং তাদের বলা হয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নাম বললে তাদের অপরাধ মাফ করে দিবেন।
 এমনকি নাম জানাতে পারলে পুরস্কার দেওয়ার প্রলোভনও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ২৮ জুলাই ফজরের পর সবার সামনে তাদের অপরাধের কারণ জানিয়ে ২০০ টাকা করে জরিমানা করা হয় এবং এক শিক্ষার্থীর অভিভাবককে বিষয়টি জানানো হয়। পরবর্তীতে এরকম কাজ আর কখনো করবেন না এমন অঙ্গীকারনামা নিয়ে ব্লক শিক্ষক ক্বারী তানভীরের কাছে গেলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে ৩০ জুলাই শরীয়ত উল্লাহ হল ও তিতুমীর হলের শিক্ষার্থীরা হলের বিভিন্ন সমস্যার সংস্কারের ১৩ দফা দাবি নিয়ে  আন্দোলন করেন। তাদের যেই অপরাধ ছিল জানালায় রং লাগানো, সেটি নিয়ে একমাস কোনো শিক্ষক কিছু বলেননি। তবে হঠাৎ ২৭ আগস্ট মসজিদে হোস্টেল সুপার ঘোষণা দেন তাদের সিট কেটে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানান, কেন সিট কাটা হলো তা তারা জানেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, হলের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এভাবে গণহারে সিট কেটে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো হচ্ছে যেন ভবিষ্যতে আর কখনো ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে না পারে। তাছাড়া অনেকে বলছেন হল থেকে সিট কাটা শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বেশিরভাগ যাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কোয়ালিটি রয়েছে এবং পুরাতন শিক্ষার্থীদের সিট কেটে দেয়া হয়েছে। যেনো  আন্দোলন না করতে পারে শিক্ষার্থীরা।
 এছাড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, ব্লক শিক্ষকদের পক্ষপাতমূলক ও প্রতিশোধমূলক আচরণ রয়েছে। বিশেষ করে ক্বারী তানভীরের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা অসংখ্য অভিযোগ তুলেছেন। তারা জানান, তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীন, প্রায়ই কটাক্ষ করেন এবং ইসলামি আন্দোলনবিরোধী বক্তব্য দেন। হলে সাংগঠনিক দাওয়াতি কার্যক্রমেও বিভিন্নভাবে বাধা দেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, আন্দোলনের সময় তার অপসারণের দাবি জানানো হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী ফেল করলেও সিট কাটার ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, এক বিষয়ে ফেল করায় শরীয়ত উল্লাহ হলের ৩০২ থেকে ৩১৭ নম্বর রুমের  নয়জনের সিট কেটে দেওয়া হয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী এক বিষয়ে ফেল করলে সিট কাটার কথা নয়। তাদের দাবি, আন্দোলন করায় শিক্ষকদের প্রতিশোধমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ আন্দোলনে না জড়ায়। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, ব্লক শিক্ষক আব্দুল গফুরের আপন ভাগিনা দুই বিষয়ে ফেল করেও সিট হারাননি। শরীয়ত উল্লাহ হলের দাখিল শ্রেণির শিক্ষার্থী সিফাত পরীক্ষায় ৪.৩৩ জিপিএ পেলেও তার সিট কেটে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অনুরোধে সিট ফেরত দেওয়া হলেও তাকে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। শুধু শরীয়ত উল্লাহ হল নয়, শহীদ তিতুমীর হলেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীরা ভয়ে কোন তথ্য দিতে রাজি হননি। একাধিক শিক্ষার্থী জানান হল থেকে তো সিট কেটেছেন অনেকের তবে ছোটখাটো ইসুকে কেন্দ্র করে টিসিও দিয়ে দিতে পারে এজন্য তারা মুখ খুলতে রাজি নয় । অভিযোগ,  আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অফিসে ডেকে এনে আন্দোলনের নেতৃত্বদাতাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার ঘটনাও ঘটেছে। মাদ্রাসার রসায়ন বিভাগের প্রভাষক আতিকুর রহমান এবং দাখিল দশম (ক) শাখার শ্রেণি শিক্ষক শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষক আতিকুর রহমান দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ২৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাতটায় ডেকে মাদ্রাসা শিক্ষক মিলনায়তনে রাত দশটা পর্যন্ত বসিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে তাকে জানানো হয় যেন ২৬ আগস্ট দেখা করা হয়। ওইদিন বিকাল ৪টায় ধারাবাহিকভাবে দুই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কেন আন্দোলন করা হয়েছে, আন্দোলন করার সাহস কে দিয়েছে, আন্দোলনে কে কী স্লোগান দিয়েছে এবং কারা নেতৃত্ব দিয়েছে— এমন প্রশ্ন করা হয়।
