ঢাকা ১০:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

নফল রোযার বিবরণ

Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৩২:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ মে ২০২৩
  • / ১০১ Time View

কেহ কেহ মনে করতে পারেন যে নফল এবাদত কোন মর্যাদা সম্পন্ন এবাদত নয় – আসলে ইহা একটি নিতান্ত ভুল ধারণা। কারণ হাদীস শরীফে এসেছে ফরয, ওয়াজিব এবাদতে ত্রুটি ধরা পড়ে হাশরের দিন যখন ওজনে কম পড়বে, আল্লাহ পাক নিজগুণে তার নফল এবাদত দ্বারা উহা পূর্ণ করে তাকে রেহাই দেয়ার ব্যবস্থা করবেন (আবু দাউদ হাদীস নং: ৮৬৪)। অতএব ফরয ওয়াজিব ছাড়াও যথেষ্ট পরিমাণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তরিকা মতে নফল নামায, নফল রোযা, নফল ছদকা, তাছবিহ ও তেলাওয়াত ইত্যাদি করা আমাদের পক্ষে একান্ত জরূরী। এসব নফল এবাদত দ্বারা মাতা-পিতা, ভাই-বোনসহ আত্মীয় স্বজন মুর্দেগাণের রোহে বখসে দিলে তাঁদের পক্ষে বড়ই উপকারী হয়।
নফল রোযার ফজিলত
রোযা মানুষের গুনাহ মাফির মাধ্যমে নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল করে। রোযার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমান যাতে শুধু মাহে রামাদ্বানের ফরয রোযা রেখে থেমে না যান, বরং কীভাবে সহজেই পূর্ণ বছরটা মহান আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দা ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে থাকতে পারেন এবং কী করে চিরস্থায়ী জান্নাতের বাসিন্দা হতে পারেন এবং পরকালে কীভাবে সফলকাম থাকতে পারেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের সামনে এই পথ সুস্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন।
ফরয ও ওয়াজিব রোযা ছাড়া অন্যান্য রোযাকে নফল রোযা বলা হয়; নফল মানে অতিরিক্ত, ফরয বা ওয়াজিব নয়। মূলত এই নফল রোযা দুইপ্রকার। প্রথম প্রকার হলো নির্ধারিত বা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক গুরুত্ব সহকারে পালনকৃত, এই প্রকার রোযা সুন্নাতে মুআক্কাদা। দ্বিতীয় প্রকার হলো অনির্ধারিত, এগুলো মুস্তাহাব। এই উভয় প্রকার রোযাকে সাধারণভাবে নফল রোযা বলা হয়ে থাকে।
হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নফল রোযার মধ্যে সওমে দাউদ বা দাউদ আলাইহিস সাল্লাম এর রোযার চেয়ে উত্তম আর হতে পারে না । তিনি এক দিন রোযা রাখতেন আর এক দিন বিরত থাকতেন। এভাবে তিনি বছরের অর্ধেক সময় রোযা রাখতেন।’ (বুখারি হাদীস নং:১৯৭৬, মুসলিম হাদীস নং:১১৫৯, আবু দাউদ হাদীস নং:২৪৪৮, তিরমিজি হাদীস নং:৭৭০) ।
হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল-এ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টির জন্য একটি রোযা রাখবে, আল্লাহ তাআ’লা তার মুখমণ্ডল দোজখের আগুন থেকে ৭০ বছরের রাস্তা দূরে রাখবেন।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৫৩, নাসায়ী হাদীস নং:২২৫২)।
রোযার ফদ্বিলত সম্পর্কে হাদীস শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যক বস্তুর যাকাত আছে, শরীরের যাকাত রোযা।’ (ইবনে মাজাহ হাদীস নং:১৮১৭)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘রোযা ঢাল স্বরূপ এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার সুদৃঢ় দুর্গ।’ (নাসায়ী হাদীস নং:২২৩০)।
হযরত আবু উমামা বর্ণনা করেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি আমাদের কিছু আমল করার উপদেশ দান করুন। তখন রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রোযা রাখ, এর সমকক্ষ কোনো আমল নেই। তাঁরা পুনরায় বললেন, আমাদের কোনো আমল বলে দিন। রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘রোযা রাখ, এর সমতুল্য কোনো আমল নেই।’ তাঁরা পুনরায় একই প্রার্থনা করলেন। রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় একই আদেশ করলেন। (নাসায়ী হাদীস নং:২২২৩)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রোযাদার ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়।’(বায়হাকি)।
শাওয়ালের নফল রোযা
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বছরের মধ্যে কয়েকটি দিনের নফল রোযা রাখা অত্যন্ত ফদ্বিলত বলে স্বীয় উম্মতকে তাকিদ করেছেন। তন্মধ্যে শাওয়াল মাসে ৬ টি রোযা রাখা পূর্ণ এক বছরের রোযা রাখার সমতুল্য। তাছাড়া এ রোযার বরকতে পাপ হতে মুক্তি লাভ হয়। এ রোযা গুলো একাধারে বা দু’একদিন অন্তর অন্তর, শাওয়াল মাসের শুরু-শেষ-মাঝামাঝি সব সময় রাখার এখতিয়ার আছে। ধারাবাহিকভাবে বা বিরতি দিয়ে যেভাবেই করা হোক, রোযাদার অবশ্যই এর সওয়াবের অধিকারী হবেন।
হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রামাদ্বানের রোযা রাখল, অতঃপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা রাখল, সে যেন পূর্ণ বছরই রোযা রাখল।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬৪, আবু দাউদ হাদীস নং:২৪৩৩, তিরমিজি হাদীস নং:৭৫৯, ইবনে মাজাহ হাদীস নং:১৭৮৭, আহমাদ: ৫/২৮০, দারেমি: ১৭৫৫)।
অন্য বর্ণনায় আছে- ‘আল্লাহ এক নেকিকে দশগুণ করেন। সুতরাং এক মাসের রোযা দশ মাসের রোযার সমান। বাকী ছয় দিন রোযা রাখলে এক বছর হয়ে গেল।‘ নাসায়ী হাদীস নং:২২১৫, ইবনে মাজাহ হাদীস নং:১৭০৭)। হাদীসটি সহিহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব (১/৪২১) গ্রন্থেও রয়েছে। সহিহ ইবনে খুজাইমাতে হাদীসটি এসেছে এ ভাষায়- ‘রামাদ্বান মাসের রোযা হচ্ছে দশ মাসের সমান। আর ছয় দিনের রোযা হচ্ছে- দুই মাসের সমান। এভাবে এক বছরের রোযা হয়ে গেল।‘
এ ছাড়া শাওয়ালের ছয় রোযা রাখার আরও ফায়দা রয়েছে – অবহেলার কারণে অথবা গুনাহর কারণে রামাদ্বানের রোযার উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে সেটা পুষিয়ে নেয়া হয়। যদি কোনো ব্যক্তি রামাদ্বান মাসের ৩০টি রোযা রাখে, তাহলে তার ১০ গুণ তিন শ’ রাত হবে। আর শাওয়ালের ৬ রোযার ১০ গুণ ৬০ হবে। এমনিভাবে সব রোযার সওয়াব মিলে ৩৬০ দিন হয়ে গেল। আর আরবি দিনপঞ্জী হিসাবে ৩৬০ দিনেই তো বছর পূর্ণ হয়।
একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, শাওয়ালের ৬ রোযার সাথে রামাদ্বানের কাযা রোযা আদায় হবে না। উভয় রোযাই আলাদা আলাদা রাখতে হবে। যদি কাযা রোযা থাকে তবে শাওয়ালের ৬ রোযা প্রথমে রেখে পরে কাযা রোযা রাখা শুরু করতে পারবেন যাতে করে শাওয়ালের রোযার সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হন, কারণ কাযা রোযা বছরের যে কোন সময় রাখা যাবে। উল্লেখ্য, রামাদ্বানের কাযা রোযা আদায় করা ফরয। কেউ নফল রোযা রেখে ভেঙে ফেললে তার ও কাযা আদায় করা ওয়াজিব। কোনো মুমিন মুসলমান যদি তার অপর কোনো ভাই-বোনকে এই রোযা রাখতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সে যদি তার পরামর্শে রোযা রাখে, তবে উদ্বুদ্ধকারীও সমান সওয়াবের অধিকারী হবেন।
এ রোযা ফরয নামাজের পর সুন্নাতে মুআক্কাদার মতো। যা ফরয নামাজের উপকারিতা ও তার অসম্পূর্ণতাকে পরিপূর্ণ করে। অনুরূপভাবে শাওয়াল মাসের ৬ রোযা রমযানের ফরয রোযার অসম্পূর্ণতা সম্পূর্ণ করে এবং তাতে কোনো ত্রুটি ঘটে থাকলে তা দূর করে থাকে। সে অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটির কথা রোযাদার জানতে পারুক আর নাই পারুক।
তাছাড়া রামাদ্বানের ফরয রোযা পালনের পরপর পুনরায় রোযা রাখার মানেই হলো রামাদ্বানের রোযা কবুল হওয়ার একটি লক্ষণ। যেহেতু মহান আল্লাহ কোন বান্দার নেক আমল যখন কবুল করেন, তখন তার পরেই তাকে আরও নেক আমল করার তাওফিক দান করে থাকেন। যেমন উলামায়ে কেরাম বলে থাকেন, ‘নেক আমল কবুল হওয়ার আলামত হলো, তার পরে পুনরায় নেক কাজ করা (আহকামুস সিয়াম)।
আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) বলেন, শাওয়াল মাসে রোযা রাখার তাৎপর্য অনেক। রামাদ্বানের পর রোযা রাখা রামাদ্বানের রোযা কবুল হওয়ার আলামত স্বরূপ। কেননা আল্লাহ তাআ’লা কোন বান্দার আমল কবুল করলে, তাকে পরেও অনুরূপ আমল করার তৌফিক দিয়ে থাকেন। নেক আমল কবুলের আলামত ও প্রতিদান ভিন্নরূপ। তার মধ্যে একটি হলো পুনরায় নেক আমল করার সৌভাগ্য অর্জন করা।
জিলহজ মাসের প্রথম দশকের নফল রোযা
