প্রধান বিচারপতি
জনগণের প্রত্যাশা না বুঝলে বিচার বিভাগের সংস্কার স্থায়ী হবে না
- Update Time : ১০:১৭:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৯৭ Time View
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণের বিচার বিভাগের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা, আর কোথায় তাদের হতাশা, তা না-বুঝে সংস্কারের কোনো রূপরেখাই চিরস্থায়ী হওয়ার কথা নয়। অন্তরে ভয় থাকলে বিচারক হওয়া উচিত নয়। শুনানিকালে কোনো বিশেষ পদধারী ব্যক্তির চাপে ভয় পাওয়া যাবে না। বিচার বিভাগের সুদিনের স্বপ্নে যতই মোহিত হই না কেন, আমরা যেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই।
রবিবার সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে দেশের জেলা আদালতে কর্মরত উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া সমাপনী ও বিদায়ী অভিভাষণে তিনি এ কথা বলেন। ২৭ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি অবসরে যাবেন। অবসরের আগে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এটাই তার সর্বশেষ অভিভাষণ।
প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের সংস্কারের শুরুতেই তাকে নীরবতা ভাঙতে হয়েছিল। তিনি পরবর্তী বিচারপতির সাহায্যের জন্য বিচার বিভাগের নীতিমালা প্রণয়ন করছেন। তিনি বলেন, এ দেশের বিচার বিভাগ কখনও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি।
প্রধান বিচারপতির ড. সমাপনী অভিভাষণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতিবৃন্দ, অ্যাটর্নি জেনারেল, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি, জেলা জজ ও মহানগর দায়রা জজগণ, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটগণ, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কর্মকর্তাবৃন্দ।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধান বিচারপতি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই অভিযাত্রায় আত্মোৎসর্গকারী অমর শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সঙ্গে গণজাগরণের সম্মুখসারিতে দাঁড়ানো ছাত্রসমাজ, সচেতন নাগরিকবৃন্দ, ন্যায় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত প্রতিটি মানুষ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার‐সন্ধানী সকল অংশগ্রহণকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা করেন। তিনি বলেন, এ দেশের মাটি, আকাশ ও মানুষের মুক্ত নিশ্বাসের স্বপ্নে ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে যারা লড়াই করেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ ও অবদান জাতির ইতিহাসে চিরকাল মর্যাদার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুখী ও সুষম রাষ্ট্রের ইচ্ছে নিয়ে যারা বিভিন্ন সংস্কার-প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন, আমি তাঁদের অবদানকে আন্তরিকভাবে স্বীকার করছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বহু বরেণ্য বিচারপতি তাঁদের প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ ও সাহসিকতার মাধ্যমে জাতির ব্যাপক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছিলেন। ইতিহাসের সেই আলোকিত ধারায় তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্থান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ, সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, এ.টি. এম. আফজাল, মোস্তফা কামালসহ অসংখ্য নাম অম্লান হয়ে আছে। আমাদের জেলা আদালতেও বিচারকগণ নৈতিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিচারকার্য সম্পাদনে অবিচল রয়েছেন। তবে একই সঙ্গে এই সত্যও অস্বীকার করা যায় না যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে, বিচার বিভাগ অসাংবিধানিক ক্ষমতা, অপশাসন ও রাষ্ট্রীয় কপট-কৌশলের অঘোষিত সহযোগী হিসেবেও পরিগণিত হয়েছে। দুঃশাসনের বলয়কে আবরণ দিয়েছেন অনেক বিচারক। অন্যায় ও অবিচারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিচারকদের এই নৈতিক বিচ্যুতিও জনসাধারণকে শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার অন্যতম অনুঘটক বলে আমি মনে করি। এই ধারাবাহিকতায় এক চরম ক্রান্তিকালে, ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট আমাকে দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিতে হয়।অস্থিতিশীল সরকার, উত্তেজিত জনতার মুখে পলায়নরত একটি বিচার বিভাগের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হয়।প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্টে ২২ বছরের পথচলায় আমি যে সকল আদর্শে নিজেকে সবসময় বেঁধে রেখেছিলাম, তার কেন্দ্রে ছিল মিতভাষিতার শিষ্ট অনুশীলন। আমি বিশ্বাস করতাম, শব্দের উচ্ছ্বাস নয়, বরং পরিমিত উচ্চারণ ও স্থির সংযমই বিচারকের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করে। তবে, প্রধান বিচারপতির আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাস্তবতা আমাকে নতুন উপলব্ধির মুখোমুখি করেছে।সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনে শুরুতেই নীরবতা ভাঙতে হবে বলে আমার মন আমাকে নির্দেশ করেছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কেবল নিরীহ আহ্বান দিয়ে বিচার ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব নয়। একটা দুর্বৃত্তায়িত রাষ্ট্রের ভিতে সুবিচারের প্রাণ সংযোজন করতে নেতৃত্বকে অগ্রভাগে এসে সত্য উচ্চারণ করার জন্য সেটা ছিল এক অপরিহার্য মুহূর্ত। এই প্রেক্ষাপটেই, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখে আমি সারা দেশের সকল বিচারকদের সমবেত করে বিচার বিভাগের আমূল সংস্কারের জন্য একটি রোডম্যাপ উপস্থাপন করি। বিচারব্যবস্থার প্রশাসনিক জটিলতা, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত অসামর্থ্যের মূল উৎস চিহ্নিত করে, তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ তুলে ধরি। আজ ১৬ মাস অতিক্রান্ত মুহূর্তে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে রোডম্যাপ বাস্তবায়নের মাত্রা মূল্যায়নের সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে আবারও ধন্য মনে করছি। একই সঙ্গে, অব্যাহত যাত্রায় আমার উত্তরসূরি হিসেবে যিনি মহান দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য আজ আপনাদের সামনে আমি ‘বিচার বিভাগীয় নীতিমালা’ উপস্থাপনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করছি।