ঢাকা ০৩:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ
নোয়াখালীতে নকল ক্যাবল বিক্রির দায়ে জরিমানা কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাওয়ায় ইবি শিক্ষার্থীকে বেধরক মারধর  পিবিআই এর দুই কর্মকর্তার বদলী জনিত বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত মোটরসাইকেল নিয়ে বিরোধ: নোয়াখালীতে বসতঘরে ঢুকে যুবককে গুলি করে হত্যা ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগরে সওজের জায়গায় অবৈধ দখলে থাকা দোকানপাট উচ্ছেদ দুই বঙ্গকন্যা ব্রিটিশ মন্ত্রীসভায় স্থান পাওয়ায় বঙ্গবন্ধু লেখক-সাংবাদিক ফোরামের আনন্দ সভা নতুন আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণে খুশী গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষ গ্যাস সংকটে চার মাস ধরে শাহজালাল সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ সুবর্ণচরে বৃদ্ধকে জবাই করে হত্যা, গ্রেপ্তার ৩ নোয়াখালীতে নৈশ প্রহরীকে উলঙ্গ করে বেঁধে ১১ দোকানে ডাকাতি
"চিচিং ফাঁক"

একের পর এক বেরিয়ে আসছে দুর্নীতিবাজদের রত্ন ভান্ডার

মোহাম্মদ মোশাররাফ হোছাইন খান
  • Update Time : ০৬:৩৪:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই ২০২৪
  • / ৩৩ Time View

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়া এক ছাগলে পরশ পাথর তুল্য দূর্নীতির মহারাজ এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের প্রাসাদ চুরমার হয়ে “চিচিং ফাক”।

একের পর এক বেরিয়ে আসছে এনবিআর, সেবা দানকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্মকর্তাদের রত্ন ভান্ডার। একেক জনের রত্ন ভান্ডার একেকজনের চেয়ে সমৃদ্ধ। আরব্য রজনীর “আলী বাবা” গল্পের ডাকাত সর্দার যেন এর কাছে নস্যি।
এনবিআর ও সেবা দানকারী সরকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সুরক্ষিত পর্বত দূর্গে রক্ষিত সুসজ্জিত রত্ন ভান্ডার। সরকারি চাকুরীতে যোগদান করতে পারলেই যেন সংরক্ষিত দুর্গের রক্ষিত সম্পদ একেকজনের হাতের মুঠোয়। সরকারি একটি চাকুরী যেন ভাগ্য পরিবর্তনকারী চিচিং ফাঁক। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বড় কোন পদে বসতে পারলেতো কথাই নেই। অপরাপর সেবা প্রদানকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের বাস্তবতা একই রূপ।

জাতীয় সংসদে এই বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। গত শনিবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদের অর্থবিলের ওপর সংশোধনীর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৯০ শতাংশ দুর্নীতিতে জড়িত। কাস্টমসে যারা চাকরি করেন তাদের প্রত্যেকের ঢাকা শহরে দুইটা-তিনটা বাড়ি। বন বিভাগে যারা চাকরি করেন তাদের দুইটা-তিনটা করে সোনার দোকান। প্রধানমন্ত্রী যদি পদক্ষেপ নেন তাহলে দুর্নীতি রোধ করতে পারবেন। না হলে যে হারে লাগামহীনভাবে বড় বড় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি করছেন, আমরা কী করব? আমরা অসহায়। অনেক সরকারি কর্মকর্তা আছেন তারাও অসহায়। কারণ, এখানে ৯০ শতাংশ লোকই ওইদিকে (দুর্নীতি), ১০-১৫ শতাংশ লোক ভালো থেকে কী করবে?

সাংসদ হাফিজ উদ্দীনের এ বক্তব্যের বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, দেশের মূল ধারা থেকে ছোট খাটো সকল গনমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও শহর গ্রামের চায়ের টং দোকান থেকে থেকে সর্বস্তরে মানুষের মুখে মুখে মুখোরোচক আলোচনায়।

এ আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে সরকারী কর্মকর্তাদের অপরাধ – দূর্নীতির চালচিত্র। আলোচনায় সবার শীর্ষে রয়েছে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজির আহমদ, এনবিআরের কর্মকর্তা মতিউর রহমান, কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালসহ বাঘা বাঘা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নাম। দেশের সর্বস্তরের মানুষের এ আলোচনায় প্রতিনিয়তই যুক্ত হচ্ছে নিত্য নতুন একেকজনের নাম। জনসম্মুখে প্রকাশিত হচ্ছে তাদের সারা জীবনের অবৈধ পথে অর্জিত রত্ন ভান্ডার, স্ত্রী – সন্তানদের বিলাসী জীবন চিত্র।

এই অবৈধ রত্ন ভান্ডার এতটাই বেশী যা অনেক শিল্পপতি যুগের পর যুগ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দিবা-রাত্রি শ্রম সাধনা করে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের যোগান দিয়ে উপার্জন করতে চিন্তাও করতে পারে নি। এমনকি কেউ কেউ এত বড় স্বপ্ন দেখতেও সাহস করেনি।

মাসাধিককাল খবরের প্রধান শিরোনাম ছিলো পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজির আহমদ, এর সাথে খবরের শিরোনামে আসে সাবেক সেনা প্রধান আজিজ আহমদ, ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান ও পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি জামিল হাসান সহ আরো কয়েকজনের নাম।

প্রতিদিনই নতুন কারো না কারো নাম যুক্ত হচ্ছে এই তালিকায়।এদের সবার শীর্ষে থাকা সাবেক আইজিপি বেনজির আহমদকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা টক অব দ্যা কান্ট্রিতে রূপ নেয়। পাশাপাশি অন্যান্য সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের অবৈধ রতœ ভান্ডারের তথ্য উপাত্ত মূল ধারার গন মাধ্যমগুলোয় একের পর এক দেশবাসির সামনে প্রকাশিত হচ্ছে। এ নিয়েও দেশের সর্বস্তরে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

এক সময়কার মহাপ্রতাপশালী বেনজির তার ভবিষ্যত ফল আঁচ করতে পেরে স্ব-পরিবারে দেশ থেকে পালিয়েছে। কেউ কেউ পালিয়েছে আবার কেউ পালানোর পথ খুজছে বলেও কানাঘুষা রয়েছে।

এসব কিছুকে ছাপিয়ে এক ছাগল কান্ডে ভয়ংকর এক সিডরের গগনবিদারী বজ্রাঘাতে আক্রান্ত হয়ে “চিচিং ফাঁক” হয়ে যায় এনবিআরের পরশ পাথর তুল্য সদস্য মতিউর রহমান এবং প্রথম সচিব কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের। এদের পাহাড়সম সম্পদ অর্জন আরব্য রজনীর আলী বাবা চল্লিশ চোরের গল্পকেও হার মানাচ্ছে।

এ যাবৎ প্রকাশিত অবৈধ সম্পদ উপার্জনকারীদের মধ্যে সর্ব শীর্ষে বলে ধারণা করা হচ্ছে এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর এবং সাবেক আইজিপি বেনজির আহমদকে।

তবে কার সম্পদ বেশী নির্ধারণ করা কঠিন। বেনজিরের উপার্জনের পথ ছিলো একমুখী ক্ষমতা কেন্দ্রিক। মতিউর এনবিআর কর্মকর্তা হলেও তার অবৈধ সম্পদ উপার্জনের পথ ছিলো বহু মাত্রিক ও অপ্রতিরোধ্য।

মতিউর ছিলো সর্ববিষয়ে পারদর্শী বিশেষজ্ঞ পরশ পাথরতুল্য গ্যাম্বলার। মতিউরের সাথে অন্য কারো তুলনা চলেনা। সব সরকারের আমলে সে ছিলো সম সুবিধাভোগী “একটি মূল্যবান পরশ পাথর”।

বিভিন্ন টেবিল টকে এমনও শোনা গেছে, “বেনজির যে টীমের খেলোয়াড়, মতিউর ঐ টীমের কোচ”।

ছাগলকান্ডের মতিউর রহমানের সম্পদের ফিরিস্তি দেখলে অবাক হওয়ার মতো। সরকারি চাকরি করে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তিনি নিজের নামে, দুই স্ত্রী, পাঁচ সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনের নামে গড়েছেন। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, আমলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য, স্বর্ণ চোরাচালানি, বিমানবন্দর দিয়ে যারা কোটি কোটি টাকার অবৈধ মালামাল আনা-নেওয়া করেন তারা মতিউরকে দিয়ে সুবিধা পেয়েছেন।

কিন্তু এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী প্রশ্রয়দাতাদের হাত, যারা মতিউর রহমানকে রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং মতিউর যেসব জায়গায় চাকরি করেছেন, সেই সব বিভাগ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দুর্নীতির রাজপুত্র হাকিম মাস্টারের ছেলে মতিউর রহমানের ক্ষমতা ও প্রভাবের যত সামান্য চিত্র তুলে ধরেছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউল আলম।