৯ই জিলহজ তারিখে রোযা রাখা বড়ই সওয়াব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আরাফার দিনের রোযা বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহর কাফফারা হিসাবে গ্রহণ করা হবে।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২, তিরমিজি হাদীস নং:৭৪৯)।
মহররম মাসের রোযা
রামাদ্বানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে আশুরার রোযা ফরয ছিল, রামাদ্বানের রোযা ফরয হওয়ার পর আশুরার রোযা রহিত হয়েছে কিন্তু কিয়ামত পর্যন্ত সুন্নাত হিসাবে বাকী থাকবে।
মহররম মাসের ১০ তারিখে রোযা রাখাও তদরূপ বিশেষ সওয়াব। হাদীস শরীফে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘রামাদ্বান মাসের পর সর্বোত্তম রোযা হলো মহররমের রোযা। আর ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো তাহাজ্জুদের নামায ।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬৩)।
হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক প্রশ্নের জবাবে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আশুরার এক দিনের রোযা বিগত এক বছরের গুনাহর কাফফারা হিসাবে গৃহীত হয়।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২)। উল্লেখ্য, আশুরার রোযা রাখার ক্ষেত্রে মহররম মাসের ১০ তারিখের রোযার সঙ্গে আগে বা পরে একটি রোযা মিলিয়ে রাখতে হবে। শুধু ১০ তারিখ রোযা রাখা মাকরূহ। (মুসলিম হাদীস নং:১১৩৪)
শাবান মাসের নফল রোযা
হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাদ্বান শরীফের অভ্যর্থনা অনুসারে প্রায় পূর্ণ শাবান মাসই রোযা রাখতেন, এবং এরশাদ করেছেন শাবানের ১৫ তারিখের রাতে (শবে বরাত) জাগ্রত থেকে ইবাদত কর এবং দিনে রোযা রাখ, কারণ সে রাতে আল্লাহর দরবারে বান্দাগণের বিগত এক বছরের আমল সমূহ পেশ করা হয়। আমার আমলগুলি আমার রোযা রাখা অবস্থায় আল্লাহর দরবারে পেশ হওয়া আমি ভাল বোধ করি। তাছাড়া এক শাবান হতে অন্য শাবান পর্যন্ত যত লোক মারা যাবে, তাদের নাম মৃতগণের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়। হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার রোযা থাকাবস্থায় আমার নাম মৃত গণের তালিকা ভুক্ত হওয়া আমি পছন্দ করি। এ উদ্দেশ্যে প্রায় শাবন মাসই আমি রোযা রাখি।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শাবান মাস ছাড়া অন্য মাসে এত অধিক পরিমাণে নফল রোযা পালন করতে দেখিনি।’ (বুখারি হাদীস নং:১৯৬৯, নাসায়ি হাদীস নং:২৩৫৪)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাস এলে বলতেন, যখন মধ্য শাবান (শবে বরাত) আসবে, তখন তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রোযা রাখো। (বায়হাকি)।
আইয়ামে বিজের নফল রোযা
প্রত্যেক চাঁন্দের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখকে আইয়ামে বিজ (উজ্জ্বল জোস্না প্লাবিত তারিখ গুলো) বলে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং সর্বদা এই তিনটি রোযা রাখতেন । এ তিনটি রোযা আদায় করলে পূর্ণ বছর নফল রোযা আদায়ের সওয়াব লাভের কথা এসেছে। একটি নেক আমলের সওয়াব কমপক্ষে দশগুণ দেয়া হয়। তিন দিনের রোযার সওয়াব দশগুণ করলে ত্রিশ দিন হয়। যেমন আবু কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে প্রত্যেক মাসে তিনটি রোযা ও এক রামাদ্বানের পর পরবর্তী রামাদ্বানে রোযা পালন পূর্ণ বছর রোযা পালনের সমান (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২)। হযরত আবু জর গিফারি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এভাবে বলেছেন : ‘হে আবু জর, যদি তুমি প্রতি মাসে তিন দিন রোযা পালন করতে চাও, তাহলে প্রতি চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে তা পালন করো।’ (তিরমিজি হাদীস নং:৭৬১)। এই রোযাকে সওমে আদম বা আদম (আ.)-এর রোযা বলা হয়। হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম ও মা হাওয়া আলাইহাস সাল্লাম দুনিয়ায় আসার পর প্রথম এই তিনটি রোযা পালন করেন; যার বদৌলতে তাঁরা আগের মতো জান্নাতি রূপ লাবণ্য ও উজ্জ্বল্য ফিরে পান এবং এই দিনগুলোতে চাঁদ পূর্ণ শশীতে পরিণত হয়, রাতভর পূর্ণিমার জ্যোত্স্নালোক বিকিরণ করে বলে এই নামকরণ করা হয়েছে।