শিক্ষার্থীরা মনে করছেন যুক্তিক আন্দোলনের পর এমন জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অতীতের ইসুকে সামনে নিয়ে এসে বড় করে দেখে সিট কেটে দেওয়া প্রতিবাদের ভাষাকে রুদ্ধ করা। শিক্ষার্থীরা জানান প্রতিষ্ঠান প্রধান আন্দোলনের ১২ দফা দাবি মেনে নিয়েছেন যৌক্তিকতা  থাকায়। তবে কেন পরবর্তী সময়ে এভাবে জিজ্ঞাসাবাদ মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে তা অজানা। এর আগে বোর্ড পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আন্দোলনের জের ধরে শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র রেজিষ্ট্রেশন কার্ড জব্দ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের আরো অভিযোগ করে বলেন, আন্দোলনের জের ধরে যদি এভাবে মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয় তাহলে আগামী দিনে শিক্ষার্থীরা কীভাবে যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করবেন।
এছাড়া ২৬ আগস্ট আলিম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবি নিয়ে অনলাইনে ক্যাম্পেইন চালান। আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানানোর আগেই শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা জানান, রসায়ন বিভাগের প্রভাষক আতিকুর রহমান হুমকি দেন, কেউ স্লোগান দিলে তাকে টিসি দেওয়া হবে। উচ্চতর গণিতের প্রভাষক মাজহারুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের গ্রুপের এডমিনদের নাম-নম্বর দাবি করেন। তারা রাজি না হলে হুমকি দেন, কয়েকজনকে মারধর করলে বাকিরা নাম বলে দেবে। শিক্ষার্থীরা বলেন, এভাবে তাদের মুখ চেপে ধরা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, যৌক্তিক আন্দোলন সমাধান না করে এভাবে দমন-নিপীড়ন করা কিংবা মুখ চেপে ধরা একটি সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা কল্যাণকর? অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে খেলার মাঠ সংস্কার না করা, ময়লার স্তুপ রেখে দেওয়া এবং কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে।
 এ বিষয়ে তা’মীরুল মিল্লাত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএস সাইদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা অন্যায়। যদি কারও সিট কেটে দেওয়া হয়, সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া, তাহলে আমরা ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়াবো এবং বিষয়টি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে যুক্তিসঙ্গত দাবিতে আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ করা শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক নয়।
 হোস্টেল সুপার মাওলানা নুরুল হকের কাছে গণহারে সিট কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আন্দোলনের কোনো বিষয় নেই, সিট কাটা হয়েছে নানান অনিয়ম ও ফেল করার কারণে। আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোবাইলে বলার বিষয় নয় এগুলো।
 মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. হিফজুর রহমান বলেন, কারো সিট কাটা হয়নি। যারা চলে গেছে তাদের পরীক্ষা শেষ তাই তারা চলে গেছে। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সময় ভাঙচুর করেছে সে বিষয়ে তো কিছু বলা হয়নি। যারা অনিয়ম করে নামাজ পড়ে না তাদের সিট কাটা হবেই। হল সংস্কারের আন্দোলন করায় মানসিক চাপ প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এভাবে আমি কথা বলতে পারব না, সরাসরি এসে কথা বল। মাদ্রাসার তদারকি কমিটির সদস্য ও গাজীপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের কাছে আন্দোলন দমন-নিপীড়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো মোবাইলে বলার বিষয় নয়, এ নিয়ে মহানগর জামায়াতে ইসলামীর অফিসে সরাসরি এসে কথা বলেন আগামী রবি সোমবারে।

