ঢাকা ০২:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আইনমন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশ অমান্যকারী সাহসী বিচারকের ভাগ্যে কি জুটবে!

নওরোজ রিপোর্ট
  • Update Time : ০৭:১১:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ অক্টোবর ২০২৪
  • / ৯১ Time View

স্বৈরাচার ফ্যাসিষ্ট হাসিনার আমলে সারাদেশে বিচার বিভাগের হাতে গোনা দু’একজন বিচারক ছাড়া কেউ যখন সাবেক সচিব ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে টু-শব্দটি করতে পারতো না, সেই দুঃসময়ে সব রকম হুমকি ধামকি এমনকি বারবার শাস্তিমূলক বদলীকে চোখের জ্বলে নীরবে মেনে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ন্যায় এবং অবিচল থেকেছেন এমন এক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজের নাম আব্দুল মান্নান।

তিনি আজ কোথায়? যাকে নিয়ে একসময় পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় বিস্তর আলোচনা হয়েছে, সেই আলোচনায় বর্তমান আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও যোগ দিয়েছিলেন। আজ সেই নির্যাতিত, নিপীড়িত, ন্যায় ও সাহসী বিচারকের কথা কেউ মনে করে না। সেলুকাস কি বিচিত্র দেশ!

সেই সময়কার পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নান পিরোজপুর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পিলে চমকানো এমপি আব্দুল আউয়ালকে দুর্নীতি মামলায় জামিন দেয়ার জন্য সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও আইন সচিবের নির্দেশ অমান্য করায় তাকে আইন সচিব গোলাম সরোয়ারের কক্ষে তলব করা হয়। আইন সচিবকে জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নান বলেন, স্যার সে দুর্নীতির মামলার আসামী, তাকে জামিন দেয়া সম্ভব নয়।

তখন সচিব বলেন, জামিন তুই দিবি না তোর বাপ দিবে। বিচারক সে দিন চোখের জল ফেলে সচিবের কক্ষ ত্যাগ করেন। এরপর পিরোজপুরে গিয়ে ধার্য্য তারিখে এমপি আউয়ালের জামিন বাতিল করলে ঐ দিনই বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটের মধ্যে দায়িত্বভার অর্পনের নির্দেশ আসে। অন্যথায় স্ট্যান্ড রিলিজ। দায়িত্ব অর্পন করার পর তাকে মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করে আনা হয়। এনিয়ে তখন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় শিরোনাম হয়ে উঠেন জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নান।

পরবর্তীতে মিডিয়ার চাপে তাকে কুড়িগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বদলী করা হয়। সেখানেও তার উপর চলে অনৈতিক ও মানসিক নির্যাতন। ঐ সময় বিচার বিভাগ সারাদেশের জেলা ও দায়রা জজ, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতসহ সবকটি আদালতে নিয়োগ পেতো মন্ত্রী ও সচিবের লোকজন। কথিত আছে, একজন পিওন নিয়োগে নেয়া হতো ১৫ লক্ষ টাকা, স্টেনো টাইপিস্ট এবং জারিকারক নিয়োগে নেয়া হতো ২০ লক্ষ টাকা। এমনকি মালি সুইপার নিয়োগেও ১০ লক্ষ টাকা করে নেয়া হতো।

গত ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে সাবেক সব আইনমন্ত্রী, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলামও নিয়োগ বাণিজ্য চালিয়ে গেছেন দেদারছে। তখন এদের কথার বাইরে কোন বিচারক তার আদালতে লোক নিয়োগ দিতে পারতো না। কুড়িগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ থাকাকালে তার দপ্তরেও লোক নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। সচিবের অর্ডার ছিল মন্ত্রী এবং তার লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু তিনি অনৈতিকভাবে নিয়োগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে রাজশাহীর একটি ট্রাইব্যুনাল আদালতে শাস্তিমূলক বদলীর জন্য হাইকোর্টে প্রস্তাব দেয়া হয়।

হাইকোর্ট ঐ বিচারককে ঢাকার বদলীর সুপারিশ করলে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও আইন সচিব গোলাম সরোয়ার ক্ষিপ্ত হয়ে পুনরায় রিভিউ করে আলোচ্য বিচারককে খুলনার প্রশাসনিক আদালতে শাস্তিমূলক বদলী করে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি শাস্তিমূলক বদলীকে নিয়তির লেখা হিসেবে মেনে নিয়ে নিরবে চাকুরী করে আসছেন। এমন ন্যায়পরায়ণ বিচারকদের সুদিন কবে ফিরবে? তা কি অবসরের পরে।

Please Share This Post in Your Social Media

আইনমন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশ অমান্যকারী সাহসী বিচারকের ভাগ্যে কি জুটবে!

নওরোজ রিপোর্ট
Update Time : ০৭:১১:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ অক্টোবর ২০২৪

স্বৈরাচার ফ্যাসিষ্ট হাসিনার আমলে সারাদেশে বিচার বিভাগের হাতে গোনা দু’একজন বিচারক ছাড়া কেউ যখন সাবেক সচিব ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে টু-শব্দটি করতে পারতো না, সেই দুঃসময়ে সব রকম হুমকি ধামকি এমনকি বারবার শাস্তিমূলক বদলীকে চোখের জ্বলে নীরবে মেনে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ন্যায় এবং অবিচল থেকেছেন এমন এক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজের নাম আব্দুল মান্নান।

তিনি আজ কোথায়? যাকে নিয়ে একসময় পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় বিস্তর আলোচনা হয়েছে, সেই আলোচনায় বর্তমান আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও যোগ দিয়েছিলেন। আজ সেই নির্যাতিত, নিপীড়িত, ন্যায় ও সাহসী বিচারকের কথা কেউ মনে করে না। সেলুকাস কি বিচিত্র দেশ!

সেই সময়কার পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নান পিরোজপুর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পিলে চমকানো এমপি আব্দুল আউয়ালকে দুর্নীতি মামলায় জামিন দেয়ার জন্য সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও আইন সচিবের নির্দেশ অমান্য করায় তাকে আইন সচিব গোলাম সরোয়ারের কক্ষে তলব করা হয়। আইন সচিবকে জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নান বলেন, স্যার সে দুর্নীতির মামলার আসামী, তাকে জামিন দেয়া সম্ভব নয়।

তখন সচিব বলেন, জামিন তুই দিবি না তোর বাপ দিবে। বিচারক সে দিন চোখের জল ফেলে সচিবের কক্ষ ত্যাগ করেন। এরপর পিরোজপুরে গিয়ে ধার্য্য তারিখে এমপি আউয়ালের জামিন বাতিল করলে ঐ দিনই বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটের মধ্যে দায়িত্বভার অর্পনের নির্দেশ আসে। অন্যথায় স্ট্যান্ড রিলিজ। দায়িত্ব অর্পন করার পর তাকে মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করে আনা হয়। এনিয়ে তখন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় শিরোনাম হয়ে উঠেন জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নান।

পরবর্তীতে মিডিয়ার চাপে তাকে কুড়িগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বদলী করা হয়। সেখানেও তার উপর চলে অনৈতিক ও মানসিক নির্যাতন। ঐ সময় বিচার বিভাগ সারাদেশের জেলা ও দায়রা জজ, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতসহ সবকটি আদালতে নিয়োগ পেতো মন্ত্রী ও সচিবের লোকজন। কথিত আছে, একজন পিওন নিয়োগে নেয়া হতো ১৫ লক্ষ টাকা, স্টেনো টাইপিস্ট এবং জারিকারক নিয়োগে নেয়া হতো ২০ লক্ষ টাকা। এমনকি মালি সুইপার নিয়োগেও ১০ লক্ষ টাকা করে নেয়া হতো।

গত ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে সাবেক সব আইনমন্ত্রী, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলামও নিয়োগ বাণিজ্য চালিয়ে গেছেন দেদারছে। তখন এদের কথার বাইরে কোন বিচারক তার আদালতে লোক নিয়োগ দিতে পারতো না। কুড়িগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ থাকাকালে তার দপ্তরেও লোক নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। সচিবের অর্ডার ছিল মন্ত্রী এবং তার লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু তিনি অনৈতিকভাবে নিয়োগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে রাজশাহীর একটি ট্রাইব্যুনাল আদালতে শাস্তিমূলক বদলীর জন্য হাইকোর্টে প্রস্তাব দেয়া হয়।

হাইকোর্ট ঐ বিচারককে ঢাকার বদলীর সুপারিশ করলে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও আইন সচিব গোলাম সরোয়ার ক্ষিপ্ত হয়ে পুনরায় রিভিউ করে আলোচ্য বিচারককে খুলনার প্রশাসনিক আদালতে শাস্তিমূলক বদলী করে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি শাস্তিমূলক বদলীকে নিয়তির লেখা হিসেবে মেনে নিয়ে নিরবে চাকুরী করে আসছেন। এমন ন্যায়পরায়ণ বিচারকদের সুদিন কবে ফিরবে? তা কি অবসরের পরে।