সোমবার ও বৃহস্পতিবারের নফল রোযা
হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সোমবার ও বৃহস্পতিবারে রোযা রাখতেন । রাখার কারণ বর্ণনা করেছেন যে, উক্ত দু’দিন মানবের সাপ্তাহিক কার্যাবলী আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আরও বলেন, এ দু’দিনে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাপ্রার্থী মুসলমানগণকে মাফ করে থাকেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কাজেই আমি পছন্দ করি যখন আমার আমল পেশ করা হবে তখন আমি রোযা অবস্থায় থাকব।’ (নাসায়ী হাদীস নং:২৩৫৮ ও তিরমিজি হাদীস নং:৭৪৭।)
হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সোমবারে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন ‘এ দিনে আমার জন্ম হয়েছে এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত দেয়া হয়েছে বা আমার উপর কোরআন নাজিল শুরু হয়েছে’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২)।

রামাদ্বান মাসের রোযা ও অন্যান্য রোযার নিয়তের তারতম্য
রোযার জন্য যেমন পানাহার পরিত্যাগ করা ফরয, তেমনি নিয়ত করা ও ফরয, কিন্ত মুখে পড়া ফরয নয়, শুধু মনে মনে চিন্তা করে নিয়ত করে যে, আমি আজ বা আগামীকল্য রোযা রাখব, তাতে রোযা হয়ে যাবে। যদি রাত থেকে রামাদ্বানের রোযার নিয়ত করে তবে ফরয আদায় হয়ে যাবে, এমন কি দিনের দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত রামাদ্বানের রোযা নির্দিষ্ট, মান্নাতের রোযা এবং নফল রোযার নিয়ত করা জাইয আছে। আর কাফফারা এবং অনির্দিষ্ট রোযার নিয়ত সুবহে সাদিক হওয়ার পর জাইয নেই। বরং এর পূর্বেই করতে হবে (মালাবুদ মিনহু, শামী)।
নফল রোযা পালন অবস্থায় যদি অতিথি আপ্যায়ন করাতে হয় বা আপ্যায়ন গ্রহণ করতে হয়, তাহলে নফল রোযা ছেড়ে দেওয়া জাইয আছে এবং পরবর্তী সময়ে এই রোযা কাযা আদায় করা ওয়াজিব হবে।
রোযা রাখার নিষিদ্ধ দিবসসমূহ
সারা বছরে মাত্র পাঁচ দিন রোযা রাখা হারাম। দু’ঈদে দু’দিন এবং বক্বরা ঈদের পরে ১১, ১২, ১৩ ই জিলহজ্ব। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরবানির ঈদের দিন ও রোযার ঈদের দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম হাদীস নং:১১৩৮)। হযরত নুবায়শা হুজালি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আইয়ামে তাশরিক (জিলহজ মাসের ১১ থেকে ১৩ তারিখ) হলো খাওয়া, পান করা ও আল্লাহর নেয়ামতের শুকুর আদায় করার জন্য।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৪১, তিরমিজি হাদীস নং:৭৭৩)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন শুধুমাত্র শুক্রবারকে বিশেষ করে রোযার জন্য খাছ করা ভাল নয়। শুক্রবারে রোযা রাখতে হলে এর পূর্বে বা পরে আরও একদিনের রোযা সংযোগ করবে (মুসলিম হাদীস নং:১১৪৪)।
প্রকাশ থাকে যে, এবাদত সমূহ হতে সামর্থানুযায়ী কিছু পরিমাণ এবাদত স্বীয় অব্যস্ত করে নিলে শয়তান মরদুদ সে ব্যক্তিকে অলসতা, অবহেলা, বা অমনোযোগিতার মধ্যে ফেলে কোনো প্রকার ছুতানাতার আড়ালে তাকে এবাদত হতে বঞ্চিত রাখতে সক্ষম হয় না। এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহর অলীগণ নফল এবাদতের কিছু পরিমাণকে দৈনিক অজিফারূপে নির্দিষ্ট করে নেন, এবং ইহাকে আদায় করা এত জরূরী মনে করেন যেন কোন বিশেষ কারণে সময় মত আদায় করতে না পারলে উহাকে ক্বাজার ন্যায় অন্য সময় আদায় করে নেন। তাহলে শয়তান কর্তৃক অবহেলা, অমনোযোগিতা ও অলসতায় টেনে আনার ছিদ্রপথ বন্ধ থাকবে। যেমন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কারো তাহাজ্জুদ বা রাত্রের কোন অজিফা কোন দিন ছুটে গেলে দ্বি-প্রহরের পূর্বে আদায় করে নিবে।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের নফল রোযা রাখার মাধ্যমে সারা বছর রোযা পালনের সওয়াব হাসিলের দ্বারা ইহকাল ও পরকালে সফলকাম হওয়ার তাওফিক দান করুন। হে করূণাময় আল্লাহ তাআলা! আমাকে ও পাঠকবৃন্দকে বর্ণিত মাসআলা সমূহের উপর আমল করার তৌফিক দান করুন। (আমীন)!

লেখক: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.)।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

নফল রোযার বিবরণ

Update Time : ০৮:৩২:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ মে ২০২৩

কেহ কেহ মনে করতে পারেন যে নফল এবাদত কোন মর্যাদা সম্পন্ন এবাদত নয় – আসলে ইহা একটি নিতান্ত ভুল ধারণা। কারণ হাদীস শরীফে এসেছে ফরয, ওয়াজিব এবাদতে ত্রুটি ধরা পড়ে হাশরের দিন যখন ওজনে কম পড়বে, আল্লাহ পাক নিজগুণে তার নফল এবাদত দ্বারা উহা পূর্ণ করে তাকে রেহাই দেয়ার ব্যবস্থা করবেন (আবু দাউদ হাদীস নং: ৮৬৪)। অতএব ফরয ওয়াজিব ছাড়াও যথেষ্ট পরিমাণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তরিকা মতে নফল নামায, নফল রোযা, নফল ছদকা, তাছবিহ ও তেলাওয়াত ইত্যাদি করা আমাদের পক্ষে একান্ত জরূরী। এসব নফল এবাদত দ্বারা মাতা-পিতা, ভাই-বোনসহ আত্মীয় স্বজন মুর্দেগাণের রোহে বখসে দিলে তাঁদের পক্ষে বড়ই উপকারী হয়।
নফল রোযার ফজিলত
রোযা মানুষের গুনাহ মাফির মাধ্যমে নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল করে। রোযার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমান যাতে শুধু মাহে রামাদ্বানের ফরয রোযা রেখে থেমে না যান, বরং কীভাবে সহজেই পূর্ণ বছরটা মহান আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দা ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে থাকতে পারেন এবং কী করে চিরস্থায়ী জান্নাতের বাসিন্দা হতে পারেন এবং পরকালে কীভাবে সফলকাম থাকতে পারেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের সামনে এই পথ সুস্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন।
ফরয ও ওয়াজিব রোযা ছাড়া অন্যান্য রোযাকে নফল রোযা বলা হয়; নফল মানে অতিরিক্ত, ফরয বা ওয়াজিব নয়। মূলত এই নফল রোযা দুইপ্রকার। প্রথম প্রকার হলো নির্ধারিত বা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক গুরুত্ব সহকারে পালনকৃত, এই প্রকার রোযা সুন্নাতে মুআক্কাদা। দ্বিতীয় প্রকার হলো অনির্ধারিত, এগুলো মুস্তাহাব। এই উভয় প্রকার রোযাকে সাধারণভাবে নফল রোযা বলা হয়ে থাকে।
হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নফল রোযার মধ্যে সওমে দাউদ বা দাউদ আলাইহিস সাল্লাম এর রোযার চেয়ে উত্তম আর হতে পারে না । তিনি এক দিন রোযা রাখতেন আর এক দিন বিরত থাকতেন। এভাবে তিনি বছরের অর্ধেক সময় রোযা রাখতেন।’ (বুখারি হাদীস নং:১৯৭৬, মুসলিম হাদীস নং:১১৫৯, আবু দাউদ হাদীস নং:২৪৪৮, তিরমিজি হাদীস নং:৭৭০) ।
হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল-এ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টির জন্য একটি রোযা রাখবে, আল্লাহ তাআ’লা তার মুখমণ্ডল দোজখের আগুন থেকে ৭০ বছরের রাস্তা দূরে রাখবেন।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৫৩, নাসায়ী হাদীস নং:২২৫২)।
রোযার ফদ্বিলত সম্পর্কে হাদীস শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যক বস্তুর যাকাত আছে, শরীরের যাকাত রোযা।’ (ইবনে মাজাহ হাদীস নং:১৮১৭)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘রোযা ঢাল স্বরূপ এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার সুদৃঢ় দুর্গ।’ (নাসায়ী হাদীস নং:২২৩০)।
হযরত আবু উমামা বর্ণনা করেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি আমাদের কিছু আমল করার উপদেশ দান করুন। তখন রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রোযা রাখ, এর সমকক্ষ কোনো আমল নেই। তাঁরা পুনরায় বললেন, আমাদের কোনো আমল বলে দিন। রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘রোযা রাখ, এর সমতুল্য কোনো আমল নেই।’ তাঁরা পুনরায় একই প্রার্থনা করলেন। রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় একই আদেশ করলেন। (নাসায়ী হাদীস নং:২২২৩)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রোযাদার ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়।’(বায়হাকি)।
শাওয়ালের নফল রোযা
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বছরের মধ্যে কয়েকটি দিনের নফল রোযা রাখা অত্যন্ত ফদ্বিলত বলে স্বীয় উম্মতকে তাকিদ করেছেন। তন্মধ্যে শাওয়াল মাসে ৬ টি রোযা রাখা পূর্ণ এক বছরের রোযা রাখার সমতুল্য। তাছাড়া এ রোযার বরকতে পাপ হতে মুক্তি লাভ হয়। এ রোযা গুলো একাধারে বা দু’একদিন অন্তর অন্তর, শাওয়াল মাসের শুরু-শেষ-মাঝামাঝি সব সময় রাখার এখতিয়ার আছে। ধারাবাহিকভাবে বা বিরতি দিয়ে যেভাবেই করা হোক, রোযাদার অবশ্যই এর সওয়াবের অধিকারী হবেন।
হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রামাদ্বানের রোযা রাখল, অতঃপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা রাখল, সে যেন পূর্ণ বছরই রোযা রাখল।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬৪, আবু দাউদ হাদীস নং:২৪৩৩, তিরমিজি হাদীস নং:৭৫৯, ইবনে মাজাহ হাদীস নং:১৭৮৭, আহমাদ: ৫/২৮০, দারেমি: ১৭৫৫)।
অন্য বর্ণনায় আছে- ‘আল্লাহ এক নেকিকে দশগুণ করেন। সুতরাং এক মাসের রোযা দশ মাসের রোযার সমান। বাকী ছয় দিন রোযা রাখলে এক বছর হয়ে গেল।‘ নাসায়ী হাদীস নং:২২১৫, ইবনে মাজাহ হাদীস নং:১৭০৭)। হাদীসটি সহিহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব (১/৪২১) গ্রন্থেও রয়েছে। সহিহ ইবনে খুজাইমাতে হাদীসটি এসেছে এ ভাষায়- ‘রামাদ্বান মাসের রোযা হচ্ছে দশ মাসের সমান। আর ছয় দিনের রোযা হচ্ছে- দুই মাসের সমান। এভাবে এক বছরের রোযা হয়ে গেল।‘
এ ছাড়া শাওয়ালের ছয় রোযা রাখার আরও ফায়দা রয়েছে – অবহেলার কারণে অথবা গুনাহর কারণে রামাদ্বানের রোযার উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে সেটা পুষিয়ে নেয়া হয়। যদি কোনো ব্যক্তি রামাদ্বান মাসের ৩০টি রোযা রাখে, তাহলে তার ১০ গুণ তিন শ’ রাত হবে। আর শাওয়ালের ৬ রোযার ১০ গুণ ৬০ হবে। এমনিভাবে সব রোযার সওয়াব মিলে ৩৬০ দিন হয়ে গেল। আর আরবি দিনপঞ্জী হিসাবে ৩৬০ দিনেই তো বছর পূর্ণ হয়।
একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, শাওয়ালের ৬ রোযার সাথে রামাদ্বানের কাযা রোযা আদায় হবে না। উভয় রোযাই আলাদা আলাদা রাখতে হবে। যদি কাযা রোযা থাকে তবে শাওয়ালের ৬ রোযা প্রথমে রেখে পরে কাযা রোযা রাখা শুরু করতে পারবেন যাতে করে শাওয়ালের রোযার সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হন, কারণ কাযা রোযা বছরের যে কোন সময় রাখা যাবে। উল্লেখ্য, রামাদ্বানের কাযা রোযা আদায় করা ফরয। কেউ নফল রোযা রেখে ভেঙে ফেললে তার ও কাযা আদায় করা ওয়াজিব। কোনো মুমিন মুসলমান যদি তার অপর কোনো ভাই-বোনকে এই রোযা রাখতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সে যদি তার পরামর্শে রোযা রাখে, তবে উদ্বুদ্ধকারীও সমান সওয়াবের অধিকারী হবেন।
এ রোযা ফরয নামাজের পর সুন্নাতে মুআক্কাদার মতো। যা ফরয নামাজের উপকারিতা ও তার অসম্পূর্ণতাকে পরিপূর্ণ করে। অনুরূপভাবে শাওয়াল মাসের ৬ রোযা রমযানের ফরয রোযার অসম্পূর্ণতা সম্পূর্ণ করে এবং তাতে কোনো ত্রুটি ঘটে থাকলে তা দূর করে থাকে। সে অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটির কথা রোযাদার জানতে পারুক আর নাই পারুক।
তাছাড়া রামাদ্বানের ফরয রোযা পালনের পরপর পুনরায় রোযা রাখার মানেই হলো রামাদ্বানের রোযা কবুল হওয়ার একটি লক্ষণ। যেহেতু মহান আল্লাহ কোন বান্দার নেক আমল যখন কবুল করেন, তখন তার পরেই তাকে আরও নেক আমল করার তাওফিক দান করে থাকেন। যেমন উলামায়ে কেরাম বলে থাকেন, ‘নেক আমল কবুল হওয়ার আলামত হলো, তার পরে পুনরায় নেক কাজ করা (আহকামুস সিয়াম)।
আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) বলেন, শাওয়াল মাসে রোযা রাখার তাৎপর্য অনেক। রামাদ্বানের পর রোযা রাখা রামাদ্বানের রোযা কবুল হওয়ার আলামত স্বরূপ। কেননা আল্লাহ তাআ’লা কোন বান্দার আমল কবুল করলে, তাকে পরেও অনুরূপ আমল করার তৌফিক দিয়ে থাকেন। নেক আমল কবুলের আলামত ও প্রতিদান ভিন্নরূপ। তার মধ্যে একটি হলো পুনরায় নেক আমল করার সৌভাগ্য অর্জন করা।
জিলহজ মাসের প্রথম দশকের নফল রোযা
