ঢাকা ০৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ
ইলিয়াস আলীসহ গুম হওয়া সবাইকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি স্বজনদের গুলিস্তানে চোরাই মোবাইল চক্রের দশ সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার: উদ্ধার ১০৩টি ফোন মুনিয়া হত্যাকাণ্ডে আফ্রিদির সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখবে সিআইডি : রাষ্ট্রপক্ষ পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল ১২ কোটি টাকা নিজের জুস পান করে নিজেই বেহুঁশ অজ্ঞান পার্টির সদস্য ! জামাতের গায়ে ছুঁচোর গন্ধ বনাম নির্বাচন বানচালের নতুন তত্ত্ব “পি আর”  ফরিদপুরের গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী চুন্নু লাগামহীন দুর্নীতির পরও বহাল তবিয়তে হাত বেঁধে-মুখ ঢেকে নৌকায় চাপিয়ে জোর করে সাগরে ফেলা হয় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ দেশকে বেআইনি মবের শাসন থেকে বেরিয়ে আসতে হবেঃ তারেক রহমান

জামাতের গায়ে ছুঁচোর গন্ধ বনাম নির্বাচন বানচালের নতুন তত্ত্ব “পি আর” 

রাজনীতি ডেস্ক
  • Update Time : ০৯:৩৫:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১৬ Time View

ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী সবসময়ই এক বিতর্কিত অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান, পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা, স্বাধীনতার পরে নিষিদ্ধ হওয়া, পরবর্তীতে সামরিক শাসকের ছত্রছায়ায় পুনর্বাসন, কখনো বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র আবার কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত-সব মিলিয়ে জামাতকে প্রায়শই “গিরগিটির মতো রঙ বদলানো রাজনৈতিক শক্তি” বলা হয়।

বিশেষ করে বিএনপির আন্দোলনের সময় বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে তারা কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো গোপনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও নির্বাচনকে ঘিরে জামাতের দ্বিমুখী ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে একটি তত্ত্ব-“পি আর সিস্টেম” – যা জামাতকে বাঁচিয়ে রাখার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামাতের ভূমিকা: ইতিহাসের কালো অধ্যায়

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামাতের ভূমিকা আজও জাতির জন্য এক কলঙ্কিত অধ্যায়। রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন এবং পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় গণহত্যা পরিচালনা-এসব কান্ডের দায় জামাত কখনো অস্বীকার করতে পারেনি। সেই বিশ্বাসঘাতকতার দায়েই স্বাধীনতার পরপরই জামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগে তারা আবার রাজনৈতিক মাঠে ফিরে আসে। আওয়ামী লীগ অভিযোগ তোলে-“জামাতকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল বিএনপি।” অভিযোগটি একপাক্ষিক হলেও এর বোঝা দীর্ঘদিন বিএনপিকেই বহন করতে হয়েছে। এখান থেকেই শুরু হয় জামাতের রাজনৈতিক কৌশল ও সুবিধাবাদী রাজনীতির নতুন খেলা ।

আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৮০’র দশকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতৃত্ব দিলেও ১৯৮৬ সালে হঠাৎ করেই জামাত নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়। এতে গণআন্দোলনের ভাঙন ঘটে। তখন জামাত নেতাদের বক্তব্য ছিল।
“আমাদের গায়ে ১৯৭১-এর ছুঁচোর গন্ধ আছে; আওয়ামী লীগের পাশে থাকলে সেই গন্ধ থাকবে না।”
কিন্তু বাস্তব ফল হলো সেই সংসদ টেকেনি, আর অব্যাহত আন্দোলনের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে এরশাদের। এখানেই স্পষ্ট হয়-জামাত নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় কখনো আন্দোলনকে বিভক্ত করতে, কখনো শাসকের সঙ্গে আঁতাত করতে দ্বিধা করে না।
আসন ভাগাভাগি ও ক্ষমতার স্বাদ
১৯৯৬ সালে জামাত এককভাবে নির্বাচনে লড়লেও মাত্র তিনটি আসন পায়। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের সেই স্বাদ তাদের ভেতরে নতুন লোভ তৈরি করে।
কিন্তু সেই সময় থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপি-জামাত জোটকে সন্ত্রাসবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়। একের পর এক সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ইত্যাদি ঘটনায় জামাতকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা হয়। এর ফলে বিদেশি কূটনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে।

১/১১-এর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বিএনপিকে দুর্বল করা। খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারকে ঘিরে মামলা, গ্রেপ্তার, কুৎসা রটনা এবং আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু- সবকিছু মিলিয়ে বিএনপি চরম সংকটে পড়ে।
প্রথমে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও জামাতের চাপেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ফলাফল হলো ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়। এরপর শুরু হয় বিরোধী দল দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মামলা ও কারাবাসের অন্ধকার অধ্যায়।
কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর পর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী সরকারের পতন হলে আবারও জামাত কৃতিত্ব দাবি করতে এগিয়ে আসে-যদিও বাস্তবে আন্দোলনের পথে তারা বহুবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নতুন তত্ত্ব: “পি আর সিস্টেম”

বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো জামাত ও আওয়ামী লীগের গোপন আঁতাতের নতুন রূপ-“পি আর” (চৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষ জবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ) সিস্টেম।
এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হারে সংসদে আসন পাবে। জামাত দাবি করছে, এই ব্যবস্থাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কেন “পি আর সিস্টেম” বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক?
১. গণতান্ত্রিক দেশে এটি নেই: যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা-কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় “পি আর সিস্টেম” নেই। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় প্রার্থী-জনসংযোগ ভেঙে পড়ে, জনগণ তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
২. জনমতের বিকৃতি: বাংলাদেশের ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সরাসরি ভোট দিতে চায়। কিন্তু “পি আর” সিস্টেমে কেবল দলকেই ভোট দিতে হবে। এতে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাবে।
৩. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: এই ব্যবস্থায় ছোট ছোট দলগুলোর হাতে ক্ষমতার দরজা খুলে যাবে। তারা তখন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আঁতাত করে সরকার গঠন বা ভাঙার খেলায় মেতে উঠবে। ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা বেড়ে যাবে।
৪. বাংলাদেশে বাস্তবায়ন মানেই ষড়যন্ত্র: বিশ্লেষকদের মতে, “পি আর”-র মূল উদ্দেশ্য বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখা। কারণ বিএনপি সবসময়ই একটি জনভিত্তিক শক্তি; অন্যদিকে জামাত বা এনসিপি জাতীয় ছোট দলগুলো এই কৌশলের মাধ্যমে সংসদে টিকে থাকার সুযোগ খুঁজছে।

জামাত-আওয়ামী আঁতাত ও বিদেশি স্বার্থ

ইতিমধ্যে “এনসিপি” নামের নতুন একটি দল আত্মপ্রকাশ করেছে, যা জামাত ও সরকারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে। একই সাথে সক্রিয় করা হয়েছে বিশাল সাইবার টিম, যারা বিএনপির বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।

এখানে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা “র”-এর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। এবারও ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে ভারতের স্বার্থ কাজ করছে।
উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনটি মুখ্য শক্তি হলো-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামাত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জামাত কখনো বিএনপির প্রকৃত মিত্র নয়; আবার আওয়ামী লীগেরও নয়। তারা কেবল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সুযোগ খোঁজে।
১৯৮৬ সালে যেমন আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলো-“এতে আমাদের গন্ধ থাকবে না”, আজও তারা নতুন রঙ বদলে টিকে থাকতে চাইছে। তথাকথিত “পি আর সিস্টেম”-এর দাবি আসলে আরেকটি ষড়যন্ত্র, যা কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশে নেই।
বাংলাদেশে এ ব্যবস্থার প্রয়োগ মানে হবে-রাজনৈতিক বিভাজন, অস্থিতিশীলতা এবং বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের জনগণের মনে রাখা জরুরি-দেশপ্রেমে বলীয়ান রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া বিদেশি প্রভাব ও স্বার্থান্বেষী আঁতাত বারবার দেশকে বিপথে নেবে।
যদি সত্যিই “বিএনপির বিকল্প বিএনপিই” হয়, তবে তা প্রমাণ করতে হবে শক্তিশালী সংগঠন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে। এই সংগ্রাম আজও চলমান।

লেখক পরিচিতি : ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই, এমইনস্টএফ
আন্তর্জাতিক গবেষক, রাজনীতিবিদ, লেখক, কলামিস্ট
সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি যুক্তরাজ্য (ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস)
চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য।

Please Share This Post in Your Social Media

জামাতের গায়ে ছুঁচোর গন্ধ বনাম নির্বাচন বানচালের নতুন তত্ত্ব “পি আর” 

রাজনীতি ডেস্ক
Update Time : ০৯:৩৫:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী সবসময়ই এক বিতর্কিত অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান, পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা, স্বাধীনতার পরে নিষিদ্ধ হওয়া, পরবর্তীতে সামরিক শাসকের ছত্রছায়ায় পুনর্বাসন, কখনো বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র আবার কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত-সব মিলিয়ে জামাতকে প্রায়শই “গিরগিটির মতো রঙ বদলানো রাজনৈতিক শক্তি” বলা হয়।

বিশেষ করে বিএনপির আন্দোলনের সময় বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে তারা কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো গোপনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও নির্বাচনকে ঘিরে জামাতের দ্বিমুখী ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে একটি তত্ত্ব-“পি আর সিস্টেম” – যা জামাতকে বাঁচিয়ে রাখার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামাতের ভূমিকা: ইতিহাসের কালো অধ্যায়

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামাতের ভূমিকা আজও জাতির জন্য এক কলঙ্কিত অধ্যায়। রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন এবং পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় গণহত্যা পরিচালনা-এসব কান্ডের দায় জামাত কখনো অস্বীকার করতে পারেনি। সেই বিশ্বাসঘাতকতার দায়েই স্বাধীনতার পরপরই জামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগে তারা আবার রাজনৈতিক মাঠে ফিরে আসে। আওয়ামী লীগ অভিযোগ তোলে-“জামাতকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল বিএনপি।” অভিযোগটি একপাক্ষিক হলেও এর বোঝা দীর্ঘদিন বিএনপিকেই বহন করতে হয়েছে। এখান থেকেই শুরু হয় জামাতের রাজনৈতিক কৌশল ও সুবিধাবাদী রাজনীতির নতুন খেলা ।

আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৮০’র দশকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতৃত্ব দিলেও ১৯৮৬ সালে হঠাৎ করেই জামাত নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়। এতে গণআন্দোলনের ভাঙন ঘটে। তখন জামাত নেতাদের বক্তব্য ছিল।
“আমাদের গায়ে ১৯৭১-এর ছুঁচোর গন্ধ আছে; আওয়ামী লীগের পাশে থাকলে সেই গন্ধ থাকবে না।”
কিন্তু বাস্তব ফল হলো সেই সংসদ টেকেনি, আর অব্যাহত আন্দোলনের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে এরশাদের। এখানেই স্পষ্ট হয়-জামাত নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় কখনো আন্দোলনকে বিভক্ত করতে, কখনো শাসকের সঙ্গে আঁতাত করতে দ্বিধা করে না।
আসন ভাগাভাগি ও ক্ষমতার স্বাদ
১৯৯৬ সালে জামাত এককভাবে নির্বাচনে লড়লেও মাত্র তিনটি আসন পায়। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের সেই স্বাদ তাদের ভেতরে নতুন লোভ তৈরি করে।
কিন্তু সেই সময় থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপি-জামাত জোটকে সন্ত্রাসবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়। একের পর এক সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ইত্যাদি ঘটনায় জামাতকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা হয়। এর ফলে বিদেশি কূটনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে।

১/১১-এর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বিএনপিকে দুর্বল করা। খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারকে ঘিরে মামলা, গ্রেপ্তার, কুৎসা রটনা এবং আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু- সবকিছু মিলিয়ে বিএনপি চরম সংকটে পড়ে।
প্রথমে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও জামাতের চাপেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ফলাফল হলো ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়। এরপর শুরু হয় বিরোধী দল দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মামলা ও কারাবাসের অন্ধকার অধ্যায়।
কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর পর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী সরকারের পতন হলে আবারও জামাত কৃতিত্ব দাবি করতে এগিয়ে আসে-যদিও বাস্তবে আন্দোলনের পথে তারা বহুবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নতুন তত্ত্ব: “পি আর সিস্টেম”

বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো জামাত ও আওয়ামী লীগের গোপন আঁতাতের নতুন রূপ-“পি আর” (চৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষ জবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ) সিস্টেম।
এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হারে সংসদে আসন পাবে। জামাত দাবি করছে, এই ব্যবস্থাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কেন “পি আর সিস্টেম” বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক?
১. গণতান্ত্রিক দেশে এটি নেই: যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা-কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় “পি আর সিস্টেম” নেই। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় প্রার্থী-জনসংযোগ ভেঙে পড়ে, জনগণ তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
২. জনমতের বিকৃতি: বাংলাদেশের ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সরাসরি ভোট দিতে চায়। কিন্তু “পি আর” সিস্টেমে কেবল দলকেই ভোট দিতে হবে। এতে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাবে।
৩. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: এই ব্যবস্থায় ছোট ছোট দলগুলোর হাতে ক্ষমতার দরজা খুলে যাবে। তারা তখন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আঁতাত করে সরকার গঠন বা ভাঙার খেলায় মেতে উঠবে। ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা বেড়ে যাবে।
৪. বাংলাদেশে বাস্তবায়ন মানেই ষড়যন্ত্র: বিশ্লেষকদের মতে, “পি আর”-র মূল উদ্দেশ্য বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখা। কারণ বিএনপি সবসময়ই একটি জনভিত্তিক শক্তি; অন্যদিকে জামাত বা এনসিপি জাতীয় ছোট দলগুলো এই কৌশলের মাধ্যমে সংসদে টিকে থাকার সুযোগ খুঁজছে।

জামাত-আওয়ামী আঁতাত ও বিদেশি স্বার্থ

ইতিমধ্যে “এনসিপি” নামের নতুন একটি দল আত্মপ্রকাশ করেছে, যা জামাত ও সরকারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে। একই সাথে সক্রিয় করা হয়েছে বিশাল সাইবার টিম, যারা বিএনপির বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।

এখানে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা “র”-এর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। এবারও ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে ভারতের স্বার্থ কাজ করছে।
উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনটি মুখ্য শক্তি হলো-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামাত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জামাত কখনো বিএনপির প্রকৃত মিত্র নয়; আবার আওয়ামী লীগেরও নয়। তারা কেবল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সুযোগ খোঁজে।
১৯৮৬ সালে যেমন আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলো-“এতে আমাদের গন্ধ থাকবে না”, আজও তারা নতুন রঙ বদলে টিকে থাকতে চাইছে। তথাকথিত “পি আর সিস্টেম”-এর দাবি আসলে আরেকটি ষড়যন্ত্র, যা কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশে নেই।
বাংলাদেশে এ ব্যবস্থার প্রয়োগ মানে হবে-রাজনৈতিক বিভাজন, অস্থিতিশীলতা এবং বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের জনগণের মনে রাখা জরুরি-দেশপ্রেমে বলীয়ান রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া বিদেশি প্রভাব ও স্বার্থান্বেষী আঁতাত বারবার দেশকে বিপথে নেবে।
যদি সত্যিই “বিএনপির বিকল্প বিএনপিই” হয়, তবে তা প্রমাণ করতে হবে শক্তিশালী সংগঠন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে। এই সংগ্রাম আজও চলমান।

লেখক পরিচিতি : ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই, এমইনস্টএফ
আন্তর্জাতিক গবেষক, রাজনীতিবিদ, লেখক, কলামিস্ট
সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি যুক্তরাজ্য (ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস)
চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য।