স্পষ্টভাষি হিসেবে পরিচিত সাবেক সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান বদিউল আলম তার লেখা বাইয়ে ‘মতিউরের বদলি বাতিলের তদবির কেন এবং কীভাবে ঠেকালাম’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘এনবিআরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে রুটিনমাফিক কর্মকর্তাদের বদলির সিদ্ধান্ত নিই। সে সময় মতিউর রহমান ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরে যুগ্ম কমিশনার। তাঁকে যেদিন রাজশাহীতে বদলির সিদ্ধান্ত হয় সেদিনই বোর্ডের ৪জন সদস্য দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘আপনি মতিউরকে বদলি করলেও রাখতে পারবেন না।’ কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে অনড় থাকি। এরপর সামরিক ও বেসামরিক মহল থেকে তার জন্য তদবির আসতে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ লিখিত চিঠিতে জানায়, তাদের ছাড়পত্র ছাড়া মতিউর রহমানকে বদলি করা যাবে না। এরপর চট্টগ্রামে কর্মরত সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির বদলির আদেশ বাতিলের অনুরোধ করেন। তৎকালীন সিজিএস মেজর জেনারেল সিনা ইবনে জামালীও তার পক্ষে ওকালতি করেন। এমনকি তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমদ টেলিফোন করে মতিউরের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন।’

মতিউর রহমানের প্রভাব নিয়ে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান লিখেছেন, ‘তিনি (মতিউর) অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেবের বেড রুম পর্যন্ত যেতে পেরেছেন। সাইফুর রহমানের বেড রুমেও যেতে পারতেন।’ এতে স্পষ্ট হওয়া যায় মতিউরের ক্ষমতার হাত কতটা লম্বা ছিলো।

মতিউরের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত পাচ বার দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের হয় বলে দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্র ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়। বার বার তাকে রহস্য জনকভাবে তদন্তের আওতা থেকে বাদ দেয়া হয়ছে। বিভিন্ন মহলে দূর্নীতি দমন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেছে, সর্ষে ভূত থাকলে ভূত তাড়াবে কী দিয়ে?

দূর্নীতি দমন কমিশনে বার বার একজন কর্মকর্তার নামে অভিযোগ দায়েরের পরও তাকে প্রতিবার অনুসন্ধানের আওতা থেকে বাদ দিয়েছে, এটি দূদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দূর্নীতি, নাকি দায়িত্বে অবহেলা, এমন প্রশ্নই রাখছেন বিশেষজ্ঞ মহলের অনেকে।

মুলাদী কাজিরচরের মতিউর নিজ গ্রামে একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি, দানবীর, শিক্ষানুরাগী হিসেবে পরিচিত। সেখানে পিতৃ ভিটায় তৈরী করেছেন আলিশান ভবন, তৈরী করেছেন কলেজ, মাদ্রাসা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন শত শত কোটি টাকার সম্পদ। শেয়ার বাজারে গত দুই যুগ ধরে গ্যাম্বলিং করে হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে মতিউরের।” দেশাত্মবোধের জায়গা থেকে তার পরিবারের হালাল উপার্জনের পথ তৈরী করতে”! কয়েক লক্ষ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়ে ধন সম্পদের বাদশাহীর আসন অর্জন করেছে। করেছে রিসোর্ট-পার্ক, করেছেন আলিশান দালান-কোঠা, করেছেন শিল্প-কল-কারখানা।

নিজের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকীকে একজন সাধারন বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক থেকে গড়ে তুলেছেন রাজনৈতিক পরিচিত মুখ হিসেবে, শত কোটি টাকা ব্যয়ে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত করিয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে। তার পদস্থ ও অধীনস্থ অনেককেই তৈরী করেছেন “আলীবাবা” হিসেবে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তে সুস্পষ্ট যে, মতিউর ছিলো অবৈধ পথে টাকা উপার্জন একটি শক্তিশালী পরশ পাথর। এই পরশ পাথরের ছোয়ায় তার বহু স্বতীর্থ পরশ পাথরে পরিণত হয়েছেন।