৯ই জিলহজ তারিখে রোযা রাখা বড়ই সওয়াব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আরাফার দিনের রোযা বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহর কাফফারা হিসাবে গ্রহণ করা হবে।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২, তিরমিজি হাদীস নং:৭৪৯)।
মহররম মাসের রোযা
রামাদ্বানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে আশুরার রোযা ফরয ছিল, রামাদ্বানের রোযা ফরয হওয়ার পর আশুরার রোযা রহিত হয়েছে কিন্তু কিয়ামত পর্যন্ত সুন্নাত হিসাবে বাকী থাকবে।
মহররম মাসের ১০ তারিখে রোযা রাখাও তদরূপ বিশেষ সওয়াব। হাদীস শরীফে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘রামাদ্বান মাসের পর সর্বোত্তম রোযা হলো মহররমের রোযা। আর ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো তাহাজ্জুদের নামায ।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬৩)।
হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক প্রশ্নের জবাবে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আশুরার এক দিনের রোযা বিগত এক বছরের গুনাহর কাফফারা হিসাবে গৃহীত হয়।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২)। উল্লেখ্য, আশুরার রোযা রাখার ক্ষেত্রে মহররম মাসের ১০ তারিখের রোযার সঙ্গে আগে বা পরে একটি রোযা মিলিয়ে রাখতে হবে। শুধু ১০ তারিখ রোযা রাখা মাকরূহ। (মুসলিম হাদীস নং:১১৩৪)
শাবান মাসের নফল রোযা
হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাদ্বান শরীফের অভ্যর্থনা অনুসারে প্রায় পূর্ণ শাবান মাসই রোযা রাখতেন, এবং এরশাদ করেছেন শাবানের ১৫ তারিখের রাতে (শবে বরাত) জাগ্রত থেকে ইবাদত কর এবং দিনে রোযা রাখ, কারণ সে রাতে আল্লাহর দরবারে বান্দাগণের বিগত এক বছরের আমল সমূহ পেশ করা হয়। আমার আমলগুলি আমার রোযা রাখা অবস্থায় আল্লাহর দরবারে পেশ হওয়া আমি ভাল বোধ করি। তাছাড়া এক শাবান হতে অন্য শাবান পর্যন্ত যত লোক মারা যাবে, তাদের নাম মৃতগণের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়। হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার রোযা থাকাবস্থায় আমার নাম মৃত গণের তালিকা ভুক্ত হওয়া আমি পছন্দ করি। এ উদ্দেশ্যে প্রায় শাবন মাসই আমি রোযা রাখি।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শাবান মাস ছাড়া অন্য মাসে এত অধিক পরিমাণে নফল রোযা পালন করতে দেখিনি।’ (বুখারি হাদীস নং:১৯৬৯, নাসায়ি হাদীস নং:২৩৫৪)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাস এলে বলতেন, যখন মধ্য শাবান (শবে বরাত) আসবে, তখন তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রোযা রাখো। (বায়হাকি)।
আইয়ামে বিজের নফল রোযা
প্রত্যেক চাঁন্দের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখকে আইয়ামে বিজ (উজ্জ্বল জোস্না প্লাবিত তারিখ গুলো) বলে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং সর্বদা এই তিনটি রোযা রাখতেন । এ তিনটি রোযা আদায় করলে পূর্ণ বছর নফল রোযা আদায়ের সওয়াব লাভের কথা এসেছে। একটি নেক আমলের সওয়াব কমপক্ষে দশগুণ দেয়া হয়। তিন দিনের রোযার সওয়াব দশগুণ করলে ত্রিশ দিন হয়। যেমন আবু কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে প্রত্যেক মাসে তিনটি রোযা ও এক রামাদ্বানের পর পরবর্তী রামাদ্বানে রোযা পালন পূর্ণ বছর রোযা পালনের সমান (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২)। হযরত আবু জর গিফারি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এভাবে বলেছেন : ‘হে আবু জর, যদি তুমি প্রতি মাসে তিন দিন রোযা পালন করতে চাও, তাহলে প্রতি চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে তা পালন করো।’ (তিরমিজি হাদীস নং:৭৬১)। এই রোযাকে সওমে আদম বা আদম (আ.)-এর রোযা বলা হয়। হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম ও মা হাওয়া আলাইহাস সাল্লাম দুনিয়ায় আসার পর প্রথম এই তিনটি রোযা পালন করেন; যার বদৌলতে তাঁরা আগের মতো জান্নাতি রূপ লাবণ্য ও উজ্জ্বল্য ফিরে পান এবং এই দিনগুলোতে চাঁদ পূর্ণ শশীতে পরিণত হয়, রাতভর পূর্ণিমার জ্যোত্স্নালোক বিকিরণ করে বলে এই নামকরণ করা হয়েছে।

সোমবার ও বৃহস্পতিবারের নফল রোযা
হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সোমবার ও বৃহস্পতিবারে রোযা রাখতেন । রাখার কারণ বর্ণনা করেছেন যে, উক্ত দু’দিন মানবের সাপ্তাহিক কার্যাবলী আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আরও বলেন, এ দু’দিনে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাপ্রার্থী মুসলমানগণকে মাফ করে থাকেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কাজেই আমি পছন্দ করি যখন আমার আমল পেশ করা হবে তখন আমি রোযা অবস্থায় থাকব।’ (নাসায়ী হাদীস নং:২৩৫৮ ও তিরমিজি হাদীস নং:৭৪৭।)
হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সোমবারে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন ‘এ দিনে আমার জন্ম হয়েছে এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত দেয়া হয়েছে বা আমার উপর কোরআন নাজিল শুরু হয়েছে’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৬২)।

রামাদ্বান মাসের রোযা ও অন্যান্য রোযার নিয়তের তারতম্য
রোযার জন্য যেমন পানাহার পরিত্যাগ করা ফরয, তেমনি নিয়ত করা ও ফরয, কিন্ত মুখে পড়া ফরয নয়, শুধু মনে মনে চিন্তা করে নিয়ত করে যে, আমি আজ বা আগামীকল্য রোযা রাখব, তাতে রোযা হয়ে যাবে। যদি রাত থেকে রামাদ্বানের রোযার নিয়ত করে তবে ফরয আদায় হয়ে যাবে, এমন কি দিনের দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত রামাদ্বানের রোযা নির্দিষ্ট, মান্নাতের রোযা এবং নফল রোযার নিয়ত করা জাইয আছে। আর কাফফারা এবং অনির্দিষ্ট রোযার নিয়ত সুবহে সাদিক হওয়ার পর জাইয নেই। বরং এর পূর্বেই করতে হবে (মালাবুদ মিনহু, শামী)।
নফল রোযা পালন অবস্থায় যদি অতিথি আপ্যায়ন করাতে হয় বা আপ্যায়ন গ্রহণ করতে হয়, তাহলে নফল রোযা ছেড়ে দেওয়া জাইয আছে এবং পরবর্তী সময়ে এই রোযা কাযা আদায় করা ওয়াজিব হবে।
রোযা রাখার নিষিদ্ধ দিবসসমূহ
সারা বছরে মাত্র পাঁচ দিন রোযা রাখা হারাম। দু’ঈদে দু’দিন এবং বক্বরা ঈদের পরে ১১, ১২, ১৩ ই জিলহজ্ব। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরবানির ঈদের দিন ও রোযার ঈদের দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম হাদীস নং:১১৩৮)। হযরত নুবায়শা হুজালি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আইয়ামে তাশরিক (জিলহজ মাসের ১১ থেকে ১৩ তারিখ) হলো খাওয়া, পান করা ও আল্লাহর নেয়ামতের শুকুর আদায় করার জন্য।’ (মুসলিম হাদীস নং:১১৪১, তিরমিজি হাদীস নং:৭৭৩)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন শুধুমাত্র শুক্রবারকে বিশেষ করে রোযার জন্য খাছ করা ভাল নয়। শুক্রবারে রোযা রাখতে হলে এর পূর্বে বা পরে আরও একদিনের রোযা সংযোগ করবে (মুসলিম হাদীস নং:১১৪৪)।
প্রকাশ থাকে যে, এবাদত সমূহ হতে সামর্থানুযায়ী কিছু পরিমাণ এবাদত স্বীয় অব্যস্ত করে নিলে শয়তান মরদুদ সে ব্যক্তিকে অলসতা, অবহেলা, বা অমনোযোগিতার মধ্যে ফেলে কোনো প্রকার ছুতানাতার আড়ালে তাকে এবাদত হতে বঞ্চিত রাখতে সক্ষম হয় না। এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহর অলীগণ নফল এবাদতের কিছু পরিমাণকে দৈনিক অজিফারূপে নির্দিষ্ট করে নেন, এবং ইহাকে আদায় করা এত জরূরী মনে করেন যেন কোন বিশেষ কারণে সময় মত আদায় করতে না পারলে উহাকে ক্বাজার ন্যায় অন্য সময় আদায় করে নেন। তাহলে শয়তান কর্তৃক অবহেলা, অমনোযোগিতা ও অলসতায় টেনে আনার ছিদ্রপথ বন্ধ থাকবে। যেমন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কারো তাহাজ্জুদ বা রাত্রের কোন অজিফা কোন দিন ছুটে গেলে দ্বি-প্রহরের পূর্বে আদায় করে নিবে।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের নফল রোযা রাখার মাধ্যমে সারা বছর রোযা পালনের সওয়াব হাসিলের দ্বারা ইহকাল ও পরকালে সফলকাম হওয়ার তাওফিক দান করুন। হে করূণাময় আল্লাহ তাআলা! আমাকে ও পাঠকবৃন্দকে বর্ণিত মাসআলা সমূহের উপর আমল করার তৌফিক দান করুন। (আমীন)!

লেখক: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.)।