Please Share This Post in Your Social Media

টঙ্গীতে তামীরুল মিল্লাতে আন্দোলনের জের: শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রতিশোধের অভিযোগ।

মোঃ হানিফ হোসেন,টঙ্গী প্রতিনিধি
Update Time : ০৯:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫
দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা টঙ্গীতে চলছে তীব্র অস্থিরতা। প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এ প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক শিক্ষার্থীরা হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেলেও দীর্ঘদিন ধরে হল সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। গত ৩০ জুলাই রাত ১১টার দিকে ১৩ দফা দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীরা হোস্টেলের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে আন্দোলন শুরু করে। প্রথমে ব্লক শিক্ষকরা সমঝোতার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে হল সুপার মাওলানা নুরুল হক এবং উপাধ্যক্ষ মাওলানা মিজানুর রহমান শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে এলে তারাও ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনিক ভবনে চলে যান। টানা চার ঘণ্টা উত্তেজনার পর ছাত্র সংসদের জিএস সাইদুল ইসলাম এবং এজিএস মঈনুল ইসলামের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে। তবে পরদিন সকাল ১০টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষার্থীরা পুনরায় আন্দোলনে বসলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. হিফযুর রহমান ১৩টি দাবির মধ্যে ১২টি দাবি মেনে নেন। পরবর্তীতে এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (টাকসু) সন্তুষ্ট নয়। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা মানে প্রহসন। টাকসুর মতে, যদি গভর্নিং বডি কিংবা স্বতন্ত্রভাবে কমিটি গঠন করা হতো তবে তা অধিক গ্রহণযোগ্য হতো। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনের পর থেকে তাদের ওপর ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কারো ক্ষেত্রে টিসি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কাউকে বাইরে ডেকে শিক্ষক কর্তৃক মানসিক চাপ প্রয়োগ করে আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্ন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা মনে করছেন, আন্দোলনের ইসু নিয়ে টেকনিক্যালি কারো কারো সিট কেটে দেওয়া হচ্ছে। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় এক বিষয়ের বেশি ফেল করলে সিট কেটে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও একাধিক শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পাস করেও কোনো উল্লেখযোগ্য কারণ ছাড়া সিট হারিয়েছেন। এবং এক বিষয় ফেল করা শরীয়ত উল্লাহ হলের প্রায় ১০ এর অধিক শিক্ষার্থীর বিভিন্ন কারণ সামনে নিয়ে এসে সিট কেটে দেওয়া হয়েছে।  শরীয়ত উল্লাহ হলের ১১২ নম্বর রুমের আটজন শিক্ষার্থীর সিট কেটে দেওয়া হয়, যদিও তারা সবাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছিল। জানা যায়, গত ২৭ জুলাই তারা হোস্টেলের জুতার বক্সের রং অনুমতি ব্যতীত নিজেদের রুমের জানালায় লাগান। পরবর্তীতে হোস্টেল সুপার তাদের ডেকে শাসন করেন এবং হলে বিভিন্ন সময় যে আন্দোলন হয় তার নেতৃত্বদাতাদের নাম প্রকাশের জন্য চাপ দেন। এবং তাদের বলা হয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নাম বললে তাদের অপরাধ মাফ করে দিবেন।