পরশ পাথর মতিউরের সিন্ডিকেট দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য তৈরীতে অপ্রতিরোধ্য ছাদের ভূমিকায় ছিলেন তৎকালীন ডকসাইটে অর্থসচিব ও বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা, যার সাথে মতিউরের কাবার আঙ্গিনার একটি ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ, জেনারেল মইন উ আহমদ, বিএনপির আমলের সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের ছেলে নাসের রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ বহু প্রভাবশালী আমলা এবং রাজনৈতিক ব্যাক্তিরা। মঈন উ আহমদের নেতৃত্বের সেনা সমর্থিত সরকার আমলে এই মতিউরই সেনা বাহিনীর একদল অফিসারকেও “আলীবাবা” বানিয়ে দিয়েছেন যা বদিউর বহমানের আত্মজীবনিমূলক বই এর ভাষ্যমতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

"চিচিং ফাঁক"

একের পর এক বেরিয়ে আসছে দুর্নীতিবাজদের রত্ন ভান্ডার

মোহাম্মদ মোশাররাফ হোছাইন খান
Update Time : ০৬:৩৪:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই ২০২৪

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়া এক ছাগলে পরশ পাথর তুল্য দূর্নীতির মহারাজ এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের প্রাসাদ চুরমার হয়ে “চিচিং ফাক”।

একের পর এক বেরিয়ে আসছে এনবিআর, সেবা দানকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্মকর্তাদের রত্ন ভান্ডার। একেক জনের রত্ন ভান্ডার একেকজনের চেয়ে সমৃদ্ধ। আরব্য রজনীর “আলী বাবা” গল্পের ডাকাত সর্দার যেন এর কাছে নস্যি।
এনবিআর ও সেবা দানকারী সরকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সুরক্ষিত পর্বত দূর্গে রক্ষিত সুসজ্জিত রত্ন ভান্ডার। সরকারি চাকুরীতে যোগদান করতে পারলেই যেন সংরক্ষিত দুর্গের রক্ষিত সম্পদ একেকজনের হাতের মুঠোয়। সরকারি একটি চাকুরী যেন ভাগ্য পরিবর্তনকারী চিচিং ফাঁক। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বড় কোন পদে বসতে পারলেতো কথাই নেই। অপরাপর সেবা প্রদানকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের বাস্তবতা একই রূপ।

জাতীয় সংসদে এই বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। গত শনিবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদের অর্থবিলের ওপর সংশোধনীর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৯০ শতাংশ দুর্নীতিতে জড়িত। কাস্টমসে যারা চাকরি করেন তাদের প্রত্যেকের ঢাকা শহরে দুইটা-তিনটা বাড়ি। বন বিভাগে যারা চাকরি করেন তাদের দুইটা-তিনটা করে সোনার দোকান। প্রধানমন্ত্রী যদি পদক্ষেপ নেন তাহলে দুর্নীতি রোধ করতে পারবেন। না হলে যে হারে লাগামহীনভাবে বড় বড় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি করছেন, আমরা কী করব? আমরা অসহায়। অনেক সরকারি কর্মকর্তা আছেন তারাও অসহায়। কারণ, এখানে ৯০ শতাংশ লোকই ওইদিকে (দুর্নীতি), ১০-১৫ শতাংশ লোক ভালো থেকে কী করবে?

সাংসদ হাফিজ উদ্দীনের এ বক্তব্যের বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, দেশের মূল ধারা থেকে ছোট খাটো সকল গনমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও শহর গ্রামের চায়ের টং দোকান থেকে থেকে সর্বস্তরে মানুষের মুখে মুখে মুখোরোচক আলোচনায়।

এ আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে সরকারী কর্মকর্তাদের অপরাধ – দূর্নীতির চালচিত্র। আলোচনায় সবার শীর্ষে রয়েছে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজির আহমদ, এনবিআরের কর্মকর্তা মতিউর রহমান, কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালসহ বাঘা বাঘা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নাম। দেশের সর্বস্তরের মানুষের এ আলোচনায় প্রতিনিয়তই যুক্ত হচ্ছে নিত্য নতুন একেকজনের নাম। জনসম্মুখে প্রকাশিত হচ্ছে তাদের সারা জীবনের অবৈধ পথে অর্জিত রত্ন ভান্ডার, স্ত্রী – সন্তানদের বিলাসী জীবন চিত্র।

এই অবৈধ রত্ন ভান্ডার এতটাই বেশী যা অনেক শিল্পপতি যুগের পর যুগ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দিবা-রাত্রি শ্রম সাধনা করে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের যোগান দিয়ে উপার্জন করতে চিন্তাও করতে পারে নি। এমনকি কেউ কেউ এত বড় স্বপ্ন দেখতেও সাহস করেনি।

মাসাধিককাল খবরের প্রধান শিরোনাম ছিলো পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজির আহমদ, এর সাথে খবরের শিরোনামে আসে সাবেক সেনা প্রধান আজিজ আহমদ, ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান ও পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি জামিল হাসান সহ আরো কয়েকজনের নাম।

প্রতিদিনই নতুন কারো না কারো নাম যুক্ত হচ্ছে এই তালিকায়।এদের সবার শীর্ষে থাকা সাবেক আইজিপি বেনজির আহমদকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা টক অব দ্যা কান্ট্রিতে রূপ নেয়। পাশাপাশি অন্যান্য সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের অবৈধ রতœ ভান্ডারের তথ্য উপাত্ত মূল ধারার গন মাধ্যমগুলোয় একের পর এক দেশবাসির সামনে প্রকাশিত হচ্ছে। এ নিয়েও দেশের সর্বস্তরে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

এক সময়কার মহাপ্রতাপশালী বেনজির তার ভবিষ্যত ফল আঁচ করতে পেরে স্ব-পরিবারে দেশ থেকে পালিয়েছে। কেউ কেউ পালিয়েছে আবার কেউ পালানোর পথ খুজছে বলেও কানাঘুষা রয়েছে।

এসব কিছুকে ছাপিয়ে এক ছাগল কান্ডে ভয়ংকর এক সিডরের গগনবিদারী বজ্রাঘাতে আক্রান্ত হয়ে “চিচিং ফাঁক” হয়ে যায় এনবিআরের পরশ পাথর তুল্য সদস্য মতিউর রহমান এবং প্রথম সচিব কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের। এদের পাহাড়সম সম্পদ অর্জন আরব্য রজনীর আলী বাবা চল্লিশ চোরের গল্পকেও হার মানাচ্ছে।

এ যাবৎ প্রকাশিত অবৈধ সম্পদ উপার্জনকারীদের মধ্যে সর্ব শীর্ষে বলে ধারণা করা হচ্ছে এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর এবং সাবেক আইজিপি বেনজির আহমদকে।

তবে কার সম্পদ বেশী নির্ধারণ করা কঠিন। বেনজিরের উপার্জনের পথ ছিলো একমুখী ক্ষমতা কেন্দ্রিক। মতিউর এনবিআর কর্মকর্তা হলেও তার অবৈধ সম্পদ উপার্জনের পথ ছিলো বহু মাত্রিক ও অপ্রতিরোধ্য।

মতিউর ছিলো সর্ববিষয়ে পারদর্শী বিশেষজ্ঞ পরশ পাথরতুল্য গ্যাম্বলার। মতিউরের সাথে অন্য কারো তুলনা চলেনা। সব সরকারের আমলে সে ছিলো সম সুবিধাভোগী “একটি মূল্যবান পরশ পাথর”।

বিভিন্ন টেবিল টকে এমনও শোনা গেছে, “বেনজির যে টীমের খেলোয়াড়, মতিউর ঐ টীমের কোচ”।

ছাগলকান্ডের মতিউর রহমানের সম্পদের ফিরিস্তি দেখলে অবাক হওয়ার মতো। সরকারি চাকরি করে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তিনি নিজের নামে, দুই স্ত্রী, পাঁচ সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনের নামে গড়েছেন। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, আমলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য, স্বর্ণ চোরাচালানি, বিমানবন্দর দিয়ে যারা কোটি কোটি টাকার অবৈধ মালামাল আনা-নেওয়া করেন তারা মতিউরকে দিয়ে সুবিধা পেয়েছেন।

কিন্তু এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী প্রশ্রয়দাতাদের হাত, যারা মতিউর রহমানকে রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং মতিউর যেসব জায়গায় চাকরি করেছেন, সেই সব বিভাগ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দুর্নীতির রাজপুত্র হাকিম মাস্টারের ছেলে মতিউর রহমানের ক্ষমতা ও প্রভাবের যত সামান্য চিত্র তুলে ধরেছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউল আলম।

স্পষ্টভাষি হিসেবে পরিচিত সাবেক সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান বদিউল আলম তার লেখা বাইয়ে ‘মতিউরের বদলি বাতিলের তদবির কেন এবং কীভাবে ঠেকালাম’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘এনবিআরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে রুটিনমাফিক কর্মকর্তাদের বদলির সিদ্ধান্ত নিই। সে সময় মতিউর রহমান ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরে যুগ্ম কমিশনার। তাঁকে যেদিন রাজশাহীতে বদলির সিদ্ধান্ত হয় সেদিনই বোর্ডের ৪জন সদস্য দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘আপনি মতিউরকে বদলি করলেও রাখতে পারবেন না।’ কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে অনড় থাকি। এরপর সামরিক ও বেসামরিক মহল থেকে তার জন্য তদবির আসতে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ লিখিত চিঠিতে জানায়, তাদের ছাড়পত্র ছাড়া মতিউর রহমানকে বদলি করা যাবে না। এরপর চট্টগ্রামে কর্মরত সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির বদলির আদেশ বাতিলের অনুরোধ করেন। তৎকালীন সিজিএস মেজর জেনারেল সিনা ইবনে জামালীও তার পক্ষে ওকালতি করেন। এমনকি তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমদ টেলিফোন করে মতিউরের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন।’

মতিউর রহমানের প্রভাব নিয়ে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান লিখেছেন, ‘তিনি (মতিউর) অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেবের বেড রুম পর্যন্ত যেতে পেরেছেন। সাইফুর রহমানের বেড রুমেও যেতে পারতেন।’ এতে স্পষ্ট হওয়া যায় মতিউরের ক্ষমতার হাত কতটা লম্বা ছিলো।

মতিউরের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত পাচ বার দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের হয় বলে দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্র ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়। বার বার তাকে রহস্য জনকভাবে তদন্তের আওতা থেকে বাদ দেয়া হয়ছে। বিভিন্ন মহলে দূর্নীতি দমন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেছে, সর্ষে ভূত থাকলে ভূত তাড়াবে কী দিয়ে?

দূর্নীতি দমন কমিশনে বার বার একজন কর্মকর্তার নামে অভিযোগ দায়েরের পরও তাকে প্রতিবার অনুসন্ধানের আওতা থেকে বাদ দিয়েছে, এটি দূদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দূর্নীতি, নাকি দায়িত্বে অবহেলা, এমন প্রশ্নই রাখছেন বিশেষজ্ঞ মহলের অনেকে।

মুলাদী কাজিরচরের মতিউর নিজ গ্রামে একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি, দানবীর, শিক্ষানুরাগী হিসেবে পরিচিত। সেখানে পিতৃ ভিটায় তৈরী করেছেন আলিশান ভবন, তৈরী করেছেন কলেজ, মাদ্রাসা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন শত শত কোটি টাকার সম্পদ। শেয়ার বাজারে গত দুই যুগ ধরে গ্যাম্বলিং করে হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে মতিউরের।” দেশাত্মবোধের জায়গা থেকে তার পরিবারের হালাল উপার্জনের পথ তৈরী করতে”! কয়েক লক্ষ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়ে ধন সম্পদের বাদশাহীর আসন অর্জন করেছে। করেছে রিসোর্ট-পার্ক, করেছেন আলিশান দালান-কোঠা, করেছেন শিল্প-কল-কারখানা।

নিজের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকীকে একজন সাধারন বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক থেকে গড়ে তুলেছেন রাজনৈতিক পরিচিত মুখ হিসেবে, শত কোটি টাকা ব্যয়ে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত করিয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে। তার পদস্থ ও অধীনস্থ অনেককেই তৈরী করেছেন “আলীবাবা” হিসেবে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তে সুস্পষ্ট যে, মতিউর ছিলো অবৈধ পথে টাকা উপার্জন একটি শক্তিশালী পরশ পাথর। এই পরশ পাথরের ছোয়ায় তার বহু স্বতীর্থ পরশ পাথরে পরিণত হয়েছেন।

পরশ পাথর মতিউরের সিন্ডিকেট দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য তৈরীতে অপ্রতিরোধ্য ছাদের ভূমিকায় ছিলেন তৎকালীন ডকসাইটে অর্থসচিব ও বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা, যার সাথে মতিউরের কাবার আঙ্গিনার একটি ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ, জেনারেল মইন উ আহমদ, বিএনপির আমলের সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের ছেলে নাসের রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ বহু প্রভাবশালী আমলা এবং রাজনৈতিক ব্যাক্তিরা। মঈন উ আহমদের নেতৃত্বের সেনা সমর্থিত সরকার আমলে এই মতিউরই সেনা বাহিনীর একদল অফিসারকেও “আলীবাবা” বানিয়ে দিয়েছেন যা বদিউর বহমানের আত্মজীবনিমূলক বই এর ভাষ্যমতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।