ঢাকা ০২:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজঃ
সাগরে বাতাসের ঘূর্ণি-কুণ্ডলী, ৩৫ জেলায় দাবদাহ

আগামী ৫ দিনে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে তাপমাত্রা

Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ মে ২০২৩
  • / ১৫৬ Time View

বঙ্গোপসাগরে আজ সোমবার সকাল ৮টার পর লঘুচাপ সৃষ্টির অবস্থা তৈরি হতে পারে। ভারতের নিকোবর দ্বীপপূঞ্জের দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে এটির অবস্থান হতে পারে; যা বাংলাদেশ উপকূল থেকে ১২শ থেকে ১৮শ কিলোমিটার দূরে। ইতোমধ্যে ওই স্থানে বাতাসের ঘূর্ণি-কুণ্ডলী তৈরি হয়েছে। আজ রাত ৮টার পর বা এ সময়ের মধ্যে তা নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। পরে যা আরও ঘণীভূত হয়ে বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। যদিও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) বলছে, ৪৮ ঘণ্টায় সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত ‘মোচা’ নামের ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে।

তবে এটি কখন ও কোথায় স্থলভাগে আছড়ে পড়তে পারে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব না পড়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। তেমনটি হলে এটি মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানার আশঙ্কা বেশি।

এদিকে লঘুচাপ এবং সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের পরোক্ষ প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। কয়েকদিন ধরে দেশে ভীষণ গরম অবস্থা বিরাজ করছে। রোববার তা দেশের ৩৫ জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহে পরিণত হয়। এর মধ্যে একদিনে দেশে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি বেড়েছে। ঢাকায়ই বেড়েছে দশমিক ৭ ডিগ্রি। তৈরি হয়েছে দাবদাহ। এর ফলে প্রকৃত আর অনুভব তাপমাত্রার পার্থক্য স্থানবিশেষে ৫ থেকে ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি। শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।

বিএমডির আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, লঘুচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় পর্যন্ত অন্তত চারটি স্তর পার হতে হয়। এগুলো হচ্ছে-লঘুচাপ, সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপ। এসব স্তর পার হতে ৫ থেকে ৮ দিন সময় লেগে যায়। তবে নিম্নচাপ হলেও কেবল তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা হিসাবে ধরা হয়। বিষয়টি নিয়মিত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিএমডি।

চেক প্রজাতন্ত্রের আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা উইন্ডিডটকমের এ সংক্রান্ত মডেলে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে রোববারই বাতাসের কুণ্ডলী তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাতাসের গতি বাড়ছে। আজ রাত ৮টার পর ওই এলাকায় বাতাসের গতিবেগ ২০ কিলোমিটার পার হতে পারে। সাধারণত এমন অবস্থা তৈরি হলে সেটিকে নিম্নচাপ বলা হয়। এটি ১০ মে ভোরের দিকে গভীর নিম্নচাপ এবং ১২ মে ভোর ৫টার দিকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। ১৪ মে দুপুরের দিকে তা মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

তবে যেহেতু ঘূর্ণিঝড় ঘড়ির কাঁটার উলটোদিকে ঘোরে, তাই এটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল বা কক্সবাজার-চট্টগ্রামে আঁচড় ফেলবে কি না, তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। পাশাপাশি এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার পর কতটা দ্রুত বা ধীরে উপকূলের দিকে যায়, এর ওপরও আছড়ে পড়ার সময় নির্ভর করছে।

বিএমডির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে এর নাম হবে ‘মোচা’। এই নামটি দিয়েছে ইয়েমেন। আরবি শব্দ মোচা দ্বারা ইয়েমেনে বোঝানো হয় ‘কফি ফ্রম ইয়েমেন’ বা ইয়েমেনে উৎপাদিত কফি। মধ্যযুগের শুরুর দিকে (১৪শ সালের পর) ইয়েমেন থেকে সারা বিশ্বে বিশেষ করে তুরস্কসহ ইউরোপে কফি রপ্তানি হতো। এটা এতই বিখ্যাত ছিল যে, এ নামে লোহিতসাগরে একটি বন্দরের নামকরণ পর্যন্ত হয়।

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, নিম্নচাপে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার হয়ে থাকে। এর আগে বাতাসের গতিবেগের দুটি অবস্থা থাকে। তা হচ্ছে-লঘুচাপ ও সুস্পষ্ট লঘুচাপ। যখন বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫১ দশমিক ৮৪ থেকে ৬১ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার, তখন তাকে গভীর নিম্নচাপ বলে। আর বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬১ দশমিক ৫৬ থেকে ৮৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার হলে তা ঘূর্ণিঝড় এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ দশমিক ১ থেকে ১১৮ দশমিক ২৬ কিলোমিটার হলে প্রবল ঘূর্ণিঝড় বলা হয়। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৯ দশমিক ৮৮ কিলোমিটারের ঊর্ধ্বে উঠলে তাকে হারিকেনের তীব্রতাসম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড় বলা হয়।

প্রসঙ্গত, ঘূর্ণিঝড় বা ঘূর্ণিবার্তা হলো ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি বজ ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাসসংবলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপ মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এ ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ করা হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। কোনো স্থানে বায়ুর তাপ বেড়ে গেলে সেখানকার বায়ু ওপরে ওঠে যায়। ফলে বায়ুর চাপ ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। একে নিম্নচাপ বলে। এ নিম্নচাপ অঞ্চলে প্রায় বায়ুশূন্য অবস্থা থাকে বলে আশপাশের অঞ্চল থেকে বায়ু প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। অন্যদিকে বিষুবীয় অঞ্চলে আর্দ্র এবং উষ্ণ হাওয়া মহাসাগরের পৃষ্ঠ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এভাবে উষ্ণ হাওয়া ওপরের দিকে ওঠার ফলে এটি মহাসাগরীয় পৃষ্ঠে কম বায়ুচাপের একটি এলাকা সৃষ্টি করে। তখন চারপাশ থেকে তুলনামূলক উচ্চ বায়ুচাপবিশিষ্ট বাতাস সেই কম বায়ুচাপের এলাকায় প্রবেশ করে এবং সেটিও আর্দ্র এবং উষ্ণ হতে থাকে। বিপরীতদিকে ছুটে আসা শীতল বায়ু উষ্ণ হয়ে তাও ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এভাবে একটি চক্রের সৃষ্টি হয়। এই উষ্ণ বাতাস ওপরে উঠে সেখানকার ঠান্ডা হওয়ার কারণে পানির অণুগুলো জমাট বেঁধে মেঘের তৈরি করে। ক্রমাগত এই উষ্ণ এবং আর্দ্র বাতাসের ওপরে ওঠার কারণে একটি পাকের সৃষ্টি হয়। এই পাক তখন বাতাস এবং মেঘ নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আরও শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। পাকের ঘূর্ণনগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়টির কেন্দ্রে একটি ‘চোখ’ উৎপন্ন হয়।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় বা ঘূর্ণাবর্তের জ্বালানি হিসাবে কাজ করে মহাসাগরের উষ্ণ এবং আর্দ্র বাতাস। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা। সাধারণত পানির উষ্ণতা ২৭ ডিগ্রি হলে তা ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল হয়। তবে এরা ভূমিতে গিয়ে ‘জ্বালানি’র অভাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। তবে মহাসাগরে থাকা অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপ্তি এবং গতির ওপর নির্ভর করে এটি অনেক সময় ভূমিতে বেশ প্রচণ্ড রকমের তাণ্ডব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।

এদিকে লঘুচাপ পরিস্থিতির কারণে দেশের আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণত সাগরে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে শীতল বাতাস সেই কেন্দ্রমুখী হয়। ফলে বাতাসের সঙ্গে জলীয় বাষ্প চলে যায়। বিপরীত দিকে সাগরের দিক থেকে জলীয় বাষ্পের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থলভাগে জলীয় বাষ্পের স্বল্পতা তৈরি হয়ে দাবদাহ শুরু হয়। এই পরিস্থিতি প্রভাবিত হয় যখন বৃষ্টিশূন্যতা দেখা দেয়। বিএমডি দেশের ৪২ স্টেশনে আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। রোববার দেখা গেছে, এসব স্টেশনের মধ্যে শুধু সিলেটে ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্য স্টেশনগুলোয় বৃষ্টির দেখা নেই।

৩৫ জেলায় দাবদাহ : বিএমডি জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কয়েকদিন ধরে গরম থাকলেও রোববার খরতাপ ছিল অনেক বেশি। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বাড্ডা এলাকায় প্রকৃত তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এর অনুভূতি ছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকাল ৬টায় রাজধানীতে বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯০ শতাংশ; কিন্তু সন্ধ্যা ৬টায় ছিল ৪৫ শতাংশ। আবার শনিবার ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি; কিন্তু রোববার ছিল ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গায় ছিল ৩৭.৫ ডিগ্রি; কিন্তু রোববার একই স্থানে তা প্রায় ২ ডিগ্রি বেড়ে হয় ৩৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এমন অবস্থায় বিএমডি বলছে, আগামী ৫ দিনে কোনো সুখবর নেই। তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। রোববার গোটা খুলনা ও বরিশাল বিভাগে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এছাড়া ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও বান্দরবান জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। সবমিলে ৩৫ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল অব্যাহতই নয়, আরও বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। অন্যদিকে আন্দামান সাগর এলাকায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা ৫ দিনে আরও ঘণীভূত হতে পারে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

সাগরে বাতাসের ঘূর্ণি-কুণ্ডলী, ৩৫ জেলায় দাবদাহ

আগামী ৫ দিনে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে তাপমাত্রা

Update Time : ১০:৩১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ মে ২০২৩

বঙ্গোপসাগরে আজ সোমবার সকাল ৮টার পর লঘুচাপ সৃষ্টির অবস্থা তৈরি হতে পারে। ভারতের নিকোবর দ্বীপপূঞ্জের দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে এটির অবস্থান হতে পারে; যা বাংলাদেশ উপকূল থেকে ১২শ থেকে ১৮শ কিলোমিটার দূরে। ইতোমধ্যে ওই স্থানে বাতাসের ঘূর্ণি-কুণ্ডলী তৈরি হয়েছে। আজ রাত ৮টার পর বা এ সময়ের মধ্যে তা নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। পরে যা আরও ঘণীভূত হয়ে বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। যদিও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) বলছে, ৪৮ ঘণ্টায় সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত ‘মোচা’ নামের ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে।

তবে এটি কখন ও কোথায় স্থলভাগে আছড়ে পড়তে পারে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব না পড়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। তেমনটি হলে এটি মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানার আশঙ্কা বেশি।

এদিকে লঘুচাপ এবং সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের পরোক্ষ প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। কয়েকদিন ধরে দেশে ভীষণ গরম অবস্থা বিরাজ করছে। রোববার তা দেশের ৩৫ জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহে পরিণত হয়। এর মধ্যে একদিনে দেশে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি বেড়েছে। ঢাকায়ই বেড়েছে দশমিক ৭ ডিগ্রি। তৈরি হয়েছে দাবদাহ। এর ফলে প্রকৃত আর অনুভব তাপমাত্রার পার্থক্য স্থানবিশেষে ৫ থেকে ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি। শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।

বিএমডির আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, লঘুচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় পর্যন্ত অন্তত চারটি স্তর পার হতে হয়। এগুলো হচ্ছে-লঘুচাপ, সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপ। এসব স্তর পার হতে ৫ থেকে ৮ দিন সময় লেগে যায়। তবে নিম্নচাপ হলেও কেবল তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা হিসাবে ধরা হয়। বিষয়টি নিয়মিত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিএমডি।

চেক প্রজাতন্ত্রের আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা উইন্ডিডটকমের এ সংক্রান্ত মডেলে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে রোববারই বাতাসের কুণ্ডলী তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাতাসের গতি বাড়ছে। আজ রাত ৮টার পর ওই এলাকায় বাতাসের গতিবেগ ২০ কিলোমিটার পার হতে পারে। সাধারণত এমন অবস্থা তৈরি হলে সেটিকে নিম্নচাপ বলা হয়। এটি ১০ মে ভোরের দিকে গভীর নিম্নচাপ এবং ১২ মে ভোর ৫টার দিকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। ১৪ মে দুপুরের দিকে তা মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

তবে যেহেতু ঘূর্ণিঝড় ঘড়ির কাঁটার উলটোদিকে ঘোরে, তাই এটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল বা কক্সবাজার-চট্টগ্রামে আঁচড় ফেলবে কি না, তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। পাশাপাশি এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার পর কতটা দ্রুত বা ধীরে উপকূলের দিকে যায়, এর ওপরও আছড়ে পড়ার সময় নির্ভর করছে।

বিএমডির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে এর নাম হবে ‘মোচা’। এই নামটি দিয়েছে ইয়েমেন। আরবি শব্দ মোচা দ্বারা ইয়েমেনে বোঝানো হয় ‘কফি ফ্রম ইয়েমেন’ বা ইয়েমেনে উৎপাদিত কফি। মধ্যযুগের শুরুর দিকে (১৪শ সালের পর) ইয়েমেন থেকে সারা বিশ্বে বিশেষ করে তুরস্কসহ ইউরোপে কফি রপ্তানি হতো। এটা এতই বিখ্যাত ছিল যে, এ নামে লোহিতসাগরে একটি বন্দরের নামকরণ পর্যন্ত হয়।

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, নিম্নচাপে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার হয়ে থাকে। এর আগে বাতাসের গতিবেগের দুটি অবস্থা থাকে। তা হচ্ছে-লঘুচাপ ও সুস্পষ্ট লঘুচাপ। যখন বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫১ দশমিক ৮৪ থেকে ৬১ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার, তখন তাকে গভীর নিম্নচাপ বলে। আর বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬১ দশমিক ৫৬ থেকে ৮৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার হলে তা ঘূর্ণিঝড় এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ দশমিক ১ থেকে ১১৮ দশমিক ২৬ কিলোমিটার হলে প্রবল ঘূর্ণিঝড় বলা হয়। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৯ দশমিক ৮৮ কিলোমিটারের ঊর্ধ্বে উঠলে তাকে হারিকেনের তীব্রতাসম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড় বলা হয়।

