ঢাকা ০৩:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ

উত্তরের পাট চাষিদের কান্না দেখার কেউ নেই

দিনাজপুর প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৩:৩৫:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩
  • / ১৯৪ Time View

অনেক আশা আর সম্ভাবনা নিয়ে সোনালি আঁশ পাট চাষ করেছিলেন দিনাজপুরের কৃষকরা। তবে সেই পাটচাষিদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। প্রখর রোদ, অনাবৃষ্টির কারণে এবার চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চাষিদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে পাট নিয়ে। সার, কীটনাশকের দাম ও শ্রমিক মজুরি বাড়তি থাকায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু বাজারে পাটের যে দাম তা দিয়ে তাদের উৎপাদন খরচও উঠে আসছে না। ফলে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা।

দিনাজপুরের খানসামা ও চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের অন্যতম কৃষিনির্ভর জেলা দিনাজপুর। এ বছর বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও পাটের ফলন ভালো হয়েছে। এবার ভরা মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকরা। পরে পাট জাগ দিতে খাল ও পুকুরে সেলো মেশিন দিয়ে পানি ভরাট করে পাট জাগ দেন কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ গত বছর পাটের ভালো ফলন ও বাজারে পাটের দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা সোনালি আসে সুদিনে ফেরার স্বপ্ন বুনছিল। কিন্তু এ বছরে পাটের দাম মণ প্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কমে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বর্ষাকালে তেমন বৃষ্টিপাত না হলেও আবাদি এলাকা বন্যামুক্ত থাকায় এবং থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাট চাষের জন্য উপকার হয়েছে। পাট কাটার ভরা মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় কিছুটা ভোগান্তি হয়েছে কৃষকদের। এছাড়া আধুনিক জাতের উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহারে কৃষকরা পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ফলে জেলায় ক্রমান্বয়ে পাটের উৎপাদন বাড়ছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলায় মোট ৪ হাজার ৩৭২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে নয় হাজার টন। গত বছর পাট আবাদ হয়েছিল ৪ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে।

জেলা পাট অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার বিভিন্ন বাজারে পাট প্রকারভেদে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ থেকে টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এই সময়ে পাটের বাজার দর ছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা। এবার দাম কিছুটা কমছে।

চিরিরবন্দর উপজেলার সাতনালা গ্রামের পাট চাষি ধনঞ্জয় বলেন, গত দুই বছরে পাটের দাম ভালো ছিল। তাই এ বছর গতবারের তুলনায় পাটের চাষ বেশি করেছি। কিন্তু এবার প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে যা গতবছরের তুলনায় মণ প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কম। বাজারে সার কীটনাশক ও শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে উল্টো পাটের দাম কমেছে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ পাটের দামটা বাড়ালে কৃষকরা কিছুটা লাভবান হবে।

খানসামা উপজেলার কৃষক রহমান বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে সবমিলে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ। উৎপাদিত পাট যখন বাজারে বিক্রি করছি তখন আসল টাকাই উঠে আসছে না। এভাবে তো আর কৃষক বাঁচতে পারে না। এমনিতেই সবকিছুর দাম বেশি কিন্তু কৃষকের পণ্যের দামই শুধু কম।

জেলার বিন্যাকুড়ি হাটে পাট বিক্রি করতে আসা কৃষক ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমিতে এবার পাট চাষ করেছি, খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকার বেশি। পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে পাটের যে দাম তাতে লোকসান না হলেও লাভ হবে না। সরকারে উচিত পাটের বাজার দরটা ঠিক করে দেওয়া, তাহলে কৃষকরা বাঁচবে।

পাটের পাইকারি ক্রেতা হাবিব রহমান বলেন, গতবছর যেভাবে লাভবান হয়েছি এবার সেভাবে লাভ করতে পারছি না কেননা পাটকলগুলো এখনো চালু হয়নি। এক মণ ৪০ কেজিতে হলেও আমাদের প্রতিমণ কিনতে হচ্ছে ৪২ কেজিতে। সেই পাট বিক্রি করছি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০ টাকা করে। এতে প্রতিমণ পাট বিক্রি করে আমাদের মাত্র ৩০ থেকে ৫০ টাকা লাভ হয়। পাটকলগুলো চালু হলে কৃষকের পাশাপাশি আমরাও লাভবান হতে পারবো।

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা বলেন, চিরিরবন্দরে পাটের আবাদ দিন দিন বাড়ছে এবং এ বছর পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। আমরা কৃষকদের শুরু থেকে সব ধরনের পরামর্শ দিয়েছি। পাট অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের উন্নত মানের পাটের বীজ ও সার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এজন্য দিনে দিনে এ উপজেলায় পাট চাষে কৃষকরা আগ্রহ হচ্ছেন। তবে কৃষকদের অভিযোগ তারা গতবছরের তুলনায় এবার পাটের দাম পাচ্ছেন না। কৃষকরা পাটের ভালো দাম না পেলে পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, জেলার ১৩টি উপজেলায় পাটের আবাদ হয় তবে চিরিরবন্দর, খানসামা, বীরগঞ্জ, ফুলবাড়ী, বিরল ও কাহারল উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পাটের চাষ হয়। এ বছর বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও জেলায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। পাট কাটার ভরা মৌসুমে আকাশের বৃষ্টি না থাকায় কিছুটা ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকরা।