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ‘মাসদার হোসেন’ মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নকে আমি সর্বপ্রথম দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছিলাম। সেই প্রেক্ষিতে আমি সেদিন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলাম, ‘বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা ততদিন পর্যন্ত নিশ্চিত হবে না; যতদিন না বিচার বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে জরুরিভিত্তিতে সুপ্রীম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগকে পৃথক করার তত্ত্ব আমার নিজের কিংবা আমাদের সংবিধান প্রণেতাদের কোনো মৌলিক উদ্ভাবন নয়। প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিকদের নিকট থেকে শুরু করে নব প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশেও এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ সাংবিধানিক নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এরিস্টটল, জন লক ও মন্টেস্কুর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের দেশেও উচ্চ আদালতে বারংবার এই নীতির ব্যবচ্ছেদ হয়েছে। ড. নুরুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ, আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ, সিদ্দিক আহমেদ বনাম বাংলাদেশ, এবং সর্বশেষ মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বনাম বাংলাদেশ- এমন অসংখ্য ঐতিহাসিক রায়ে বিচারপতি ও প্রসিদ্ধ আইনজীবীরা এই তত্ত্বের ভিত্তি, বৈধতা ও সীমারেখা নিরীক্ষণ করেছেন গভীর মনোযোগ সহকারে। সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি থাকার পরেও এ দেশের জনগণ কোনোদিন পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বিচার বিভাগের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি; আমরা অর্জনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও যেন বারবার ফিরে এসেছি অপূর্ণতার প্রাঙ্গণে। আমার সৌভাগ্য, পেশাগত যাত্রার প্রান্তসীমায় এসে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণীত হয়েছে দেখতে পেয়েছি।
তিনি বলেন, পৃথক সচিবালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বে আমরা ইতোমধ্যে ‘সিনিয়র সচিব’ পদে পদায়ন সম্পন্ন করেছি। এর মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো-বিন্যাস তৈরি করে ৪৭২টি পদ সৃজনের প্রস্তাবও প্রেরণ করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু, আপনারা জানেন, বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ বিষয়ে অতীতেও একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সেগুলো স্থায়ী আলোকরেখা স্পর্শ করতে পারেনি। প্রত্যেকটি প্রয়াস রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনের ভেতরে সতর্ক অভিঘাত ও অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষিত সম্পর্কে সচেতন থাকায় শুরু থেকেই আমি বিচ্ছিন্ন কর্মপন্থা পরিহার করতে চেয়েছি বরং সর্বস্তরের অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে পৃথক সচিবালয়ের ধারণাকে জনমানসে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়েছিলাম। সারা দেশের বিচারকবৃন্দ, আইনজীবী সম্প্রদায়, ন্যায়বিচার প্রত্যাশী নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, গবেষক, বিদেশি মিশনের উচ্চপদস্থ কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, আন্তর্জাতিক বিচার নেটওয়ার্ক এবং নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময়, সংলাপ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সংস্কারের আবেদনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছি। আজ এই মুহূর্তে আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে চাই, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমসমূহ, নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক সমাজ, কলাম লেখক, জেলা আদালতের বিচারকবৃন্দ, জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এবং সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণকে যারা এই প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে আমাকে অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করেছেন। সর্বোপরি রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস এবং আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের প্রতি জানাই আন্তরিক ও অকৃত্রিম ধন্যবাদ। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশের জনগণের জন্য আইনের শাসনকে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁদের অবদান জাতি আজীবন স্মরণ রাখবে – সেই কামনা ব্যক্ত করছি।
প্রধান বিচারপতি বলেন, পৃথক সচিবালয়ের কাঠামো নির্মাণকে মূল অক্ষ ধরে বিচার বিভাগ সংস্কারের কর্মসূচিতে আমি তিনটি অতিরিক্ত অগ্রাধিকারকে সামনে এনেছিলাম। সেগুলো হলো, (১) বিচারকদের জীবনমান উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, (২) বিচারিক সক্ষমতা ও পেশাগত দক্ষতার বিকাশ এবং (৩) দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে জবাবদিহিতা ও নৈতিক স্থিতি সুদৃঢ় করা। অতএব, দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই আমি বিচার বিভাগের প্রতিটি স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করে পর্যায়ক্রমে সংলাপের সূত্রপাত করি। বিভাগীয় শহরসমূহে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক মতবিনিময় সভায় জেলা আদালতের বিচারকদের সাথে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে আমি আপনাদের আবাসন সুবিধার তীব্র সংকট এবং পরিবহন ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছি। এই বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল বলে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থেকেও আমি আইন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবর ধারাবাহিকভাবে পত্র প্রেরণের মাধ্যমে বিষয়গুলোর জরুরি নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছি। ফলে, প্রথমবারের মতো ”বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের সুদমুক্ত ঋণ ও গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা, ২০২৪” প্রণীত হয়েছে। এর পাশাপাশি, বিচারকদের আবাসিক, দাপ্তরিক ও যাতায়াতকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক অনুস্মারক এবং নীতিগত মতামত প্রেরণ করেছি।
বিদায়ী অভিভাষণে তিনি বলেন, আমি নিঃসংকোচে স্বীকার করি যে, বিচারকদের জন্য উপযোগী কর্মপরিবেশ ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে আমাদের এখনও একটি দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হবে। এই ক্ষেত্রটিতে আমার উত্তরসূরির বিশেষ মনোযোগ ও অগ্রাধিকারমূলক বিবেচনা প্রত্যাশা করছি। রাষ্ট্রের আর্থিক সামর্থ্য এখানে কোনো অন্তরায় নয় বলে আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি। প্রয়োজন কেবল আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর। নাগরিকের সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ-উন্নয়নে বিচারকদের অবদানকে যথার্থ মর্যাদায় উপলব্ধি করা দরকার। এই প্রয়াসে আমাদের অগ্রগতির পথে এতদিন যে বাধাটি বিদ্যমান ছিল, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়নের মাধ্যমে তা দূরীভূত হয়েছে। অধ্যাদেশের ধারা ০৮-এ অধস্তন আদালত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়–সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন ও কারিগরি প্রকল্পসমূহ চূড়ান্ত নিরীক্ষা ও সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে একটি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। ইতোমধ্যে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের সভাপতিত্বে ৮ (আট) সদস্যবিশিষ্ট সেই কমিটি আমি গঠন করে দিয়েছি। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৫০ (পঞ্চাশ) কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদনের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির নিকট এককভাবে ন্যস্ত রয়েছে। আমি কমিটির বর্তমান সভাপতি এবং আমার উত্তরসূরীকে অনুরোধ জানাবো, দ্রুততম সময়ে সারা দেশের সকল বিচারকের এজলাস–সংকট নিরসন, আধুনিক খাসকামরা নির্মাণ, সহায়ক কর্মচারীদের জন্য যথোপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং বিচার-প্রার্থী জনগণের জন্য আদালতে অবাধ বিচরণ ও বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রকল্পসমূহ গ্রহণ করা হোক। কৃচ্ছসাধনের নামে বিচারকদের দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত করে রাখার পুরনো নীতি পরিত্যাগ করতে হবে। I am tired of hearing that the life of a judge islike a hermit. Let me be clear: this adage cannot mean that a judge should be expected to discharge his duties from an abandoned or dilapidated building. একটি সুসজ্জিত আদালতের পরিবেশ কেবল বিচারকদের ব্যক্তিগত আয়েশ ও অনুভূতির বিষয় নয়; এটি বিচারপ্রার্থী জনগণের মনে বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা সঞ্চার করে। সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থা এবংপ্রতিপক্ষ প্রতিষ্টানসমূহের নিকট বিচার বিভাগের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও তা অত্যাবশ্যক। একই সাথে বিচারকগণের আবাসন সংকট নিরসনের একটি স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত বদলীর বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সম্পূর্ণ সুসজ্জিত বাসগৃহ নির্মাণ করতে হবে। বিচারকদের বোধ, ভারসাম্য, নৈতিকতা বজায় রাখতে সুসাস্থ্যকর পরিবেশ থাকা জরুরি। বিচারক যদি নিজেকে আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি এবং সুস্থ জীবনচর্চায় প্রতিষ্ঠিত করতে না পারেন, তবে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও ন্যায়বোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
বিচারকদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনাদের উন্নত জীবনমান ও কর্মপরিবেশের প্রতি প্রত্যাশা কখনোই ব্যক্তিগত ভোগ, আত্মতুষ্টি কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্য হতে পারে না। এর অন্তরে থাকতে হবে বিচারিক সক্ষমতা উন্নয়ন, জ্ঞানচর্চার সম্প্রসারণ এবং উচ্চমানের কর্মদক্ষতা অর্জনের সৎ প্রেরণা। এটি অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ–সংস্কৃতি এখনও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য আমরা এখনো একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি।তবে বিদ্যমান সুযোগের ন্যূনতম সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিচারকদের বড় অংশের অনীহা ও কার্পণ্য পরিলক্ষিত হয়। অতএব, আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, জ্ঞানঅর্জন ও পাঠাভ্যাসকে যেন আপনারা জীবনের পরম দায় হিসেবে গ্রহণ করেন। অধ্যয়ন, গবেষণা ও বিচারচর্চার অভিজ্ঞতা–উন্নয়নে নিজেকে সর্বক্ষণ নিয়োজিত রাখুন। কেবল কর্মসম্পাদন নয়, বরং কর্মের উৎকর্ষ–অন্বেষাই হোক আমাদের সকল প্রচেষ্টার প্রাথমিক ভিত্তি। প্রথাগত পড়াশোনার বাইরে এসে আমি আপনাদেরকে সমাজ, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার জগতে জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করতে অনুরোধ করি। সেই সাথে আধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞানের বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ শাখা যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশ-বিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা এসবেও নিজেদের বিচরণ বৃদ্ধি করুন। কেননা, একজন বিচারক হিসেবে আমরা কখনও নিশ্চিত থাকতে পারি না, মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক কোন ঘটনা নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হবে এবং কখন সেটি আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবে? জীবনযাত্রার কোন স্তর থেকে, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে, অভূতপূর্ব সব প্রশ্ন আদালতের দ্বারস্থ হবে এবং আমাদের বিচারবোধ ও বিচক্ষণতাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করবে? সব রকমের জ্ঞানও সমাজের প্রতিটি স্পন্দন যেমন আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রায় লিখনে প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি বিচারকদের অনেক অভিমতই রাষ্ট্র ও ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণেও অসামান্য ভূমিকা রাখে। এই কারণে, আপনাদের প্রতি আমার আন্তরিক আহ্বান, ধ্রুপদী সাহিত্য, দার্শনিক তত্ত্ব ও আইনের ইতিহাসে গভীরভাবে অবগাহন করুন। লর্ডডেনিং মূলত একজন গণিতের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু, সাহিত্য পাঠই তার অসাধারণ আইনি প্রজ্ঞা তৈরিতে সহায়তা করেছে বলে তিনি নিজেই মন্তব্য করেছেন। আমিও আপনাদেরকে অনুরোধ করব, আপনারা যেন চিন্তায় উদার, বোধে সমৃদ্ধ এবং দৃষ্টিতে সুদূরপ্রসারী একেকজন বিচারক হয়ে উঠতে পারেন। তা না করতে পারলে আমাদের অবস্থা দাঁড়াবে সেইসব মানুষের সারিতে, যারা অধিকারের প্রশ্নে পূর্ণ প্রাপ্তি প্রত্যাশা করে, অথচ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিরাগ ও অস্বস্তি প্রকাশ করেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের “আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা” বইয়ের একটি উক্তি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য, “আমরা আমাদের অধিকার ষোল-আনা আদায় করতে চাই, বিনিময়ে আমরা কর্তব্যের কথা বেমালুম ভুলে যাই। নিজের অধিকার নিয়ে বাড়াবাড়ি করি, অপরের অধিকারের ওপর চড়াও হই।”প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারকদের দক্ষতা ও বৌদ্ধিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে সহায়তা প্রদানের জন্য আমি ‘প্রধান বিচারপতি স্কলারশিপ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলাম। তবে সরকারি অর্থ বরাদ্দ, ব্যয় নির্বাহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রটি সচিবালয় অধ্যাদেশপ্রণয়নের আগ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক কর্তৃত্বের আওতাধীন ছিল না। সে কারণে, অল্প সময়ে এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন সম্ভব হয়নি। আমার বিশ্বাস, পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতার যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তার মধ্যদিয়েই আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে। আমি আমার উত্তরসূরী প্রধান বিচারপতির নিকট বিনীতভাবে কামনা করছি, জেলা আদালতের বিচারকদের দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক ফেলোশিপ গ্রহণের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন প্রদান ও সক্রিয় উৎসাহ প্রদর্শনে তিনি উদারতা প্রদর্শন করবেন।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে, বিচারক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার কাজের পবিত্রতা ও বিচারকদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার অজুহাতে আমরানিজেদের কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে অনাগ্রহ দেখাই। কিন্তু, বিগত কয়েক দশক ধরে, এইদর্শনের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। কেননা পবিত্রতার এই পর্দা আমাদেরকে সকল জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থাকার একটি মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আসছে। সে কারণে, বিখ্যাত ব্রিটিশ ব্যারিস্টার David Pannick তার “Judges” নামক একটি বইয়ে বলেছিলেন, “Judicial independence was not designed, and should not be allowed to become, a shield for judicial misbehavior or incompetence or a barrier to examination of complaints about injudicious conduct.”
আর উইন্স্টন চার্চিল হাউজ অব কমন্সের এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, “The courts hold justly high and unequalled pre-eminence in the respect of the world. No doubt they deserve and command the respect and admiration of all classes of the community. [But] We need judges who are trained for the job, whose conduct can be freely criticized and is subject to investigation by a judicial performance commission. Judges [should] welcome rather than shun publicity for their activities.”
এই উপলব্ধি থেকেই দায়িত্ব গ্রহণের পর-পরই আমি সর্বপ্রথম সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য ১২ দফা আচরণ–দিকনির্দেশনা জারি করি, যা পরবর্তীতে সারা দেশে বিস্তৃত হয়। এর লক্ষ্য ছিল, বিচার বিভাগের প্রতিটি স্তরে সেবাভিত্তিক মনোভাব এবং জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া বিচারপ্রার্থী জনগণের সঙ্গে আদালতের দূরত্ব আরও কমিয়ে আনতে আমি দুটি সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন চালু করি। এখন সরাসরি প্রধান বিচারপতির দপ্তরে জনগণের অভিযোগ, জিজ্ঞাসা ও প্রতিক্রিয়া পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আপনারা জানলে আনন্দিত হবেন যে, বিগত ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট মূল ভবনে আমি একটি আধুনিক, প্রযুক্তিসম্পন্ন ও সুসজ্জিত কল সেন্টার উদ্বোধন করেছি। এই কল সেন্টারের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি আদালত ও বিচারকের কার্যক্রম এখন নাগরিকের প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারকদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অবারিত সুযোগের অন্যতম অনুঘটক ছিল বদলী ও পদায়ন সংক্রান্ত সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকা। এই অনুপস্থিতির প্রতিবিধান করতে আমরা বিচারকদের জন্য বদলী ও পদায়ন নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছি। কিন্তু, বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কাজে রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রয়োজনীয় সকল কাজ এখনও নির্বাহী কর্তৃপক্ষের দ্বারা পরিচালিত হয় বলে, এই নীতিমালা আলোর মুখে দেখেনি। কিন্ত, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ধারা ৭ যথাযথভাবে কার্যকর করে পরবর্তী গেজেট প্রজ্ঞাপন যখনই প্রকাশিত হবে, তার সাথে সাথে বিচারকদের বদলী ও পদায়ন সম্পৃক্ত বঞ্চনা ও বৈষম্য অনেকাংশেই লাঘব হবে বলে আমি মনে করি।
বিদায় অভিভাষণে তিনি বলেন, রোডম্যাপ ঘোষণার সময় আমি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলাম যে, বিচার বিভাগে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধাই হবে একমাত্র নির্ণায়ক মানদণ্ড। আমাদের ক্ষীয়মান বিচার বিভাগ নিয়ে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞ আইনজীবী ও বরেণ্য বিচারপতিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। প্রখ্যাত আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তার এক সুপরিচিত গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছিলেন,
“There are a small number of competent judges and very few of them take pride in their work. Their integrity and honesty are being questioned. The confidence in the administration of justice that the people have had is in the wane. The output of a judge has severely come down. The members of the bar are no longer well-equipped with the law and particularly the relevant laws bearing on the case and precision in their submission is lacking. The honesty and integrity amongst the lawyers is in the lowest level.”
বিচার ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ এই কঠোর বাস্তবতা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। সেই উপলব্ধি থেকেই “সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫” প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করি। অধ্যাদেশের ধারা ৬(২)-তে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে সাংবিধানিক যোগ্যতার পাশাপাশি যে সম্পূরক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে তা হলো –
(ক) প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণ;
(খ) আইনের নির্দিষ্ট কোনো শাখায় বিশেষ জ্ঞান ও পারদর্শিতা;
(গ) প্রার্থীর সামগ্রিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সততা, সুনাম, নৈতিকতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক মূল্যবোধ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিনিয়োগের এই নতুন বন্দোবস্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রূপ পেয়েছে এবং আমাদের জনগণের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপস্থিত বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে আমার প্রথম অভিভাষণে আমি বিচার বিভাগের বড় সমস্যা হিসেবে মামলাজট নিয়ে আলোকপাত করেছিলাম। অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক লোকবল ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো স্বত্বেও আমাদের বিচারগণ যে পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি করেন তা আমার কাছে সবসময় অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। কিন্তু, তাতে বিচারের মান নিয়ে কিছু প্রশ্ন দেখা দেয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সে কারণে, নিষ্পত্তির পরিমাণ ও কাজের গুণগতমান উভয় রক্ষার জন্য আমি শুরুতেই বিচারিক পদসৃজনের উদ্যোগ গ্রহণ করি। সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের একজন জেষ্ঠ বিচারপতির সভাপতিত্বে ”পদসৃজন কমিটি” সংক্রান্ত আইন বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা ২০২৫ প্রণয়নের জন্য আমি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানাতে চাই। উক্ত বিধিমালার আলোকে সর্বশেষ২ ৩২-টি জেলা জজ পদমর্যাদার পদ সৃজিত হওয়ায় বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে একসাথে ৮২৬ জন বিচারক পদোন্নতি লাভ করেছেন। সেই সাথে আমি আশা রাখি, খুব শীঘ্রই আমাদের প্রস্তাবিত কমার্শিয়াল কোর্ট অধ্যাদেশে’র আলোকে আরও প্রায় ৭০টি বিচারিক পদ সৃষ্টি হবে এবং বিচারকের সংখ্যার অনুপাতে মামলার পরিমাণ কমাতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, এতক্ষণ আমি বিচার বিভাগীয় সংস্কার বিষয়ে আমার সময়ে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের কথা বলেছি। এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত সাফল্য দাবি করা আমার উদ্দেশ্যে নয়। বরং এই প্রয়াসের মূল অনুপ্রেরণা হলেন এ দেশের সাধারণ মানুষ। তাদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্যই আমি আজকে সবাইকে আবারো সমবেত করেছি। যদি এর ফলস্বরূপ আপনাদের জন্য কোনো কিছু অর্জিত হয়ে থাকে, তবে তা কেবল আমার একার কৃতিত্ব নয়; বরং আমি গভীরভাবে ঋণী সেই পূর্বসূরিদের কাছে যারা তাঁদের প্রবন্ধ, বক্তৃতা, গবেষণা এবং যুগান্তকারী বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন; আমাদের চিন্তা ও কর্মের দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। একইভাবে, আমি আমার পরবর্তীদের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার প্রতি নিঃসংশয়ে গভীর আস্থা রাখি; তবু একটি সুন্দর ভবিষ্যত-যাত্রার জন্য আরও কয়েকটি দিকনির্দেশনা প্রদান করাকে আমি আমার দায়িত্বের অংশ মনে করি।
প্রধান বিচারপতি বলেন সর্বপ্রথম পৃথক সচিবালয়কে বাস্তবিক অর্থে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও ফলপ্রসূ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করাই হবে এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই পথযাত্রার ধারাবাহিকতা অটুট রাখা, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং প্রতিষ্ঠানের গতিময়তাকে আরও ত্বরান্বিত করার গুরুদায়টি এখন আমার উত্তরসূরি প্রধান বিচারপতির কাঁধে ন্যস্ত হবে। আমি বিশ্বাস করি, তাঁর নেতৃত্বে পৃথক সচিবালয় কেবল একটি আইনি-কাঠামো হয়ে থাকবে না; বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, পৃথক সচিবালয় এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে এ দেশের আপামর জনসাধারণের সাংবিধানিক সকল অধিকার সুরক্ষিত করার প্রধান নিয়ন্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অসৎ ও অসাধু বিচারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচারকদের দ্বারা সৃষ্ট যাবতীয় অন্যায়ের জন্য এখন থেকে অন্যের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ বন্ধ করতে হবে। জনগণের জন্য সংক্ষিপ্ত সময়ে সুবিচার নিশ্চিত করতে শতভাগ দায়িত্ব পালন করতে হবে। পছন্দসই পদায়নের জন্য রাজনৈতিক পদলেহন পরিহার করতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আইন বৃহত্তর রাজনীতির একটা অঙ্গ হলেও, বিচারকদেরকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠার প্রয়াস রপ্ত করতে হয়। কেবল ক্ষমতাবান শাসক শ্রেণির পক্ষে প্রয়োজনীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব নিলে বিচার বিভাগের আলাদা কোনো অস্তিত্বেরই প্রয়োজন নেই। সে কাজের জন্য নির্বাহী বিভাগ ও পুলিশই যথেষ্ট। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি যে আদর্শকে ধারণ করেই গড়ে উঠুক না কেন, বিচারকদেরকে সুনীতি ও সুবিবেচনা বজায় রেখে কাজ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিচারকদের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। আমরা এই মেয়াদে মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার সুপ্রিকোর্টের সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি এবং নেপালসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথেও একই রকম উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন আছে। আমার পরবর্তী প্রশাসনের দায়িত্ব হবে উক্ত চুক্তিগুলোর আলোকে সহযোগিতা আদান-প্রদান, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠান সূচনা করা। সুষ্ঠু মামলা ব্যবস্থাপনার জন্য ই-কজলিস্ট ব্যাবস্থাকে ব্যাপক পরিসরে জনপ্রিয় করা দরকার। নেপালের বিচার বিভাগের আদলে Differentiated Case Management প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। ভার্চুয়াল শুনানি ও পেপার-ফ্রি আদালত গড়ে তোলার জন্য উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করে দীর্ঘমেয়াদে সেখানে জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যসহ অন্যান্য লোকবল নিয়োগ করতেহবে।
তৃতীয়ত, জুডিসিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের পরিচালনা পর্ষদের প্রতি আমার অনুরোধ, ন্যাশনাল জুডিসিয়াল একাডেমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এখন থেকেই সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা প্রণয়ন করুন। বর্তমান প্রশিক্ষণ মডিউলগুলোকে সময়োপযোগী ও আধুনিকায়ন করতেহবে। তাত্ত্বিক লেকচারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে। বিচারকগণ যেন একটি মামলার আড়ালে নিহিত বাস্তবতা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেন, বিচার্য বিষয়সমূহকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক ও চিহ্নিত করতে সক্ষম হন, প্রমাণ ও আইনের মধ্যে যুক্তিসংগত সেতুবন্ধন রচনা করার দক্ষতা অর্জন করেন এবং প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্যসমূহ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন- সে লক্ষ্যে কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনুসন্ধান ও প্রণয়ন করা আবশ্যক। দেশের বরেণ্য আইনজীবী, আইনের প্রথিতযশা শিক্ষক এবং পরিপার্শ্বিক ও আন্তঃবিষয়ক জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য। বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে ‘কেবল প্রবীণ বিচারকরাই নবীনদের প্রশিক্ষণ দেবেন’ – এই সংকীর্ণ ও আত্মবদ্ধ রেওয়াজ ভাঙতে ব্যর্থ হলে, শেষ পর্যন্ত এর নেতিবাচক পরিণতি আপনাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। একইভাবে, জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের প্রতি আমার অনুরোধ, নিয়োগ পরীক্ষার সিলেবাসের কাঠামোগত দুর্বলতা সুপরিসরে পর্যালোচনা করা হোক। বিদ্যমান এক হাজার নম্বরের মধ্যে কোন কোন বিষয় একজন বিচারকের মেধা, মনন ও বিচারবোধ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবিক অর্থে অনাবশ্যক, তা চিহ্নিত করা জরুরি। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী এবং দেশীয় ও বিদেশি ডিগ্রিধারীদের জন্য ন্যায়সংগত সমতা নিশ্চিত করার বিষয়েও বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাস্ট, ইক্যুইটি, টর্ট ও জুরিসপ্রুডেন্সের মতো আইনের উচ্চতর ও তাত্ত্বিক শাখাগুলোকে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর সততা, বিশ্লেষণ-ক্ষমতা, বিচক্ষণতা ও ব্যক্তিত্ব যথাযথভাবে যাচাইয়ের জন্য সুস্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড প্রণয়ন করতে হবে। যে কোনো মূল্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সকল ধরনের বিদ্বেষপ্রসূত আচরণ কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, জেলা আদালতের বিচারকগণের পদোন্নতি এখনও মূলত ব্যাচভিত্তিক বিবেচনায় পরিচালিত হয় – এই বাস্তবতা আজও আমার কাছে এক বিস্ময় হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। বহু বছর পূর্বে নিয়োগ পরীক্ষায় অর্জিত নম্বরই যেন পুরো কর্মজীবনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে- বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন কিংবা দায়িত্ব পালনকালে প্রদর্শিত কর্মদক্ষতার গুণগত ও পরিমাণগত মূল্যায়নের প্রাসঙ্গিকতা তাহলে কোথায়? আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদে মামলাজট হ্রাস করতে সত্যিকার অর্থে অগ্রগতি অর্জন করতে চাই, তবে বিচারকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভাগীয় পরীক্ষা ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নকে অপরিহার্য মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার পথেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। সর্বক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠন করতে হলে এই সত্য স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অতএব, যুগ্ম জেলা জজ হতে তদুর্ধ্ব ক্ষেত্রে পদোন্নতির জন্য “সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড” গঠন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে জেলা জজ ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের উদ্দেশ্যে একটি ‘ফিট লিস্ট’ প্রণয়নের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন সহজতর হবে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মুস্তফা কামালের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বিচারকদের উদ্দ্যেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘একবার তিনি বলেছিলেন, “অন্তরে কোনো ধরনের ভয় থাকলে বিচারক হওয়া উচিত নয়।” শুনানিকালে কোনো বিশেষ পদবিধারী ব্যক্তি বা ক্ষমতাবান পক্ষকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া বিচারকের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়। একই সঙ্গে এটিও স্মরণ রাখতে হবে – বিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে আচরণে কোনো ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করা যাবে না; আদালতের মর্যাদার প্রতি কোনো একজন আইনজীবীর অসংবেদনশীল আচরণের কারণে সমগ্র আইনজীবী সমিতি কিংবা তার মক্কেলের প্রতি বিরাগপূর্ণ মনোভাব পোষণ করা বিচারকের নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। Because, to be a judge is to uphold justice not only for the righteous, but even for those who are unjust to you. A judge must not allow the ignorance or ill manners of lawyers to personally agitate or influence him. তাই সবাইকে আমি অনুরোধ করবো, স্বাধীন সচিবালয়কে কার্যকর ও টেকসই করতে দেশের সকল বার সমিতির সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন করুন। এ লক্ষ্যে বিচারপ্রার্থী জনগণ, সংশ্লিষ্ট আইনজীবীবৃন্দ ও অন্যান্য সহযোগীদের অংশগ্রহণে নিয়মিত গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সেবা-গ্রহীতাদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত প্রতিকারের জন্য একটি কার্যকর Grievance Redress System প্রবর্তন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সময় স্বল্পতার কারণে আমি জেলা আদালতের বিচারকরদের একটি বিশেষ চাহিদার প্রতি মনোনিবেশ করতে পারিনি। আমি অনুরোধ করবো, আমার স্থলাভিষিক্ত প্রধান বিচারপতি জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের জন্য একটি উন্নত চিকিৎসা-ব্যবস্থা চালুর রূপরেখা অনুসন্ধান করবেন। যাতে করে বিচারকরা নিয়মিত রোগ পরিচর্যা ও জরুরি চিকিৎসা গ্রহণকালে আধুনিক সেবা পেতে পারেন। এই ব্যাপারে পরবর্তী পে-স্কেলে বিচারকদের জন্য বীমা সুবিধা সংযোজন করাযেতে পারে। কেননা, প্রায়শই বিচারকদের চিকিৎসার জন্যখুব অমর্যাদাকর উপায়ে তাৎক্ষণিক তহবিল সংগ্রহ করতে দেখা যায়। চলমান পে কমিশনকে আমি অনুরোধ করবো, যৌক্তিক হারে জুডিসিয়াল ভাতা, ঝুঁকি ভাতা নির্ধারণকরার পাশাপাশি বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বার্ষিক “Book Allowance” চালু করা হোক।
বিচারকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উন্নয়ন ছাড়া বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবেশ কখনো পূর্ণতা পেতে পারে না। যেমন একটি পেশাদার সেনাবাহিনী কেবল দক্ষ সেনা কর্মকর্তাদের জন্য বিজয়ী হয় না; প্রয়োজন হয় প্রশিক্ষিত সৈনিকের, তেমনি আদালতেরবেঞ্চ-সহকারী, সেরেস্তাদার, স্টেনোগ্রাফারসহ প্রতিটি সহায়ক কর্মীর মানোন্নয়ন বিচারব্যবস্থার স্থিতি ও সুশৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য। আপনারা তাঁদের প্রতি সদয়, মানবিক ও নেতৃত্বশীল আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, এটাই আমার প্রত্যাশা। আপনার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সদ্ভাব, ভাষার মাধুর্য ও আচরণের শালীনতা তাঁদের কর্মস্পৃহা জাগ্রত করবে। মনে রাখবেন, বিচারকের সুনাম তখনই পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তাঁর অধীনস্ত কর্মীবাহিনীও নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও দক্ষতায় উন্নীত হয়ে সমগ্র প্রতিষ্ঠানকে এক সুসংহত মর্যাদায় উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়। একতরফা উৎকর্ষ কখনো প্রাতিষ্ঠানিক মানের প্রতীক হতে পারে না। এ কারণে, আদালতের সহায়কক র্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালা সুপ্রিম কোর্টস চিবালয়ের অধীনে নতুন করে প্রণয়ন করতে হবে। তাদের যোগ্যতার মানদন্ড ঠিক করতে নথি ব্যবস্থাপনা, নৈমিত্তিক ও করণিক কাজে আইনের যে নূনতম জ্ঞানপ্রয়োজন সেগুলো সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পরবর্তী প্রশিক্ষণ অপরিহার্য করতে হবে। জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে যে কেন্দ্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থা চালুহয়েছে তা এক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে বলে আমি আশা রাখি। ভবিষ্যতের ব্যাপারে সমস্ত আশা অক্ষুণ্ণ রেখেও আমি একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে চাই। বিচার বিভাগের সুদিনের অপেক্ষায় আমরা যতই বিমোহিত হই না কেন, আমাদের এর অতীত ইতিহাস সম্পর্কে বিস্মৃত হলে চলবে না। আপনারা জানেন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফায় বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করার কথা উল্লেখ ছিল। ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখায়ও পৃথককরণের একই প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়। আরও অবাক করা ব্যাপার, ১৮৩৬ সালে লর্ডঅকল্যান্ড একটি প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি গঠণ করলেসেই কমিটির সদস্য ফ্রেডরিক হ্যালিডে মন্তব্য করেছিলেন এই বলে, “যে চোর ধরে এবং যে বিচার করে- উভয়ের একত্রে অবস্থান তত্ত্বের দিক থেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কাজের দিক থেকে আরও বেশি অনিষ্টকর।” কিন্তু, পরেসেই একই ব্যাক্তি বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হয়ে পৃথককরণের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যান। উপস্থিত সকলকে আমি ইতিহাসের এ রকম আত্মপ্রতারণার ব্যাপারে সতর্ক করে দিতে চাই। আমরা যেন ফ্রেডরিক হ্যালিডের মতো আত্মহন্তারক হয়ে না উঠি।
সমাপনী ভাষণের শেষ দিকে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি চাই, আপনারা নৈতিক বল ও জ্ঞান অর্জনের দ্বারা মানুষের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠার চেষ্টা করুন। কেননা, যোগ্যতার ঘাটতি ও মনের সংকীর্ণতা নিয়ে আপনিন নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার অন্যায্য কর্তৃত্বের মোকাবেলা করতে পারবেন না। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরতার একটি প্রবন্ধে বলেছিলেন” শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতে না পারিলে সুবিচার আকর্ষণ করা কঠিন”। আর সাধারণ জনগণকে আপনাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি বানাতে চাইলে কাজের দ্বারা তাদের সাথে দূরত্ব ঘোচাতে চেষ্টা করুন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে চাই “জনগণের সাথে সম্বন্ধ করতে হলে তাদের আত্মীয় হতে হবে। তারা আত্মীয়ের গালি সহ্য করতে পারে, কিন্তু অনাত্মীয়ের মধুর বুলিকে গ্রাহ্য করে না।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের বিচার বিভাগের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা, আর কোথায় তাদের হতাশা, তা না-বুঝে সংস্কারের কোনো রূপরেখাই চিরস্থায়ী হওয়ার কথা নয়। পরিশেষে, এই মূহুর্তে আমার অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য আমি ভারতের বিচারপতি V R Krishna Ayer এর The Majesty of the Judiciary শীর্ষক একটি প্রবন্ধের শরণাপন্ন হতে চাই। ”Judiciary is the most sublime instrumentality in the country and I have served it for [for more than two] decades during the best part of my life. Judicature has status and commands the reverence of the people which is a great tribute to this national institution. Necessarily judges have the highest duty to the people of administering justice, based on fearless truth, moral rectitude and negation of addiction for power and lucre.”
বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ারের মতের সাথে মিলিয়ে আমিও আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমাদের এই পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কোনো স্বার্থকতা নেই, যদি না আমরা ব্যক্তিগত অসততার ব্যপারে সতর্ক থাকি। একটি স্বাধীন সচিবালয় কেবল শুরু, সর্বশেষ উদ্দেশ্য নয়। আপনাদের উচিত সততা আর যোগ্যতার ব্যপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হওয়া। অনুপার্জিত অর্থের বাসনা, অন্যায্য বিলাসী জীবন এবং অসংগত ক্ষমতার প্রতিপত্তি যদি আমাদের মনকে কলুষিত করে রাখে, তাহলে পৃথিবীর কোনো আইনি বিধানই আমাদের সামষ্টিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরতে পারবে না।
বিচারকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমি দীর্ঘ দেড় বছর ধরে নিরন্তর সংগ্রাম করেছি এ দেশের জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় বিচার বিভাগের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করার জন্য। কিন্তু, আমার বিদায়ের পর বিচার বিভাগের সংস্কারের উদ্দেশ্যে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের ভবিষ্যত কী হবে, তার উপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই পদক্ষেপগুলোর স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আপনাদের নীতি ও দায়িত্ববোধের উপর।
সমাপনী অভিভাষণে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধান বিচারপতি ড. রেফাত আহমেদ গত বছর ১১ আগস্ট ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর বিচার বিভাগের সংস্কারের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেন ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াডাম কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে আইন শাস্ত্রের ডিগ্রি পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময় মাস্টার্স ও পিএইচডি করেন যুক্তরাষ্ট্রের টাফ্টস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসিতে। সৈয়দ রেফাত আহমেদ অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে কাজ করেছেন।
সৈয়দ রেফাত আহমেদ ১৯৮৪ সালে ঢাকা জেলা আদালতে এবং ১৯৮৬ সালে হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হন। ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক হন। এর দুই বছর পর তিনি হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হন।
ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বাংলাদেশের প্রথিতযশা আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ ও ড. সুফিয়া আহমেদের ছেলে। ইশতিয়াক আহমেদ দুই বার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সৈয়দ রেফাত আহমেদের মা ভাষা সৈনিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ড. সুফিয়া আহমেদ বাংলাদেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন।























































































































