প্রসঙ্গত, ঘূর্ণিঝড় বা ঘূর্ণিবার্তা হলো ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি বজ ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাসসংবলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপ মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এ ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ করা হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। কোনো স্থানে বায়ুর তাপ বেড়ে গেলে সেখানকার বায়ু ওপরে ওঠে যায়। ফলে বায়ুর চাপ ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। একে নিম্নচাপ বলে। এ নিম্নচাপ অঞ্চলে প্রায় বায়ুশূন্য অবস্থা থাকে বলে আশপাশের অঞ্চল থেকে বায়ু প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। অন্যদিকে বিষুবীয় অঞ্চলে আর্দ্র এবং উষ্ণ হাওয়া মহাসাগরের পৃষ্ঠ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এভাবে উষ্ণ হাওয়া ওপরের দিকে ওঠার ফলে এটি মহাসাগরীয় পৃষ্ঠে কম বায়ুচাপের একটি এলাকা সৃষ্টি করে। তখন চারপাশ থেকে তুলনামূলক উচ্চ বায়ুচাপবিশিষ্ট বাতাস সেই কম বায়ুচাপের এলাকায় প্রবেশ করে এবং সেটিও আর্দ্র এবং উষ্ণ হতে থাকে। বিপরীতদিকে ছুটে আসা শীতল বায়ু উষ্ণ হয়ে তাও ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এভাবে একটি চক্রের সৃষ্টি হয়। এই উষ্ণ বাতাস ওপরে উঠে সেখানকার ঠান্ডা হওয়ার কারণে পানির অণুগুলো জমাট বেঁধে মেঘের তৈরি করে। ক্রমাগত এই উষ্ণ এবং আর্দ্র বাতাসের ওপরে ওঠার কারণে একটি পাকের সৃষ্টি হয়। এই পাক তখন বাতাস এবং মেঘ নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আরও শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। পাকের ঘূর্ণনগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়টির কেন্দ্রে একটি ‘চোখ’ উৎপন্ন হয়।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় বা ঘূর্ণাবর্তের জ্বালানি হিসাবে কাজ করে মহাসাগরের উষ্ণ এবং আর্দ্র বাতাস। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা। সাধারণত পানির উষ্ণতা ২৭ ডিগ্রি হলে তা ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল হয়। তবে এরা ভূমিতে গিয়ে ‘জ্বালানি’র অভাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। তবে মহাসাগরে থাকা অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপ্তি এবং গতির ওপর নির্ভর করে এটি অনেক সময় ভূমিতে বেশ প্রচণ্ড রকমের তাণ্ডব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।

এদিকে লঘুচাপ পরিস্থিতির কারণে দেশের আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণত সাগরে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে শীতল বাতাস সেই কেন্দ্রমুখী হয়। ফলে বাতাসের সঙ্গে জলীয় বাষ্প চলে যায়। বিপরীত দিকে সাগরের দিক থেকে জলীয় বাষ্পের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থলভাগে জলীয় বাষ্পের স্বল্পতা তৈরি হয়ে দাবদাহ শুরু হয়। এই পরিস্থিতি প্রভাবিত হয় যখন বৃষ্টিশূন্যতা দেখা দেয়। বিএমডি দেশের ৪২ স্টেশনে আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। রোববার দেখা গেছে, এসব স্টেশনের মধ্যে শুধু সিলেটে ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্য স্টেশনগুলোয় বৃষ্টির দেখা নেই।

৩৫ জেলায় দাবদাহ : বিএমডি জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কয়েকদিন ধরে গরম থাকলেও রোববার খরতাপ ছিল অনেক বেশি। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বাড্ডা এলাকায় প্রকৃত তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এর অনুভূতি ছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকাল ৬টায় রাজধানীতে বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯০ শতাংশ; কিন্তু সন্ধ্যা ৬টায় ছিল ৪৫ শতাংশ। আবার শনিবার ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি; কিন্তু রোববার ছিল ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গায় ছিল ৩৭.৫ ডিগ্রি; কিন্তু রোববার একই স্থানে তা প্রায় ২ ডিগ্রি বেড়ে হয় ৩৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এমন অবস্থায় বিএমডি বলছে, আগামী ৫ দিনে কোনো সুখবর নেই। তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। রোববার গোটা খুলনা ও বরিশাল বিভাগে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এছাড়া ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও বান্দরবান জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। সবমিলে ৩৫ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল অব্যাহতই নয়, আরও বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। অন্যদিকে আন্দামান সাগর এলাকায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা ৫ দিনে আরও ঘণীভূত হতে পারে।