Please Share This Post in Your Social Media

উত্তরের পাট চাষিদের কান্না দেখার কেউ নেই

Update Time : ০৩:৩৫:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

অনেক আশা আর সম্ভাবনা নিয়ে সোনালি আঁশ পাট চাষ করেছিলেন দিনাজপুরের কৃষকরা। তবে সেই পাটচাষিদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। প্রখর রোদ, অনাবৃষ্টির কারণে এবার চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চাষিদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে পাট নিয়ে। সার, কীটনাশকের দাম ও শ্রমিক মজুরি বাড়তি থাকায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু বাজারে পাটের যে দাম তা দিয়ে তাদের উৎপাদন খরচও উঠে আসছে না। ফলে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা।

দিনাজপুরের খানসামা ও চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের অন্যতম কৃষিনির্ভর জেলা দিনাজপুর। এ বছর বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও পাটের ফলন ভালো হয়েছে। এবার ভরা মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকরা। পরে পাট জাগ দিতে খাল ও পুকুরে সেলো মেশিন দিয়ে পানি ভরাট করে পাট জাগ দেন কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ গত বছর পাটের ভালো ফলন ও বাজারে পাটের দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা সোনালি আসে সুদিনে ফেরার স্বপ্ন বুনছিল। কিন্তু এ বছরে পাটের দাম মণ প্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কমে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বর্ষাকালে তেমন বৃষ্টিপাত না হলেও আবাদি এলাকা বন্যামুক্ত থাকায় এবং থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাট চাষের জন্য উপকার হয়েছে। পাট কাটার ভরা মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় কিছুটা ভোগান্তি হয়েছে কৃষকদের। এছাড়া আধুনিক জাতের উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহারে কৃষকরা পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ফলে জেলায় ক্রমান্বয়ে পাটের উৎপাদন বাড়ছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলায় মোট ৪ হাজার ৩৭২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে নয় হাজার টন। গত বছর পাট আবাদ হয়েছিল ৪ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে।

জেলা পাট অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার বিভিন্ন বাজারে পাট প্রকারভেদে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ থেকে টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এই সময়ে পাটের বাজার দর ছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা। এবার দাম কিছুটা কমছে।

চিরিরবন্দর উপজেলার সাতনালা গ্রামের পাট চাষি ধনঞ্জয় বলেন, গত দুই বছরে পাটের দাম ভালো ছিল। তাই এ বছর গতবারের তুলনায় পাটের চাষ বেশি করেছি। কিন্তু এবার প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে যা গতবছরের তুলনায় মণ প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কম। বাজারে সার কীটনাশক ও শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে উল্টো পাটের দাম কমেছে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ পাটের দামটা বাড়ালে কৃষকরা কিছুটা লাভবান হবে।

খানসামা উপজেলার কৃষক রহমান বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে সবমিলে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ। উৎপাদিত পাট যখন বাজারে বিক্রি করছি তখন আসল টাকাই উঠে আসছে না। এভাবে তো আর কৃষক বাঁচতে পারে না। এমনিতেই সবকিছুর দাম বেশি কিন্তু কৃষকের পণ্যের দামই শুধু কম।

জেলার বিন্যাকুড়ি হাটে পাট বিক্রি করতে আসা কৃষক ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমিতে এবার পাট চাষ করেছি, খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকার বেশি। পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে পাটের যে দাম তাতে লোকসান না হলেও লাভ হবে না। সরকারে উচিত পাটের বাজার দরটা ঠিক করে দেওয়া, তাহলে কৃষকরা বাঁচবে।

পাটের পাইকারি ক্রেতা হাবিব রহমান বলেন, গতবছর যেভাবে লাভবান হয়েছি এবার সেভাবে লাভ করতে পারছি না কেননা পাটকলগুলো এখনো চালু হয়নি। এক মণ ৪০ কেজিতে হলেও আমাদের প্রতিমণ কিনতে হচ্ছে ৪২ কেজিতে। সেই পাট বিক্রি করছি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০ টাকা করে। এতে প্রতিমণ পাট বিক্রি করে আমাদের মাত্র ৩০ থেকে ৫০ টাকা লাভ হয়। পাটকলগুলো চালু হলে কৃষকের পাশাপাশি আমরাও লাভবান হতে পারবো।

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা বলেন, চিরিরবন্দরে পাটের আবাদ দিন দিন বাড়ছে এবং এ বছর পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। আমরা কৃষকদের শুরু থেকে সব ধরনের পরামর্শ দিয়েছি। পাট অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের উন্নত মানের পাটের বীজ ও সার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এজন্য দিনে দিনে এ উপজেলায় পাট চাষে কৃষকরা আগ্রহ হচ্ছেন। তবে কৃষকদের অভিযোগ তারা গতবছরের তুলনায় এবার পাটের দাম পাচ্ছেন না। কৃষকরা পাটের ভালো দাম না পেলে পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, জেলার ১৩টি উপজেলায় পাটের আবাদ হয় তবে চিরিরবন্দর, খানসামা, বীরগঞ্জ, ফুলবাড়ী, বিরল ও কাহারল উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পাটের চাষ হয়। এ বছর বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও জেলায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। পাট কাটার ভরা মৌসুমে আকাশের বৃষ্টি না থাকায় কিছুটা ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকরা।