ঢাকা ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ

নিলামে জমি কিনে হাসপাতালে দুই ভাই, নেপথ্যে কাউন্সিলর নজরুল মৃধা

এম.এ. মুঈদ হোসেন আরিফ
  • Update Time : ০৭:৪৯:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মার্চ ২০২৪
  • / ৪১ Time View

নিলামে কেনা জমির দখল নিতে যেয়ে হাসপাতালে দুই ভাই - ছবি : সংগৃহীত

ফরিদপুরে নিলামে জমি কিনে দখলে যাওয়ায় আপন দুই ভাইকে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে হাসপাতালে পাঠালো ফরিদপুর পৌরসভার ২২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল মৃধা ও তার অনুসারীরা।

গত রোববার (১৭ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে মিঠুন ও মাহবুবুর দুই ভাই কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে ঐ জমিতে সীমানা দেয়াল তুলতে গেলে শহরের বায়তুল আমান ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতার নেতৃত্বে এ হামলা করে তাদের লোহার রড ও লাঠিসোটা দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। এছাড়া লেবারদেরও মারপিট করে মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় মো: মিঠুন খান (৪২), হাবিবুর রহমান (৩৮) ও আলামীন (৩০) নামে তিনজনকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

জানা যায়, বিগত ইং ০৩ অক্টোবর ২০২২ তারিখে ইস্টার্ণ ব্যাংক লিমিটেড এর কাছ থেকে সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের পান্নু খানের ছেলে মিঠুন খান ও মোঃ মাহবুবুর রহমান নামক দুই ভাই নিলামে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। ক্রয়কৃত জমি ভোগ দখলে করতে গেলেই বাধা দেয় কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম মৃধা। দাবী করে বসেন জমির মালিকানা।

ইস্টার্ন ব্যাংক ফরিদপুর শাখা সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের ভাসানচর গ্রামের আশরাফুল ইসলাম মিরাজ ১১৬ নং কমলাপুর মৌজার ১০ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে একটি ঋণ গ্রহন করে। যেখানে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আশরাফুলের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ ২৩ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধ না করায় মামলা করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আদালতের মাধ্যমে নিলাম বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করা হয়। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ৫১ লাখ টাকায় জমিটি ক্রয় করেন মিঠুন ও মাহবুবুর রহমান। ব্যাংক তাদের কাছে ২০২২ সালের ০৩ অক্টোবর জমির কাগজপত্র হস্তান্তর করে।

জমি ক্রয়ের পর গত ১৩ নভেম্বর, ২০২৩ ইং তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবর জমির দখল চেয়ে একটি আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩ এর ১২(৫)(ক)/বাংলাদেশ আইন ৩৩(৫) ধারা বিধান অনুসারে উল্লেখিত জমি মিঠুন গং/ব্যাংকে জমির দখল বুঝিয়ে দেয়ার জন্য গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি), সদর, ফরিদপুরকে নিয়োগ করেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিবাদী পক্ষকে এক মাসের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দিতে বলে বিগত ইং ১৬ জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে নোটিশ জারি করেন। অন্যথায় প্রশাসন উচ্ছেদ করবে মর্মে নোটিশে জানায়।

ভুক্তভোগীর দাবী নোটিশ জারীর তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত উচ্ছেদের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। ভুক্তভোগী আরো জানায় যে, উক্ত জমিটি যার কাছ থেকে নিলাম হয়েছে অর্থাৎ জমির পূর্ব মালিক কোন ঝামেলা না করলেও ফরিদপুর পৌরসভার ২২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে উক্ত জমি দখল করে হুমকি ধামকি প্রদান করে চলেছেন।

এ বিষয়ে তৎকালীন ইস্টার্ন ব্যাংকের নিয়োজিত আইনজীবী খান রেজাউল ইসলাম বাবুল বলেন যে, নজরুল ইসলাম এই জমি পাওয়ার বিষয়ে আদালতে আপিল করে ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও জানিয়েছেন জমিটি নজরুল এর নামে নেই।

এ বিষয়ে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এর সাথে মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ওই দাগে আমার ৩.৩৭ শতাংশ ক্রয়কৃত জমি রয়েছে এবং ১০ শতাংশ জমি আমি অ্যাটর্নি পাওয়ার মূলে মালিক হয়েছি। আমার কোনো জমি নিলাম হয়নি। আশরাফুল ইসলাম মিরাজ নামে কাউকে চিনি না। তাহলে ওই জমি ব্যাংক কেন নিলামে ডেকেছিল এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা ব্যাংক জানে।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মিঠুন খান বলেন, জমিটি জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন কাউন্সিলর নজরুল মৃধা। আমরা জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন তিনি। গত রবিবার সকালে দেয়াল নির্মাণের জন্য আমরা পুলিশের সহযোগিতায় সেখানে যাই। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতিতেই নজরুলের নেতৃত্বে একদল যুবক আমাদের ওপর হামলা করে। এতে আমি, আমার ভাই ও কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছি।

তিনি বলেন, আজ বাউন্ডারি ওয়াল নির্মান করার জন্য আমি পুলিশের সহযোগিতায় নিয়ে সেখানে যাই। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতিতেই নজরুল মৃধার নেতৃত্বে একদল যুবক আমাদের ওপর হামলা করে। এ সময় আমার শ্রমিকদেরও বেধরক মারধর করা হয়। আমাকেও আমার ছোট ভাইকেও বেধরক মারধর করে।

মিঠুন খানের বাবা পান্নু খান বলেন, আইনীভাবে আমাদের সমস্ত কাগজপত্র রয়েছে। আমরা জায়গা কিনেছি ব্যাংকের মাধ্যমে কিন্তু উনি কে। জায়গা যার ছিল তারা বাধা দিচ্ছে না। অথচ নজরুল মৃধা এই জমির কেউ না হয়ে নিজের জমি দাবি করে বসে আছেন।

কোতোয়ালি থানার ওসি জানান, এ বিষয়ে ৯ জনকে আসামী করে কোতয়ালী থানায় একটি মামলা রুজু হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার এর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদলী হওয়ায় ও নির্বাচনের জন্য কাজটি সম্পন্ন করতে দেরি হয়েছে। নতুন যোগদানকৃত সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উক্ত বিষয়ে দ্রত ব্যবস্থা নিবে।

Please Share This Post in Your Social Media

নিলামে জমি কিনে হাসপাতালে দুই ভাই, নেপথ্যে কাউন্সিলর নজরুল মৃধা

Update Time : ০৭:৪৯:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মার্চ ২০২৪

ফরিদপুরে নিলামে জমি কিনে দখলে যাওয়ায় আপন দুই ভাইকে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে হাসপাতালে পাঠালো ফরিদপুর পৌরসভার ২২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল মৃধা ও তার অনুসারীরা।

গত রোববার (১৭ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে মিঠুন ও মাহবুবুর দুই ভাই কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে ঐ জমিতে সীমানা দেয়াল তুলতে গেলে শহরের বায়তুল আমান ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতার নেতৃত্বে এ হামলা করে তাদের লোহার রড ও লাঠিসোটা দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। এছাড়া লেবারদেরও মারপিট করে মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় মো: মিঠুন খান (৪২), হাবিবুর রহমান (৩৮) ও আলামীন (৩০) নামে তিনজনকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

জানা যায়, বিগত ইং ০৩ অক্টোবর ২০২২ তারিখে ইস্টার্ণ ব্যাংক লিমিটেড এর কাছ থেকে সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের পান্নু খানের ছেলে মিঠুন খান ও মোঃ মাহবুবুর রহমান নামক দুই ভাই নিলামে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। ক্রয়কৃত জমি ভোগ দখলে করতে গেলেই বাধা দেয় কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম মৃধা। দাবী করে বসেন জমির মালিকানা।

ইস্টার্ন ব্যাংক ফরিদপুর শাখা সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের ভাসানচর গ্রামের আশরাফুল ইসলাম মিরাজ ১১৬ নং কমলাপুর মৌজার ১০ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে একটি ঋণ গ্রহন করে। যেখানে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আশরাফুলের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ ২৩ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধ না করায় মামলা করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আদালতের মাধ্যমে নিলাম বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করা হয়। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ৫১ লাখ টাকায় জমিটি ক্রয় করেন মিঠুন ও মাহবুবুর রহমান। ব্যাংক তাদের কাছে ২০২২ সালের ০৩ অক্টোবর জমির কাগজপত্র হস্তান্তর করে।

জমি ক্রয়ের পর গত ১৩ নভেম্বর, ২০২৩ ইং তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবর জমির দখল চেয়ে একটি আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩ এর ১২(৫)(ক)/বাংলাদেশ আইন ৩৩(৫) ধারা বিধান অনুসারে উল্লেখিত জমি মিঠুন গং/ব্যাংকে জমির দখল বুঝিয়ে দেয়ার জন্য গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি), সদর, ফরিদপুরকে নিয়োগ করেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিবাদী পক্ষকে এক মাসের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দিতে বলে বিগত ইং ১৬ জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে নোটিশ জারি করেন। অন্যথায় প্রশাসন উচ্ছেদ করবে মর্মে নোটিশে জানায়।

ভুক্তভোগীর দাবী নোটিশ জারীর তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত উচ্ছেদের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। ভুক্তভোগী আরো জানায় যে, উক্ত জমিটি যার কাছ থেকে নিলাম হয়েছে অর্থাৎ জমির পূর্ব মালিক কোন ঝামেলা না করলেও ফরিদপুর পৌরসভার ২২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে উক্ত জমি দখল করে হুমকি ধামকি প্রদান করে চলেছেন।

এ বিষয়ে তৎকালীন ইস্টার্ন ব্যাংকের নিয়োজিত আইনজীবী খান রেজাউল ইসলাম বাবুল বলেন যে, নজরুল ইসলাম এই জমি পাওয়ার বিষয়ে আদালতে আপিল করে ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও জানিয়েছেন জমিটি নজরুল এর নামে নেই।

এ বিষয়ে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এর সাথে মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ওই দাগে আমার ৩.৩৭ শতাংশ ক্রয়কৃত জমি রয়েছে এবং ১০ শতাংশ জমি আমি অ্যাটর্নি পাওয়ার মূলে মালিক হয়েছি। আমার কোনো জমি নিলাম হয়নি। আশরাফুল ইসলাম মিরাজ নামে কাউকে চিনি না। তাহলে ওই জমি ব্যাংক কেন নিলামে ডেকেছিল এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা ব্যাংক জানে।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মিঠুন খান বলেন, জমিটি জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন কাউন্সিলর নজরুল মৃধা। আমরা জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন তিনি। গত রবিবার সকালে দেয়াল নির্মাণের জন্য আমরা পুলিশের সহযোগিতায় সেখানে যাই। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতিতেই নজরুলের নেতৃত্বে একদল যুবক আমাদের ওপর হামলা করে। এতে আমি, আমার ভাই ও কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছি।

তিনি বলেন, আজ বাউন্ডারি ওয়াল নির্মান করার জন্য আমি পুলিশের সহযোগিতায় নিয়ে সেখানে যাই। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতিতেই নজরুল মৃধার নেতৃত্বে একদল যুবক আমাদের ওপর হামলা করে। এ সময় আমার শ্রমিকদেরও বেধরক মারধর করা হয়। আমাকেও আমার ছোট ভাইকেও বেধরক মারধর করে।

মিঠুন খানের বাবা পান্নু খান বলেন, আইনীভাবে আমাদের সমস্ত কাগজপত্র রয়েছে। আমরা জায়গা কিনেছি ব্যাংকের মাধ্যমে কিন্তু উনি কে। জায়গা যার ছিল তারা বাধা দিচ্ছে না। অথচ নজরুল মৃধা এই জমির কেউ না হয়ে নিজের জমি দাবি করে বসে আছেন।

কোতোয়ালি থানার ওসি জানান, এ বিষয়ে ৯ জনকে আসামী করে কোতয়ালী থানায় একটি মামলা রুজু হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার এর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদলী হওয়ায় ও নির্বাচনের জন্য কাজটি সম্পন্ন করতে দেরি হয়েছে। নতুন যোগদানকৃত সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উক্ত বিষয়ে দ্রত ব্যবস্থা নিবে।