 এমনকি নাম জানাতে পারলে পুরস্কার দেওয়ার প্রলোভনও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ২৮ জুলাই ফজরের পর সবার সামনে তাদের অপরাধের কারণ জানিয়ে ২০০ টাকা করে জরিমানা করা হয় এবং এক শিক্ষার্থীর অভিভাবককে বিষয়টি জানানো হয়। পরবর্তীতে এরকম কাজ আর কখনো করবেন না এমন অঙ্গীকারনামা নিয়ে ব্লক শিক্ষক ক্বারী তানভীরের কাছে গেলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে ৩০ জুলাই শরীয়ত উল্লাহ হল ও তিতুমীর হলের শিক্ষার্থীরা হলের বিভিন্ন সমস্যার সংস্কারের ১৩ দফা দাবি নিয়ে  আন্দোলন করেন। তাদের যেই অপরাধ ছিল জানালায় রং লাগানো, সেটি নিয়ে একমাস কোনো শিক্ষক কিছু বলেননি। তবে হঠাৎ ২৭ আগস্ট মসজিদে হোস্টেল সুপার ঘোষণা দেন তাদের সিট কেটে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানান, কেন সিট কাটা হলো তা তারা জানেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, হলের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এভাবে গণহারে সিট কেটে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো হচ্ছে যেন ভবিষ্যতে আর কখনো ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে না পারে। তাছাড়া অনেকে বলছেন হল থেকে সিট কাটা শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বেশিরভাগ যাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কোয়ালিটি রয়েছে এবং পুরাতন শিক্ষার্থীদের সিট কেটে দেয়া হয়েছে। যেনো  আন্দোলন না করতে পারে শিক্ষার্থীরা।
 এছাড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, ব্লক শিক্ষকদের পক্ষপাতমূলক ও প্রতিশোধমূলক আচরণ রয়েছে। বিশেষ করে ক্বারী তানভীরের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা অসংখ্য অভিযোগ তুলেছেন। তারা জানান, তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীন, প্রায়ই কটাক্ষ করেন এবং ইসলামি আন্দোলনবিরোধী বক্তব্য দেন। হলে সাংগঠনিক দাওয়াতি কার্যক্রমেও বিভিন্নভাবে বাধা দেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, আন্দোলনের সময় তার অপসারণের দাবি জানানো হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী ফেল করলেও সিট কাটার ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, এক বিষয়ে ফেল করায় শরীয়ত উল্লাহ হলের ৩০২ থেকে ৩১৭ নম্বর রুমের  নয়জনের সিট কেটে দেওয়া হয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী এক বিষয়ে ফেল করলে সিট কাটার কথা নয়। তাদের দাবি, আন্দোলন করায় শিক্ষকদের প্রতিশোধমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ আন্দোলনে না জড়ায়। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, ব্লক শিক্ষক আব্দুল গফুরের আপন ভাগিনা দুই বিষয়ে ফেল করেও সিট হারাননি। শরীয়ত উল্লাহ হলের দাখিল শ্রেণির শিক্ষার্থী সিফাত পরীক্ষায় ৪.৩৩ জিপিএ পেলেও তার সিট কেটে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অনুরোধে সিট ফেরত দেওয়া হলেও তাকে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। শুধু শরীয়ত উল্লাহ হল নয়, শহীদ তিতুমীর হলেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীরা ভয়ে কোন তথ্য দিতে রাজি হননি। একাধিক শিক্ষার্থী জানান হল থেকে তো সিট কেটেছেন অনেকের তবে ছোটখাটো ইসুকে কেন্দ্র করে টিসিও দিয়ে দিতে পারে এজন্য তারা মুখ খুলতে রাজি নয় । অভিযোগ,  আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অফিসে ডেকে এনে আন্দোলনের নেতৃত্বদাতাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার ঘটনাও ঘটেছে। মাদ্রাসার রসায়ন বিভাগের প্রভাষক আতিকুর রহমান এবং দাখিল দশম (ক) শাখার শ্রেণি শিক্ষক শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষক আতিকুর রহমান দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ২৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাতটায় ডেকে মাদ্রাসা শিক্ষক মিলনায়তনে রাত দশটা পর্যন্ত বসিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে তাকে জানানো হয় যেন ২৬ আগস্ট দেখা করা হয়। ওইদিন বিকাল ৪টায় ধারাবাহিকভাবে দুই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কেন আন্দোলন করা হয়েছে, আন্দোলন করার সাহস কে দিয়েছে, আন্দোলনে কে কী স্লোগান দিয়েছে এবং কারা নেতৃত্ব দিয়েছে— এমন প্রশ্ন করা হয়।
শিক্ষার্থীরা মনে করছেন যুক্তিক আন্দোলনের পর এমন জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অতীতের ইসুকে সামনে নিয়ে এসে বড় করে দেখে সিট কেটে দেওয়া প্রতিবাদের ভাষাকে রুদ্ধ করা। শিক্ষার্থীরা জানান প্রতিষ্ঠান প্রধান আন্দোলনের ১২ দফা দাবি মেনে নিয়েছেন যৌক্তিকতা  থাকায়। তবে কেন পরবর্তী সময়ে এভাবে জিজ্ঞাসাবাদ মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে তা অজানা। এর আগে বোর্ড পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আন্দোলনের জের ধরে শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র রেজিষ্ট্রেশন কার্ড জব্দ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের আরো অভিযোগ করে বলেন, আন্দোলনের জের ধরে যদি এভাবে মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয় তাহলে আগামী দিনে শিক্ষার্থীরা কীভাবে যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করবেন।
এছাড়া ২৬ আগস্ট আলিম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবি নিয়ে অনলাইনে ক্যাম্পেইন চালান। আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানানোর আগেই শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা জানান, রসায়ন বিভাগের প্রভাষক আতিকুর রহমান হুমকি দেন, কেউ স্লোগান দিলে তাকে টিসি দেওয়া হবে। উচ্চতর গণিতের প্রভাষক মাজহারুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের গ্রুপের এডমিনদের নাম-নম্বর দাবি করেন। তারা রাজি না হলে হুমকি দেন, কয়েকজনকে মারধর করলে বাকিরা নাম বলে দেবে। শিক্ষার্থীরা বলেন, এভাবে তাদের মুখ চেপে ধরা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, যৌক্তিক আন্দোলন সমাধান না করে এভাবে দমন-নিপীড়ন করা কিংবা মুখ চেপে ধরা একটি সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা কল্যাণকর? অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে খেলার মাঠ সংস্কার না করা, ময়লার স্তুপ রেখে দেওয়া এবং কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে।
 এ বিষয়ে তা’মীরুল মিল্লাত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএস সাইদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা অন্যায়। যদি কারও সিট কেটে দেওয়া হয়, সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া, তাহলে আমরা ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়াবো এবং বিষয়টি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে যুক্তিসঙ্গত দাবিতে আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ করা শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক নয়।
 হোস্টেল সুপার মাওলানা নুরুল হকের কাছে গণহারে সিট কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আন্দোলনের কোনো বিষয় নেই, সিট কাটা হয়েছে নানান অনিয়ম ও ফেল করার কারণে। আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোবাইলে বলার বিষয় নয় এগুলো।
 মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. হিফজুর রহমান বলেন, কারো সিট কাটা হয়নি। যারা চলে গেছে তাদের পরীক্ষা শেষ তাই তারা চলে গেছে। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সময় ভাঙচুর করেছে সে বিষয়ে তো কিছু বলা হয়নি। যারা অনিয়ম করে নামাজ পড়ে না তাদের সিট কাটা হবেই। হল সংস্কারের আন্দোলন করায় মানসিক চাপ প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এভাবে আমি কথা বলতে পারব না, সরাসরি এসে কথা বল। মাদ্রাসার তদারকি কমিটির সদস্য ও গাজীপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের কাছে আন্দোলন দমন-নিপীড়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো মোবাইলে বলার বিষয় নয়, এ নিয়ে মহানগর জামায়াতে ইসলামীর অফিসে সরাসরি এসে কথা বলেন আগামী রবি সোমবারে।